বাংলাদেশে গরিব মানুষের জীবনের দাম কত? এই প্রশ্নটি আমরা বহুবার করেছি। প্রতিবারই কোনো না কোনো মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সামনে সেই একই নিষ্ঠুর সত্যকে উন্মোচন করেছে—এই দেশে টাকার কাছে মানুষের জীবন খুবই তুচ্ছ। আর যদি সেই টাকার মালিক হয় বড় কোনো কর্পোরেট গোষ্ঠী, তাহলে সত্য পর্যন্ত উচ্চারণ করাও হয়ে যায় এক ধরনের অপরাধ।
রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক রাতে ছয় নবজাতকের মৃত্যু শুধু একটি হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, কর্পোরেট প্রভাব, বিচারহীনতা এবং মিডিয়ার নৈতিক দেউলিয়াত্বের এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি।
এক থেকে তিন দিন বয়সী ছয়টি শিশু। পৃথিবীর আলো ঠিকমতো দেখার আগেই তারা চলে গেল। মায়ের বুকের দুধ পর্যন্ত ভালোভাবে খেতে পারেনি। অথচ তাদের মৃত্যু নিয়ে আমরা এখনো “সম্ভাব্য কারণ”, “টেকনিক্যাল ফল্ট”, “গ্যাস লিক”, “ভেন্টিলেশন সমস্যা”—এসব শব্দের গোলকধাঁধায় ঘুরছি। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি কেউ উচ্চারণ করছে না—এই মৃত্যুর দায় কার?
আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, প্রায় সব গণমাধ্যমই হাসপাতালের নাম বললেও মালিকপক্ষের পরিচয়টি অত্যন্ত সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছে। যেন এক অলিখিত নিষেধাজ্ঞা কাজ করছে। যেন “আকিজ গ্রুপ” নামটি উচ্চারণ করলেই বিজ্ঞাপনের দরজা বন্ধ হয়ে যাবে।
এটাই কি সাংবাদিকতা?
একটি স্বাধীন গণমাধ্যমের প্রথম দায়িত্ব সত্য বলা। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ মিডিয়া এখন আর সত্য বলার সাহস রাখে না। তারা এখন কর্পোরেট বিজ্ঞাপনের দাসে পরিণত হয়েছে।
দেশের বড় বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো শুধু অর্থনীতিই নিয়ন্ত্রণ করছে না; তারা তথ্যপ্রবাহও নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে গণমাধ্যম আজ আর জনগণের কণ্ঠস্বর নয়, বরং কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষার ঢাল।
আমরা লক্ষ্য করলাম, ছয় নবজাতকের মৃত্যুর মতো ভয়াবহ ঘটনার পরও অধিকাংশ সংবাদে “হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ” শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু এই কর্তৃপক্ষ কারা? হাসপাতালের মালিকানা কার? কোন ব্যবসায়িক গোষ্ঠী এই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে? সেই প্রশ্নের উত্তর অধিকাংশ সংবাদেই অনুপস্থিত। কেন?
কারণ বাংলাদেশের মিডিয়া আজ বিজ্ঞাপনের বাজারে বন্দি। সত্য প্রকাশের আগে এখন হিসাব করা হয়—কোন প্রতিষ্ঠানের কত বিজ্ঞাপন আসে, কোন কর্পোরেট গ্রুপের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হবে, কোন ব্যবসায়ী ক্ষুব্ধ হবে।
এ যেন এক অদ্ভুত সময়—এখানে ছয়টি শিশু মারা যেতে পারে, কিন্তু কর্পোরেট মালিকের নাম বলা যাবে না।
আরও উদ্বেগজনক হলো, তদন্ত করতে যাওয়া সাংবাদিকদের সঙ্গেও যে আচরণ করা হয়েছে তা একটি সভ্য রাষ্ট্রে অকল্পনীয়। অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মী ও পরিচ্ছন্নতা বিভাগের লোকজন সাংবাদিকদের ধাওয়া দিয়েছে, মারধর করেছে, ক্যামেরা ভেঙেছে। অথচ এরপরও বড় বড় মিডিয়াগুলো হাসপাতালটির কর্পোরেট পরিচয় প্রকাশ করতে ভয় পেয়েছে। এটি শুধু মিডিয়ার দুর্বলতা নয়; এটি তাদের নৈতিক আত্মসমর্পণ।
বাংলাদেশের গণমাধ্যম একসময় রাষ্ট্রের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াত। সামরিক শাসন, স্বৈরাচার, দুর্নীতি—সবকিছুর বিরুদ্ধে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকরা লড়াই করেছেন। কিন্তু আজকের বাস্তবতা ভিন্ন। এখন মিডিয়া হাউজগুলো নিজেরাই বড় কর্পোরেট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ব্যাংক, বীমা, রিয়েল এস্টেট, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়—সবখানেই একই গোষ্ঠীর প্রভাব। ফলে এক কর্পোরেট আরেক কর্পোরেটকে রক্ষা করে। জনগণ সেখানে কেবল দর্শক।
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ঘটনায় সেই নগ্ন বাস্তবতাই আবার সামনে এসেছে।
ঘটনার বিবরণ ভয়াবহ। রাতে এসি বন্ধ ছিল। ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন ছিল না। শিশুরা কান্না শুরু করে। একে একে তাদের শরীর নীল হয়ে যায়। পরে এনআইসিইউতে নেওয়ার পর মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, একটি আধুনিক হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে এমন পরিবেশ কীভাবে তৈরি হলো? সেখানে কি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না? অক্সিজেন মনিটরিং কোথায় ছিল? জরুরি সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা কোথায় ছিল?
