আজ বুধবার, ৮ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৪শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৩শে মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি
আজ বুধবার, ৮ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৪শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৩শে মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

অর্থ পাচার ও দুর্নীতিতে অভিযুক্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে: সংকটে প্রাইমএশিয়া

বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে যখন শিক্ষাবিদের পরিবর্তে দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা অবস্থান করেন, তখন প্রশ্ন ওঠে—সেখানে কি জ্ঞানচর্চা হবে, নাকি দুর্নীতির সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে?

প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে প্রকাশিত অভিযোগগুলো বাংলাদেশের বেসরকারি উচ্চশিক্ষা খাতের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; বরং দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জবাবদিহি, সুশাসন এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ৯৩ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম, যা ২০১৯ সালের হিসাব অনুযায়ী সুদসহ ১৪২ কোটিতে পৌঁছেছে। এছাড়া জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে ৭২ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অর্থ যদি উন্নয়ন, গবেষণা, শিক্ষক নিয়োগ কিংবা শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ব্যয় না হয়ে অনিয়মের মাধ্যমে অপচয় হয়, তবে তার ক্ষতি শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদেরই বহন করতে হয়।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম দুর্নীতির মামলায় কারাগারে রয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে সাবেক বীমা কোম্পানির দায়িত্বে থাকাকালে বিপুল আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে মামলা রয়েছে। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কে এম খালেদ এবং ভারপ্রাপ্ত ট্রেজারার কামাল হোসেন হাওলাদারও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার আসামি বলে জানা যায়।

সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। তারা ভর্তি হয়েছিলেন একটি স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার আশায়। কিন্তু প্রশাসনিক অস্থিরতা, আর্থিক অনিয়ম এবং নেতৃত্বের সংকটের কারণে যদি প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়, তাহলে তাদের ডিগ্রি, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।

আরও বিস্ময়কর বিষয়, প্রতিষ্ঠার বহু বছর পরও বিশ্ববিদ্যালয়টি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসে পুরোপুরি স্থানান্তরিত হতে পারেনি। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য স্থায়ী ক্যাম্পাস শুধু অবকাঠামো নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গবেষণার পরিবেশ এবং একাডেমিক মান নিশ্চিত করার অন্যতম ভিত্তি। অথচ বছরের পর বছর ধরে এ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়া পরিচালনা পর্ষদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও এর ফাউন্ডেশনের কাছে একটি বীমা প্রতিষ্ঠানের সুদসহ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। যদি এই আর্থিক দায় সত্য হয়, তবে সেটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুতর সংকেত। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বেতন, শিক্ষার মান, গবেষণা কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থীদের সেবা—সবকিছুই ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।

বিশ্বের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাফল্যের অন্যতম কারণ হলো সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি। সেখানে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে স্বাধীন তদন্ত হয়, প্রয়োজনে তারা পদত্যাগ করেন এবং প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভবন নয়, তার বিশ্বাসযোগ্যতা।

বাংলাদেশেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন রয়েছে। সেই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু আইন থাকলেই হবে না; তার কার্যকর প্রয়োগও জরুরি। যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ বারবার আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি বা স্বার্থের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দ্রুত ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

শিক্ষা খাত কখনোই ব্যবসায়িক লুটপাটের ক্ষেত্র হতে পারে না। একজন অভিভাবক তার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চিত অর্থ ব্যয় করেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে। সেই অর্থ যদি শিক্ষার উন্নয়নের পরিবর্তে অনিয়মে হারিয়ে যায়, তবে তা শুধু আর্থিক অপরাধ নয়; এটি একটি প্রজন্মের স্বপ্নের সঙ্গে প্রতারণা।

এই পরিস্থিতিতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, অভিযোগগুলোর স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিচারাধীন গুরুতর আর্থিক অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী পদে থাকার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রম যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সে জন্য প্রয়োজনে অন্তর্বর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। চতুর্থত, আর্থিক নিরীক্ষা, সম্পদের হিসাব এবং পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রম জনসমক্ষে প্রকাশের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

একটি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়া কখনোই কাম্য নয়। কারণ এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নিরপরাধ শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীরা। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা নয়; বরং দুর্নীতিকে বিচারের মুখোমুখি করে প্রতিষ্ঠানকে সুস্থ ও কার্যকর অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।

বাংলাদেশ আজ জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ার স্বপ্ন দেখছে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে সততা, মেধা ও জবাবদিহি হবে সর্বোচ্চ মূল্যবোধ। দুর্নীতি, অর্থ পাচার কিংবা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে কলঙ্কিত নেতৃত্ব দিয়ে সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।

প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্য আদালত ও তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে। কিন্তু একটি বিষয় এখনই স্পষ্ট—উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুশাসনের বিকল্প নেই। শিক্ষা যদি দুর্নীতির ছায়ায় আচ্ছন্ন হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো জাতির ভবিষ্যৎ।

পরিশেষে বলতে চাই,শিক্ষা কোনো ব্যবসায়িক প্রকল্প নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। যে রাষ্ট্র তার বিশ্ববিদ্যালয়কে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও জবাবদিহিহীনতার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে না, সে রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়নেও পিছিয়ে পড়ে। তাই প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ, দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে নয়, বরং বাংলাদেশের সমগ্র উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার স্বার্থেও অপরিহার্য।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin