আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু সময় আছে, যেগুলো মনে পড়লে আজও মানুষের ভেতর এক ধরনের শীতল আতঙ্ক কাজ করে। ওয়ান-ইলেভেন ছিল তেমনই এক সময়। সেই সময়ে শুধু ক্ষমতার পালাবদল হয়নি; বরং ভয়ের এক অদৃশ্য রাজত্ব তৈরি হয়েছিল। গভীর রাতে গ্রেপ্তার, গোপন জিজ্ঞাসাবাদ, নির্যাতনের অভিযোগ, চরিত্র হননের প্রচারণা—সব মিলিয়ে দেশের রাজনীতি যেন এক অন্ধকার অধ্যায়ে ঢুকে পড়েছিল।
সেই অন্ধকারের কেন্দ্রেই ছিল জিয়া পরিবার। খালেদা জিয়া-কে দেশছাড়া করার চেষ্টা, তারেক রহমান-এর ওপর অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ, আরাফাত রহমান কোকো-কে গ্রেপ্তার করে মানসিক চাপ সৃষ্টি—এসব কি শুধুই রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ছিল, নাকি একটি পরিবারকে রাজনীতি থেকে মুছে ফেলার সুপরিকল্পিত চেষ্টা?
আজ বহু বছর পর বিভিন্ন অনুসন্ধান, জবানবন্দি ও স্বীকারোক্তিতে সেই সময়ের অনেক অজানা ঘটনা সামনে আসছে। আর সেই কারণেই নতুন করে প্রশ্ন উঠছে—জিয়া পরিবারকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল কারা?
বিশেষ করে দেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসের জীবন্ত কিংবদন্তি ও আমার পরম শ্রদ্ধেয় মতিউর রহমান চৌধুরীর সাম্প্রতিক অনুসন্ধান, রিমান্ডে দেওয়া বক্তব্য এবং তৎকালীন কিছু সামরিক কর্মকর্তার জবানবন্দি নতুন করে সেই প্রশ্নকে সামনে এনেছে। আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-কে ঘিরে যে তথ্যগুলো বেরিয়ে এসেছে, তা শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নয়—বরং রাষ্ট্রীয় নির্মমতারও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।
২০০৭ সালের ৭ মার্চ। ঢাকার ক্যান্টনমেন্টের মইনুল হোসেন রোডের বাসভবন। সেই রাতটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় অধ্যায় হয়ে আছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের নির্দেশে কর্নেল (অব.) ইমরান কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই তারেক রহমানকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যান।
অভিযোগ রয়েছে, পুরো সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল সেনা সদর দপ্তরে, যেখানে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ টি এম আমিন।
গাড়িতে তোলার পর তারেক রহমানের মুখ কালো কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হয়। তিনি জানালা খোলার অনুরোধ করেছিলেন—কিন্তু তা নাকচ করা হয়। তারপর তাকে নেওয়া হয় ডিজিএফআই পরিচালিত জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ‘জেআইসি’ নামটি আজও আতঙ্ক, গোপন নির্যাতন এবং অন্ধকার জিজ্ঞাসাবাদের প্রতীক হয়ে আছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়ঙ্কর সব অভিযোগ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চোখ বেঁধে রাখা, হাত বেঁধে ঝুলিয়ে নির্যাতন, অমানবিক শারীরিক ও মানসিক চাপ—এসব কেবল কোনো রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে নয়, বরং একজন মানুষের অস্তিত্ব মুছে দেওয়ার চেষ্টা বলেই প্রতীয়মান হয়।
তৎকালীন কর্মকর্তাদের জবানবন্দি অনুযায়ী, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার-এর নির্দেশে জোরপূর্বক একটি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়, যেখানে তারেক রহমানকে নিজের ভুল স্বীকার করে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও ভয়াবহ অভিযোগ হলো—তাকে সিলিংয়ের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। ওয়ারেন্ট অফিসারদের ভাষ্য অনুযায়ী, “পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঝুলন্তই থাকবে”—এমন নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
একপর্যায়ে তিনি নিচে পড়ে কোমরে গুরুতর আঘাত পান। পরবর্তীতে বছরের পর বছর চিকিৎসা নিতে হয়েছে তাকে।
এই অভিযোগগুলো যদি সত্য হয়, তবে তা শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভয়াবহ অপব্যবহার।
সেই সময়কার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক নির্বাসন। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে তারেক রহমানকে কার্যত দেশত্যাগে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগে তার কাছ থেকে একটি অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, শুধু কারাগার নয়—বাংলাদেশের রাজনীতি থেকেও তাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল।
আজ ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাস হলো—যে মানুষটিকে একসময় রাজনীতি থেকে মুছে ফেলতে চাওয়া হয়েছিল, সেই তারেক রহমান-ই আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রবাসজীবন, শারীরিক কষ্ট, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং অবিরাম প্রচারণার মধ্য দিয়েও তিনি রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াননি।
এই জায়গাটিই পুরো ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক বলে আমি মনে করি। কারণ ওয়ান-ইলেভেন কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন ছিল না; বরং এটি ছিল রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের এক সুসংগঠিত অপপ্রচেষ্টা। সেখানে রাষ্ট্রযন্ত্রের কিছু অংশ, গোয়েন্দা সংস্থা, প্রশাসনিক শক্তি এবং প্রভাবশালী মহলের সমন্বয় ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
আর এই প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমের ভূমিকাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সমালোচকদের মতে, দ্য ডেইলি স্টার এবং প্রথম আলো সেই সময় ধারাবাহিকভাবে এমন সব প্রতিবেদন ও শিরোনাম প্রকাশ করেছিল, যা জিয়া পরিবারকে জনমনে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে। অভিযোগ রয়েছে, যাচাইবিহীন, অতিরঞ্জিত কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও চরম আপত্তিকর কিছু সংবাদও প্রকাশিত হয়েছিল, যা জনমতকে প্রভাবিত করেছিল।
এই অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান এবং ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। বিভিন্ন মহলে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে—ওয়ান-ইলেভেনের সময় তারা কি কেবল সংবাদ প্রকাশ করছিলেন, নাকি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে উঠেছিলেন?
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বক্তব্যে এমনও দাবি এসেছে যে, মতিউর রহমান এবং মাহফুজ আনামের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ও বৈঠক হতো।
সুতরাং এই দাবিগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য এবং দুষ্টু তদন্তের স্বার্থে অবিলম্বে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা জরুরী বলে আমি মনে করি। ১/১১র প্রেক্ষাপট তৈরি এবং জিয়া পরিবারের চরিত্র হননে তাদের ন্যাক্কারজনক ভূমিকার কথা এ জাতি কখনোই ভুলতে পারবে না।
গণমাধ্যম একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। কিন্তু যখন কোনো গণমাধ্যম ক্ষমতার খুব কাছাকাছি চলে যায়, তখন তার স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আর যদি কখনো কোনো সংবাদমাধ্যম রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রচারণার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তবে তা শুধু সাংবাদিকতার সংকট নয়—গণতন্ত্রেরও সংকট। এ দুটি পত্রিকার জনস্বার্থ বিরোধী ভূমিকাই পতিত হাসিনার ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
এ কারণেই আজ অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—যদি ওয়ান-ইলেভেনের সামরিক ও প্রশাসনিক সংশ্লিষ্টদের বিচার হয়, তবে সেই সময়ের প্রভাবশালী প্রচারণা কাঠামো নিয়েও কি প্রশ্ন উঠবে না? একই প্রক্রিয়ার এক অংশের বিচার হবে, আর অন্য অংশ সম্পূর্ণ প্রশ্নের বাইরে থাকবে—এমন হলে সেটি কি নির্বাচিত বিচার হিসেবে বিবেচিত হবে না?
কারণ ন্যায়বিচারের মূল শক্তি হলো তার নিরপেক্ষতা। একই ঘটনায় একদল দায়ী হবে, আর অন্যরা সম্পূর্ণ দায়মুক্ত থাকবে—এমন ধারণা সমাজে বিচারের গ্রহণযোগ্যতাকে সম্পূর্ণরূপে দুর্বল করে দেয়।
তবে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা জরুরি বলে আমি মনে করি। অভিযোগ আর প্রমাণ এক নয়। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অবশ্যই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়া উচিত। বিচার কখনো আবেগের ভিত্তিতে হতে পারে না। পাশাপাশি আমি এও বলব যে, ইতিহাস পুনর্মূল্যায়ন করা এবং দায় নির্ধারণের দাবি জানানো—এগুলো গণতান্ত্রিক সমাজের বৈধ অধিকার।
ওয়ান-ইলেভেনের পুরো ঘটনাপ্রবাহ আমাদের একটি কঠিন বাস্তবতা শিখিয়েছে—গণতন্ত্র কেবল ব্যালটের মাধ্যমে টিকে থাকে না; এটি টিকে থাকে প্রতিষ্ঠানগুলোর সততা, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রীয় সংযমের ওপর।
যখন রাষ্ট্র প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার মানসিকতায় পরিচালিত হয়, যখন নির্যাতনকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যখন গণমাধ্যমের একটি অংশ ক্ষমতার ভাষ্যকে প্রশ্নহীনভাবে বহন করে—তখন গণতন্ত্র ধীরে ধীরে ভেতর থেকে ক্ষয়ে যেতে শুরু করে এবং ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করে।
তাই প্রশ্নটি শুধু জিয়া পরিবারকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে। রাষ্ট্র কি কখনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার যন্ত্রে পরিণত হতে পারে? গণমাধ্যম কি জনস্বার্থের পরিবর্তে ক্ষমতার স্বার্থে ব্যবহৃত হতে পারে? এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ইতিহাসের বিচার কি কখনো সম্পূর্ণ হয়, যদি সেই ইতিহাসের সব চরিত্রকে সমানভাবে মূল্যায়ন না করা হয়?
সময়ের স্রোত অনেক কিছু বদলে দেয়। কিন্তু ইতিহাসের ক্ষত সহজে মুছে যায় না। সেই ক্ষতই একদিন ফিরে এসে জাতির সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে—ক্ষমতার জন্য আমরা কতদূর গিয়েছিলাম, আর মানবিকতার কতটা হারিয়েছিলাম? সুতরাং ১/১১ চক্রের পূর্ণাঙ্গ বিচার এবং প্রকৃত সত্যের উন্মোচনই কেবল এসব প্রশ্নের যথার্থ উত্তর দিতে পারে। তা না হলে আবারও অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি।
লেখক: সাংবাদিক কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com