ফুটবল বিশ্বকাপ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব। চার বছর পরপর এই মহাযজ্ঞে অংশ নেওয়ার স্বপ্ন দেখে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ। বাংলাদেশের মানুষও সেই স্বপ্ন দেখে। কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী বিশ্বকাপের রাত জেগে খেলা দেখেন, প্রিয় দলের পতাকা ওড়ান, আবেগে ভাসেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশ এখনো বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে খেলতে পারেনি।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে,বাংলাদেশ কি কখনো বিশ্বকাপে যায়নি? আমার মনে হয়, গেছে। বারবার গেছে। একজন মানুষের হাত ধরে গেছে। একজন সাংবাদিকের কলমের মাধ্যমে গেছে। একজন স্বপ্নবাজ, কর্মনিষ্ঠ, চিরতরুণ মানুষের নিরলস অভিযাত্রার মধ্য দিয়ে গেছে। তিনি মতিউর রহমান চৌধুরী।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের এক জীবন্ত কিংবদন্তি। একজন সম্পাদক। একজন বিশ্লেষক। একজন অসাধারণ লেখক। একই সঙ্গে একজন দুর্দান্ত ক্রীড়াপ্রেমী। এমন একজন মানুষ, যিনি গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে উপস্থিত থেকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে চলেছেন।
বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলেনি, কিন্তু মতিউর রহমান চৌধুরী বিশ্বকাপের মাঠে দাঁড়িয়ে বিশ্বকে বাংলাদেশের কথা শুনিয়েছেন।
১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এক কিংবদন্তির জন্ম দিয়েছিল। ডিয়েগো ম্যারাডোনার জাদুকরী নৈপুণ্যে মুগ্ধ হয়েছিল পৃথিবী। সেই বিশ্বকাপই তরুণ সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরীর মনেও এক নতুন স্বপ্নের জন্ম দেয়। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, বিশ্বকাপ কেবল ফুটবল নয়; এটি মানবসভ্যতার এক বৈশ্বিক মিলনমেলা।
সেই উপলব্ধি থেকেই জন্ম নেয় বিশ্বকাপের মঞ্চে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
পরে এক সময় ম্যারাডোনার সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ হয় তার। সেই সাক্ষাৎকারের একটি স্মৃতি আজও বাংলাদেশের ক্রীড়া সাংবাদিকতার ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। বাংলাদেশের নাম শুনে ম্যারাডোনা বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। বলেছিলেন, বাংলাদেশ নামে একটি দেশ আছে তা তিনি জানতেন না।
শুনতে কষ্টের হলেও এটি ছিল সেই সময়ের বাস্তবতা।কিন্তু এর পরের গল্পটি গৌরবের। একজন বাংলাদেশি সাংবাদিকের মাধ্যমে বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলারের কাছে বাংলাদেশের পরিচয় পৌঁছে যায়। বিশ্ব ফুটবলের মহাতারকার সঙ্গে আলাপচারিতায় উচ্চারিত হয় বাংলাদেশের নাম। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের উপস্থিতির এক প্রতীকী মুহূর্ত ছিল সেটি।
মতিউর রহমান চৌধুরীর বিশ্বকাপযাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা ১৯৯০ সালে ইতালিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের মাধ্যমে। এরপর একে একে সাতটি বিশ্বকাপ কভার করেছেন তিনি। বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় এটি এক অনন্য রেকর্ড। মতিউর রহমান চৌধুরী যখন প্রথম বিশ্বকাপ কভার করতে যান, তখন বাংলাদেশের আর কোনো সাংবাদিক সেই মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন না।
এটি শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে একটি মাইলফলক।
বিশ্বকাপ কভার করা মানে কেবল ম্যাচের ফলাফল পাঠানো নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দীর্ঘ প্রস্তুতি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, ভাষাগত দক্ষতা, মাঠপর্যায়ে উপস্থিতি এবং অসাধারণ পেশাদারিত্ব। বিশ্বের হাজারো সাংবাদিকের ভিড়ে নিজের অবস্থান তৈরি করাও সহজ নয়।
কিন্তু মতিউর রহমান চৌধুরী সেই কঠিন কাজটি করেছেন ধারাবাহিকভাবে। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, তিনি মূলত ক্রীড়া প্রতিবেদক ছিলেন না। তার পরিচয় ছিল একজন কূটনৈতিক প্রতিবেদক হিসেবে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহ ছিল তার কাজের প্রধান ক্ষেত্র।
