আজ বুধবার, ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৮শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৩শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি
আজ বুধবার, ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৮শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৩শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

নির্বাচনী ইশতেহার যেন ভন্ডামীর রঙিন পোস্টার!

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে কদিন আগেই শেষ হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারের মহড়া। বিএনপি, জামায়াতে ইসলাম ও এনসিপি একে একে যে ইশতেহার ঘোষণা করেছে, তা পড়লে মনে হয় এ দেশের মানুষ বুঝি আর মাটির বাসিন্দা থাকবে না; কয়েক দিনের মধ্যেই তারা স্বর্গের নাগরিক হয়ে যাবে। দারিদ্র্য উধাও হবে, দুর্নীতি বিলীন হবে, ন্যায়বিচার ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে—এমন এক অলীক স্বপ্নের পসরা সাজানো হয়েছে ইশতেহারের পাতায় পাতায়।

এই ইশতেহারগুলো পড়তে গিয়ে বারবার মনে পড়ে যায় ছোটবেলার সেই চিরচেনা ক্যানভাসারের কথা—যে বাজারে দাঁড়িয়ে এক নিঃশ্বাসে বলে যায়,
“পিঠ ব্যাথা,পেট ব্যথা, মাথা ব্যথা, কোমর ব্যথা—সব ব্যথা সেরে যাবে মাত্র দুই টাকার পুরিন্দায়!”
রাজনৈতিক নেতারা ইন্টারনেট এবং তথ্যপ্রযুক্তির যুগেও আজ ইশতেহারের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ঠিক তাই করছেন। পার্থক্য হচ্ছে—এখানে পুরিন্দার দাম জনগণের ভবিষ্যৎ।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচনী ইশতেহার নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতার পর গত ৫৫ বছরে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে, তার প্রায় প্রতিটিতেই জনগণকে স্বপ্ন দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—ইশতেহার আর শাসনামলের বাস্তবতার মধ্যে ফারাক ছিল আকাশ-পাতাল।

ক্ষমতায় গেলে ইশতেহার হয়ে ওঠে পুরোনো কাগজ। জনগণের আকাঙ্ক্ষা তখন ক্ষমতার অলিন্দে হারিয়ে যায়। এই ইতিহাস সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রযোজ্য বিএনপির ক্ষেত্রে, কারণ জামায়াতে ইসলাম ও এনসিপি এখনো সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনার সুযোগ পায়নি।

বিএনপি অতীতে একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামল এবং আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম মেয়াদ বাদ দিলে বাকি সময়গুলোতে বিএনপি জনগণের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে—এ কথা এখন আর মতামত নয়, রাজনৈতিক বাস্তবতা।

প্রতিটি নির্বাচনে বিএনপি উন্নয়ন, সুশাসন, দুর্নীতি দমনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই ইশতেহারের সিংহভাগই বাস্তবায়ন হয়নি, নয়তো বাস্তবায়নের কোনো আন্তরিক প্রচেষ্টাই দেখা যায়নি।
উপরন্তু পাঁচবার দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। এটা কোনো বিরোধী দলের প্রচারণা নয়—এটা আন্তর্জাতিক সংস্থার নথিভুক্ত সত্য।

আজকের দিনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকটগুলো কী? দুর্নীতি,চাঁদাবাজি, দখলবাজি,মাদক ও সন্ত্রাস।

অথচ বিস্ময়করভাবে বিএনপি এবারের ইশতেহারে চাঁদাবাজি ও দখলবাজি শব্দদুটি প্রায় অনুপস্থিত। দুর্নীতি নির্মূলের বুলি আছে, কিন্তু যে অপরাধগুলো মাঠপর্যায়ে মানুষকে প্রতিদিন নিঃস্ব করছে—সেগুলো নিয়ে কার্যত নীরব। এই নীরবতা কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়। এটি একটি রাজনৈতিক সংকেত। অর্থাৎ ক্ষমতায় গেলে এই ব্যবস্থার মৌলিক কোনো পরিবর্তন হবে না।

বাংলাদেশে চাঁদাবাজি ও দখলবাজি কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। এগুলো রাজনৈতিক অর্থনীতির অংশ। দলীয় পরিচয় ছাড়া বড় পরিসরে চাঁদাবাজি বা দখলবাজি সম্ভব নয়। রাজনৈতিক ছত্রছায়া ছাড়া মাদক ব্যবসা কিংবা সন্ত্রাস টিকে থাকতে পারে না—এ কথা বাংলাদেশের শিশুও জানে।

বিএনপির সর্বশেষ শাসনামলে এই অপরাধগুলোর ভয়াবহ বিস্তার ছিল—এটা ইতিহাসের নথিভুক্ত সত্য। ফলে আজ যখন বিএনপি এসব বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়, তখন মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে যে এই নীরবতা কি ভবিষ্যতের পূর্বাভাস?