আরও বিস্ময়কর হলো, হাসপাতালের কলেজ ভবনের অষ্টম তলায় একটি বেকারি কারখানার সন্ধান পাওয়ার তথ্য। একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভবনে বেকারি কারখানা! এটি কীভাবে অনুমোদন পেল? কারা অনুমতি দিল? সেখানে কোনো গ্যাস নির্গমন হচ্ছিল কি না—সেটি এখন তদন্তাধীন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এমন ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা একটি হাসপাতাল ভবনে গড়ে তোলার সাহস তারা পেল কীভাবে? কারণ এই দেশে ক্ষমতা ও টাকার কাছে জবাবদিহিতা খুবই দুর্বল।
আজ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত ভয়াবহ সংকটে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ, অব্যবস্থাপনা, দালালচক্র ও চিকিৎসাসেবার সংকট চরম পর্যায়ে। আর বেসরকারি হাসপাতালগুলো পরিণত হয়েছে ব্যবসাকেন্দ্রে। সেখানে মানবিকতার চেয়ে মুনাফার মূল্য বেশি। রোগী এখন “কাস্টমার”, চিকিৎসা এখন “প্যাকেজ”, আর হাসপাতাল এখন “কর্পোরেট ব্র্যান্ড”। এই কর্পোরেট স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ মানুষ।
একজন মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবার যখন সন্তানের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যায়, তখন তারা শুধু অর্থনৈতিক নয়, মানসিকভাবেও অসহায় অবস্থায় থাকে। তারা বিশ্বাস করে হাসপাতাল নিরাপদ। চিকিৎসক ও নার্সরা তাদের সন্তানকে বাঁচাবেন। কিন্তু যখন সেই হাসপাতালেই একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যু ঘটে, তখন মানুষের ভরসার জায়গাটিই ভেঙে পড়ে।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণের জন্য ময়নাতদন্ত পর্যন্ত হয়নি। স্বজনদের অনিচ্ছার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র কি তার দায়িত্ব এভাবে এড়িয়ে যেতে পারে? ছয় নবজাতকের অস্বাভাবিক মৃত্যু কি শুধু পারিবারিক সিদ্ধান্তের বিষয়? এখানে তো জনস্বার্থ জড়িত। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে সত্য উদঘাটন জরুরি ছিল।
বাংলাদেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি এতটাই গভীর যে মানুষ এখন আগেই ধরে নেয়—বড়লোকদের কিছু হবে না। কয়েকদিন আলোচনা হবে, তদন্ত কমিটি হবে, প্রতিবেদন জমা হবে, তারপর সব ধামাচাপা পড়ে যাবে। অতীতের অসংখ্য ঘটনার মতো এটিও হয়তো হারিয়ে যাবে নতুন কোনো সংবাদের ভিড়ে।
কিন্তু এই ঘটনার বিচার না হলে সেটি শুধু ছয়টি শিশুর প্রতি অন্যায় হবে না; পুরো জাতির প্রতি অন্যায় হবে।
সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। সম্প্রতি মিরপুরের শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দ্রুত পদক্ষেপ নিতে দেখা গেছে। ফলে মানুষ আশা করছে, এই ঘটনাতেও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হবে। কারণ এখানে শুধু অবহেলা নয়, সম্ভাব্য অপরাধমূলক গাফিলতির প্রশ্নও রয়েছে।
তদন্ত অবশ্যই নিরপেক্ষ হতে হবে। কোনো কর্পোরেট প্রভাব যেন তদন্তকে প্রভাবিত করতে না পারে। হাসপাতালের অবকাঠামো, ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা, গ্যাস লাইন, এসি সিস্টেম, বেকারি কারখানার কার্যক্রম—সবকিছু খতিয়ে দেখতে হবে। দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
একইসঙ্গে মিডিয়ার ভূমিকাও নতুন করে মূল্যায়ন করা জরুরি। যে গণমাধ্যম কর্পোরেট বিজ্ঞাপনের ভয়ে সত্য উচ্চারণ করতে পারে না, সে গণমাধ্যম জনগণের আস্থা হারাতে বাধ্য। মিডিয়া যদি ক্ষমতাবানদের নাম বলতে ভয় পায়, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?
আজ প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশের গণমাধ্যম কি সত্যিই স্বাধীন? নাকি তারা কেবল কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকদের মুখপত্র?
ছয় নবজাতকের মৃত্যু আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমরা দেখলাম, সমাজের এক বড় অংশ বরং সত্যকে আড়াল করতেই বেশি ব্যস্ত। এই প্রবণতা ভয়ঙ্কর। কারণ যেখানে সত্য চাপা পড়ে, সেখানে ন্যায়বিচারও ধীরে ধীরে মারা যায়।
এই শিশুদের কেউ রাজনীতি বুঝত না, কর্পোরেট শক্তি বুঝত না, বিজ্ঞাপনের বাজার বুঝত না। তারা শুধু পৃথিবীতে এসেছিল বাঁচার জন্য। কিন্তু আমরা তাদের নিরাপদ একটি হাসপাতালও দিতে পারিনি। এই ব্যর্থতা শুধু একটি হাসপাতালের নয়। এটি পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার ব্যর্থতা। এটি আমাদের গণমাধ্যমের ব্যর্থতা। আমাদের নৈতিকতার ব্যর্থতা। সুতরাং আমাদের ঘুরে দাঁড়াবার এখনই সময়। না হলে ইতিহাস আমাদের কাউকে ক্ষমা করবে না।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com