কিন্তু প্রকৃত ভালোবাসা মানুষকে সীমা ভাঙতে শেখায়।
ফুটবলের প্রতি তার গভীর অনুরাগই তাকে বিশ্বকাপের পথে নিয়ে যায়। এখানেই তিনি ব্যতিক্রম।
আজকের দিনে অনেকেই পেশাকে চাকরি হিসেবে দেখেন। কিন্তু মতিউর রহমান চৌধুরী পেশাকে দেখেছেন দায়িত্ব হিসেবে, এক ধরনের সাধনা হিসেবে।
সে কারণেই ৭৪ বছর বয়সেও তিনি থেমে থাকেননি।
আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত ২৩তম ফুটবল বিশ্বকাপ কভার করতে তিনি আবারও পাড়ি জমিয়েছেন হাজার হাজার মাইল দূরের পথে।
যে বয়সে অনেক মানুষ অবসরের শান্ত জীবন বেছে নেন, সেই বয়সে তিনি স্টেডিয়াম থেকে স্টেডিয়ামে ছুটছেন, সংবাদ সংগ্রহ করছেন, বিশ্লেষণ লিখছেন, পাঠকদের জন্য বিশ্বকাপকে জীবন্ত করে তুলছেন।
এমন কর্মস্পৃহা সত্যিই বিরল।
বিশ্বকাপে যাওয়ার কয়েকদিন আগে তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়েছিল। জানতে চেয়েছিলাম কেমন আছেন। তিনি সংক্ষিপ্ত একটি বার্তায় জানালেন—বিশ্বকাপ কভার করতে আমেরিকায় যাচ্ছেন, ফিরে এসে সময় দেবেন।
প্রথমে আমি অবাক হয়েছিলাম। তারপর নিজেকেই বলেছিলাম—অবাক হওয়ার কী আছে? তিনি তো মতিউর রহমান চৌধুরী। যিনি কখনো বয়সের কাছে হার মানেননি। যিনি ক্লান্তিকে পরাজিত করেছেন কর্মের শক্তিতে। যিনি প্রমাণ করেছেন, মানুষের বয়স বাড়ে, কিন্তু স্বপ্নের কি কখনো বয়স হয়!
মতিউর রহমান চৌধুরীর লেখার কথা আলাদাভাবে বলতে হয়। বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় পাঠককে প্রথম বাক্য থেকে শেষ লাইন পর্যন্ত ধরে রাখার যে অসাধারণ ক্ষমতা খুব কম লেখকের আছে, মতিউর রহমান চৌধুরী তাদের অন্যতম।
তার বাক্য ছোট। ভাষা সহজ। কিন্তু প্রভাব গভীর।
তিনি জটিল বিষয়কে সহজ করে বলতে পারেন। তথ্যকে গল্পে রূপ দিতে পারেন। বিশ্লেষণকে প্রাণবন্ত করে তুলতে পারেন। পাঠক তার লেখা পড়েন শুধু তথ্য জানার জন্য নয়, পড়েন এক ধরনের মানসিক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা লাভের জন্য। এটাই একজন বড় লেখকের পরিচয়।
তবে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত তার মানবিকতা। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে অসংখ্য অর্জন, সম্মান ও সাফল্য এসেছে। কিন্তু তার মধ্যে অহংকারের লেশমাত্র নেই। নতুনদের প্রতি তার আন্তরিকতা, সহকর্মীদের প্রতি তার শ্রদ্ধাবোধ এবং মানুষের সঙ্গে সহজভাবে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা তাকে আরও বড় করে তুলেছে।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে অনেক বড় বড় নাম আছে। কিন্তু খুব কম মানুষই আছেন, যাদের সাফল্য এবং বিনয় একই উচ্চতায় অবস্থান করে।
মতিউর রহমান চৌধুরী সেই বিরল মানুষদের একজন।
তবে মতিউর রহমান চৌধুরীর অবদানকে শুধু বিশ্বকাপ কভারেজ বা ক্রীড়া সাংবাদিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখলে তার প্রতি অবিচার করা হবে। বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে সত্য, ন্যায়, গণতন্ত্র এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে যে কয়েকজন সাংবাদিক আপসহীন অবস্থান নিয়ে আজ কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়েছেন, মতিউর রহমান চৌধুরী তাদের অন্যতম।
একাত্তরের রণাঙ্গনে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করেছেন। নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অর্থাৎ তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। এই পরিচয়টিও তিনি কখনো সামনে আনতে চাননি। বরং তিনি এখনো একাত্তরের মতোই লড়াই করে চলেছেন সকল অন্যায় অবিচার আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে।
দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি কখনো ক্ষমতার তাবেদারি করেননি। কোনো সরকারের মুসাহেবি করেননি। রাষ্ট্রক্ষমতার আশীর্বাদ লাভের জন্য সত্যকে বিসর্জন দেননি। বরং সময়ে সময়ে ক্ষমতার অপব্যবহার, অন্যায়, অবিচার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন।
এর মূল্যও তাকে কম দিতে হয়নি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি হয়রানি, মামলা-মোকদ্দমা, নিপীড়ন এবং কারাবরণের মুখোমুখি হয়েছেন। ক্ষমতাসীনদের অসন্তোষের শিকার হয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আদালতের বিচারে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন।
সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে সাময়িকভাবে তিনি হয়তো ভোগান্তির শিকার হয়েছেন, কিন্তু ইতিহাসের আদালতে বারবার সত্যই বিজয়ী হয়েছে।
বিশেষ করে পতিত শেখ হাসিনা সরকারামলে নানা সংকটময় সময়ে তার ভূমিকা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যখন ভিন্নমত প্রকাশের পরিসর সংকুচিত ছিল, তখনও তিনি জনগণের স্বার্থ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। এজন্য তাকে নানামুখী চাপ, হয়রানি ও মানসিক নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু তিনি আপস করেননি।
একজন সাংবাদিকের প্রকৃত শক্তি তার কলমের স্বাধীনতা। মতিউর রহমান চৌধুরী সেই স্বাধীনতার মূল্য নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে পরিশোধ করেছেন।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় তার অসামান্য অবদান, পেশাগত সততা, সাহসিকতা এবং জাতীয় জীবনে দীর্ঘ অবদানের পরও তিনি এখনো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননাগুলোর কোনো একটিতে ভূষিত হননি। প্রশ্ন জাগে, যদি বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, সত্যের পক্ষে নির্ভীক অবস্থান এবং পেশাগত সততা রাষ্ট্রের স্বীকৃতি না পায়, তাহলে কেবল বক্তৃতা-বিবৃতিতে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার আহ্বান জানিয়ে কতটুকু লাভ?
রাষ্ট্রের সম্মাননা কোনো ব্যক্তির মর্যাদা তৈরি করে না; বরং অনেক সময় কোনো ব্যক্তির কর্ম ও অবদানই রাষ্ট্রের সম্মাননাকে মর্যাদা দেয়। মতিউর রহমান চৌধুরী সেই বিরল মানুষদের একজন, যাদের অবদান ইতোমধ্যেই জনমানসে প্রতিষ্ঠিত। স্বাধীনতা পদক বা একুশে পদক তার পরিচয়কে বড় করবে না; বরং এমন একজন সাংবাদিককে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্র নিজেই সম্মানিত হবে।
কারণ মতিউর রহমান চৌধুরী কেবল একজন সম্পাদক নন, কেবল একজন প্রতিবেদকও নন; তিনি বাংলাদেশের স্বাধীন সাংবাদিকতার এক জীবন্ত প্রতীক, সত্যের পক্ষে অবিচল থাকার এক উজ্জ্বল উদাহরণ এবং নতুন প্রজন্মের জন্য পেশাগত সাহসের এক অনন্য পাঠশালা।
পরিশেষে বলতে চাই,বাংলাদেশ কবে ফুটবল বিশ্বকাপে খেলবে, সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো ভবিষ্যতের হাতে। হয়তো আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে। আরও পরিকল্পনা, আরও বিনিয়োগ, আরও উন্নয়ন দরকার হবে।
কিন্তু ততদিন পর্যন্ত একটি সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। বাংলাদেশের লাল-সবুজের নাম বিশ্বকাপের আঙিনায় বারবার উচ্চারিত হয়েছে একজন মতিউর রহমান চৌধুরীর কলমের মাধ্যমে।
তিনি মাঠে নেমে গোল করেননি, কিন্তু বাংলাদেশের পরিচয়কে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি ট্রফি জেতেননি, কিন্তু সাংবাদিকতার মর্যাদা বাড়িয়েছেন।
আজ তিনি ৭৪ বছর বয়সেও বিশ্বকাপের মাঠে ছুটে বেড়ান। নতুন প্রজন্মকে শেখান—স্বপ্নের কোনো অবসর নেই, নিষ্ঠার কোনো বার্ধক্য নেই, আর সত্যিকারের ভালোবাসার কোনো শেষ নেই। ফুটবলের প্রতি তার এই ভালবাসা প্রমাণ করে যে, তিনি শুধু একজন সাংবাদিক নন,বরং ফুটবলের দূত।
শ্রদ্ধেয় মতি ভাই, আপনার জন্য রইল গভীর শ্রদ্ধা, অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ুর আন্তরিক শুভকামনা। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা, ক্রীড়াঙ্গন ও জাতীয় জীবনে আপনার অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকবে।
এমন মানুষরা শুধু ইতিহাসের সাক্ষী হন না, নিজেরাই ইতিহাস হয়ে ওঠেন।
লেখক: আহসান হাবিব বরুন
সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com