চট্টগ্রাম ১৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী সরোয়ার জামাল নিজাম
নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলছেন,’দয়া করে ১২ তারিখ পর্যন্ত কেউ চাঁদাবাজি করবেন না’! তার মানে কি? ১২ তারিখের পর চাঁদাবাজি করতে সমস্যা নেই!

সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য—বিএনপি’র প্রায় ৬০ শতাংশ প্রার্থী ঋণ ঋণগ্রস্ত। ৫৯ জন প্রার্থী ঋণ খেলাপি।
অর্থাৎ ঋণ খেলাপিদের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিতে চায় বিএনপি। আমার প্রশ্ন হচ্ছে-
যে মানুষ ব্যাংকের টাকা ফেরত দেয় না, সে কীভাবে জনগণের দায়িত্ব পালন করবে?
যে মানুষ ক্ষমতার ছায়ায় চাঁদা তোলে, সে কীভাবে দুর্নীতি দমন করবে? আমি মনে করি, এই প্রার্থী তালিকাই বিএনপির আসল ইশতেহার। কাগজের ইশতেহার নয়।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলাম ও এনসিপির ইশতেহারে একটি বিষয় স্পষ্ট—চাঁদাবাজি, দখলবাজি, দুর্নীতি, মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান। শুধু কাগজে নয়, তাদের প্রায় প্রতিটি নির্বাচনী জনসভায় এই বিষয়গুলো ধারাবাহিকভাবে উচ্চারিত হচ্ছে।
এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক দিক। কারণ অন্তত তারা সমস্যাগুলোকে স্বীকার করছে এবং প্রকাশ্যে অবস্থান নিচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো—তারা এখনো রাষ্ট্রক্ষমতায় যায়নি। ফলে তাদের ইশতেহার এখনো পরীক্ষার মুখোমুখি হয়নি।

ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, ক্ষমতার আগে অনেকেই সাধু কিন্তু ক্ষমতায় গেলে তাদের চরিত্র বদলে যায়। তাই জামায়াত ও এনসিপির ক্ষেত্রে প্রশ্নটা রয়েই যায় যে,ক্ষমতার মসনদে বসলে তারা কি একই অবস্থানে থাকবে?

বাংলাদেশের চাঁদাবাজি, দখলবাজি, দুর্নীতি ও মাদক সমস্যার মূল কোথায়?
মূলটা লুকিয়ে আছে ভোগবাদী রাজনীতিতে।
রাজনৈতিক নেতাদের বিলাসবহুল বাড়ি, গাড়ি, বিদেশ ভ্রমণ, অভিজাত জীবনযাপন—এই অর্থ কোথা থেকে আসে? দলীয় চাঁদা দিয়ে কি এই জীবনযাপন সম্ভব?

বাস্তবতা হলো, এই বিলাসের রসদ আসে চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও মাদক অর্থনীতি থেকে।
এ কারণেই এসব অপরাধ রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় টিকে আছে এবং ক্রমশ তা বিস্তার লাভ করছে। ফলে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় গেলে এই ব্যবস্থার মূলে আঘাত করতে চায় না।

একটি নির্বাচনী ইশতেহার হওয়া উচিত রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিগত চুক্তি। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় ইশতেহার অনেক সময় হয়ে ওঠে ভোট আদায়ের প্রতারণামূলক পুস্তিকা।
৫৫ বছরের ইতিহাস বলছে—
ইশতেহার যত আকর্ষণীয়, বাস্তবায়ন তত দুর্বল।
প্রতিশ্রুতি যত বড়, দায়িত্ববোধ তত ছোট।

আজকের ইশতেহারগুলোও সেই পুরোনো পথেই হাঁটছে। স্বর্গের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু নরকের বাস্তবতা বদলানোর স্পষ্ট রূপরেখা নেই।

শেষ কথা:
স্বর্গের স্বপ্ন নয়, সত্যের সাহস চাই। বাংলাদেশের মানুষ আর স্বর্গের গল্প শুনতে চায় না। তারা চায় বাস্তব পরিবর্তন। চাঁদাবাজমুক্ত রাস্তা,
দখলবাজমুক্ত জমি, মাদকমুক্ত যুবসমাজ, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন।
রঙিন ইশতেহার দিয়ে এসব পরিবর্তন সম্ভব নয়। সুতরাং ক্যানভাসারের মতো ফাঁকা বুলি ছুড়ে আর লাভ নেই। মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন কেবল তখনই সম্ভব যখন রাজনৈতিক দলগুলো ভোগবাদী ও ভন্ডামির রাজনীতি ত্যাগ করে সত্যিকারের জবাবদিহিমূলক শাসনের পথে হাঁটবে। তাই ত্রয়োদশ নির্বাচন সামনে রেখে জনগণের একটাই প্রশ্ন- এই ইশতেহারগুলো কি আবারও ইতিহাসের ডাস্টবিনে পড়বে, নাকি এবার সত্যিই কেউ কথা রাখবে?

লেখক:সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin