আজ সোমবার, ২৫শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৮ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
আজ সোমবার, ২৫শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৮ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

‘পাগল’ ট্রাম্পকে থামাবে কে?

বিশ্বরাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় এমন এক অস্বস্তিকর অধ্যায়ের জন্ম হয়েছে, যেখানে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা একজন নেতার কথাবার্তা, আচরণ এবং সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশ্ববাসীকে প্রায় প্রতিদিনই নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প-এই নামটি এখন আর শুধু একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের পরিচয় বহন করে না; বরং এটি এক ধরনের অনিশ্চয়তা, বিতর্ক এবং অস্থিরতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প নিজেকে শান্তির দূত হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধ করবেন, বিশেষ করে ফিলিস্তিন এর জনগণের ওপর চলমান দমন-পীড়ন বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন। কিন্তু ক্ষমতায় বসার পর তার অবস্থান পুরোপুরি উল্টো দিকে মোড় নেয়। ইজরাইল এর বর্বরোচিত সামরিক অভিযানের প্রতি তার প্রকাশ্য অবস্থান—বিশ্বজুড়ে প্রশ্নের জন্ম দেয় যে, এটিই কি তার সেই “শান্তির রাজনীতি”?

একইভাবে ইরানকে ঘিরে তার বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। “ইরানকে প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নেওয়া হবে”—এ ধরনের হুমকি দিয়ে ট্রাম্প কার্যত নিজেকেই প্রস্তর যুগের বাসিন্দায় পরিণত করেছেন। ট্রাম্পের একের পর এক বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতার কাছে মধ্যযুগীয় বর্বরতা যেন লজ্জায় মাথা লুকাতে চাইছে। আধুনিক বিশ্বে যেখানে সংলাপই সমস্যা সমাধানের প্রধান উপায়, সেখানে ট্রাম্পের ভাষা ও আচরণ সভ্যতার অর্জনকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

এখানে স্মরণ করা যেতে পারে জেফরি অ্যাপ্সটিন ফাইলসের কথা। যেখানে সভ্যতার উর্দি পরিহিত ট্রাম্পরা ৯ থেকে ১৩ বছরের শিশুদেরকে যৌনতার বস্তুতে পরিণত করে। মানব ভ্রূণ কে বারবিকিউ বানিয়ে ভক্ষণ করে। সুতরাং এদের মতো নর পিশাচদের কাছে মানুষ হত্যা একটি মামুলি ব্যাপার মাত্র।

এবার ইরানের উপর ইসরাইল মার্কিন আগ্রাসনের নেপথ্যে রয়েছে ইসলামী ঐতিহ্য ধ্বংসের নীল নকশা। পরমাণু কর্মসূচি থেকে ইরানকে বিরত রাখার অজুহাতে চালানো এই ইসরাইল মার্কিন আগ্রাসনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, হাজার বছরের ইসলামী ঐতিহ্য কে সম্পূর্ণরূপে বিনাশ করা। ইতোমধ্যে তারা ১৫০ টিরও বেশি ইসলামী ঐতিহ্য সমৃদ্ধ জাদুঘর ধ্বংস করেছে। যেমনটি তারা ইরাক এবং মিশরেও করেছিল।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া এসেছে মোহাম্মদ আল বারাদির কাছ থেকে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সাবেক এই মহাপরিচালক প্রকাশ্যে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে বলেন:
“দয়া করে এই পাগল ব্যক্তিটি পুরো অঞ্চলকে আগুনের পিণ্ডে পরিণত করার আগেই আপনাদের যা কিছু করার আছে তা করুন।”

এটি কোনো সাধারণ মন্তব্য নয়। এটি একজন নোবেল বিজয়ী কূটনীতিকের সতর্কবার্তা—যিনি ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের সময় ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বিশ্বকে সত্য দেখানোর সাহস করেছিলেন।

সুতরাং তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি স্পষ্ট সংকেত—বর্তমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়, বরং বিপজ্জনকভাবে অস্থিতিশীল।

ট্রাম্পের বক্তব্যের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো অদ্ভুত আত্মপ্রশংসা ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ দাবি। তিনি নিজেই বলেছেন, “আমি শান্তির জন্য সাতটি নোবেল পুরস্কার পেতে পারি।” এমন দাবি একদিকে যেমন হাস্যকর শোনায়, অন্যদিকে এটি তার আত্মমুগ্ধতার গভীরতাকেই তুলে ধরে। বাস্তবতার সঙ্গে এই ধরনের দাবির কোনো সামঞ্জস্য নেই—বরং এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে এক ধরনের নাটকীয় প্রদর্শনীতে পরিণত করেছে।

ন্যাটো-কে নিয়েও তার অবস্থান বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। কখনো তিনি জোটটিকে “অপ্রয়োজনীয়” বলেছেন, আবার কখনো যুক্তরাষ্ট্রকে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার হুমকি দিয়েছেন। এমনকি ন্যাটোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। ন্যাটোর মতো একটি সামরিক জোট, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ, সেটিকে নিয়ে এমন অনিশ্চিত অবস্থান বিশ্ব নিরাপত্তার জন্যও হুমকিস্বরূপ।

ভেনেজুয়েলা প্রসঙ্গেও তার বক্তব্য ও পদক্ষেপ বিতর্কিত। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন, অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা কিংবা জ্বালানি রাজনীতির খেলায় তিনি যে আগ্রাসী কৌশল নিয়েছেন, তা আন্তর্জাতিক আইনের ন্যূনতম মানদণ্ড নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন—সমালোচনা অবশ্যই তথ্যনির্ভর হতে হবে। যাচাইবিহীন বা অতিরঞ্জিত অভিযোগ (যেমন ব্যক্তিগত অপরাধ সংক্রান্ত অপ্রমাণিত দাবি) মূল আলোচনাকে দুর্বল করে। কিন্তু ট্রাম্পের নীতির সমালোচনা করার জন্য তার বাস্তব কর্মকাণ্ডই যথেষ্ট—অতিরিক্ত কিছু যোগ করার প্রয়োজন নেই।

মূল সমস্যা হলো তার নেতৃত্বের ধরন। তার কথাবার্তায় ধারাবাহিকতার অভাব, নীতিতে অস্থিরতা এবং সিদ্ধান্তে একধরনের আবেগপ্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সকালে এক অবস্থান, বিকেলে আরেক, রাতে সম্পূর্ণ বিপরীত—এমন আচরণ একটি পরাশক্তির নেতৃত্বে ভয়ংকর অনিশ্চয়তা তৈরি করে। যার ফল এখন ভোগ করছে গোটা দুনিয়া।

বিশ্ব শান্তি, ন্যায় এবং সভ্যতার মূল ভিত্তি হলো সংলাপ, পারস্পরিক সম্মান এবং আন্তর্জাতিক আইন। কিন্তু যখন একজন নেতা এই ভিত্তিগুলোকে অগ্রাহ্য করেন, তখন তিনি শুধু একটি দেশের নয়—পুরো বিশ্বের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে—“পাগল ট্রাম্পকে থামাবে কে?” প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব গণতান্ত্রিক কাঠামো। কংগ্রেস, বিচার বিভাগ এবং গণমাধ্যম—এই তিনটি স্তম্ভ যে কোনো প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক জোট ও কূটনৈতিক চাপ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো একত্রে অবস্থান নিলে কোনো একক নেতার একতরফা সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানানো সম্ভব।
তৃতীয়ত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জনমত।

ইতিহাস প্রমাণ করে, জনগণের চাপই শেষ পর্যন্ত নীতিনির্ধারণে বড় পরিবর্তন আনে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে শুরু করে ইরাক যুদ্ধ—সব ক্ষেত্রেই জনমতের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পরিশেষে বলতে চাই,আজকের বিশ্বে ট্রাম্প যে সীমাহীন অস্থিরতা সৃষ্টি করে করেছেন,সেটি মোকাবিলা করার দায়িত্ব কেবল একজন ব্যক্তি বা একটি দেশের নয়। বরং পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের। ট্রাম্প কে কেবলমাত্র “পাগল” বলে আখ্যা দিলেই হবে না। বরং যে করেই হোক সবাই মিলে তাকে থামাতে হবে। তা না হলে পৃথিবীর ৮০০ কোটি মানুষকেই এর ফল ভোগ করতে হবে। সুতরাং, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্বের সকল শক্তির সম্মিলিতভাবে এখনই রুখে দাঁড়ানোর কোনো বিকল্প দেখছি না।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin