বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাঠামোগত ইতিহাস কিংবা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েনের দিকে তাকালে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) মিন্টো রোডের কার্যালয়টি সবসময়ই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেছে। অপরাধ দমন, গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্ত এবং দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে ডিবির ভুমিকা যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি বিগত সরকারগুলোর আমলে এই দপ্তরটিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক নাটকীয়তা ও বিতর্কও কম নয়। বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের আটকে রেখে খাবার খাওয়ানোর ছবি কিংবা তারও আগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও আমানুল্লাহ আমানকে খাওয়ানোর ছবি প্রকাশ্যে এনে ‘ডিবি অফিসকে ভাতের হোটেল’ হিসেবে পরিণত করার যে চর্চা তৎকালীন ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদ শুরু করেছিলেন, তা জনমনে আজও এক তিক্ত ও আলোচিত স্মৃতি।
সম্প্রতি একটি বিশেষ প্রয়োজনে আমার মিন্টো রোডের সেই ডিবি কার্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল বর্তমান ডিবি প্রধানের সঙ্গে কথা বলা। সেদিন আমি যখন পৌঁছাই, তখন ঘড়ির কাঁটায় বিকেল পাঁচটা পেরিয়েছে। ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলামের সহকারী আমাকে মূল কার্যালয়ের দোতলার একটি কক্ষে নিয়ে বসালেন—যেটি একটি কনফারেন্স রুম।
কনফারেন্স রুমে পা রেখে চারদিকে চোখ বোলাতেই এক অদ্ভুত অনুভূতি গ্রাস করল। মনের মধ্যে ভেসে উঠল সেই পরিচিত দৃশ্যগুলো—এই তো সেই কনফারেন্স রুম, যা একসময় কুখ্যাত ‘ডিবি হারুনের ভাতের হোটেল’ নামে দেশ-বিদেশে ব্যাপকভাবে পরিচিতি ও কুখ্যাতি লাভ করেছিল! এই ঘরে বসেই প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিরোধী দলের প্রবীণ রাজনৈতিক নেতাদের কিংবা আন্দোলনকারী তরুণ ছাত্রদের সামনে চটকদার খাবার পরিবেশন করে ছবি ও ভিডিও ধারণ করা হতো এবং পরবর্তীতে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়ে দিয়ে মানুষের আত্মসম্মানে আঘাত হানার অপচেষ্টা চালানো হতো।
সেদিন ডিবি কার্যালয়ের সার্বিক পরিবেশ ছিল কিছুটা নীরব। ডিবি প্রধান সকাল থেকেই একটি বড় ধরনের অভিযানে অফিসের বাইরে ছিলেন। সারাদিনের সেই অভিযান সফলভাবে শেষ করে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ ব্রিফিং শেষ করে তিনি কিছুক্ষণ আগেই নিজের দপ্তরে ফিরে এসে কিছুটা বিশ্রামে ছিলেন। ফলে ডিবি প্রধানের জন্য অপেক্ষার এই সময়টায় আমি সেই বহুল আলোচিত ‘ভাতের হোটেলে’ একাকী বসে ছিলাম।
সেই নিরিবিলি কনফারেন্স রুমে বসে থাকার সময় এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হলো। হুট করেই মাথার ওপরের ফলস সিলিংয়ে কিসের যেন একটি খসখস এবং দ্রুত দৌড়াদৌড়ির শব্দ কানে এল। চোখ তুলে ওপরের দিকে তাকাতেই বুঝতে আর বাকি রইল না—কনফারেন্স রুমের ফলস সিলিংয়ের ভেতরে আপন মনে এদিক-ওদিক দৌড়ে বেড়াচ্ছে ইঁদুরের দল! যতক্ষণ আমি সেই কক্ষে একা বসে ছিলাম, বলতে গেলে প্রায় পুরোটা সময় জুড়েই ফলস সিলিংয়ের ভেতরে ইঁদুরের সেই অবাধ বিচরণ ও দৌড়াদৌড়ির কসরত আমাকে শুনতে হয়েছে। ক্ষমতার প্রতাপের যে কেন্দ্রে একসময় মানুষের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারিত হতো, আজ সেখানে ইঁদুরের নিঃশব্দ রাজত্ব!
কিছুক্ষণ পর ডিবি প্রধান শফিক সাহেবের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হলো। চা-নাস্তা খেতে খেতে পেশাগত আলোচনার পাশাপাশি সেই ইঁদুরের দৌড়াদৌড়ির বিষয়টি তার কাছে উত্থাপন করলাম। আমার কথা শুনে তিনি মৃদু হেসে খুব সহজভাবেই স্বীকার করলেন যে, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত যত গভীর হতে থাকে, সিলিং ও দেয়ালের পেছনে ইঁদুরের এই রাজত্ব ও উপদ্রব ততই বাড়তে থাকে।
এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাটিকে কেবল একটি হাস্যরসাত্মক ঘটনা কিংবা সামান্য ইঁদুরের উপদ্রব হিসেবে দেখে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর পুলিশিং উইং—ডিবি পুলিশের কেন্দ্রীয় কার্যালয়টির অবকাঠামোগত অবস্থা ও সার্বিক কার্য পরিবেশের করুণ চিত্রটি দেশের সর্বসমক্ষে তুলে ধরা।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কেবল একটি সাধারণ প্রশাসনিক শাখা নয়; এটি রাজধানীর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, উচ্চপর্যায়ের সন্ত্রাসী দমন, সাইবার অপরাধ তদন্ত এবং জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি মোকাবিলায় সম্মুখসারির বাহিনী হিসেবে কাজ করে। ডিআইজি পদমর্যাদার একজন জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা এই গুরুত্বপূর্ণ উইংটির নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর দপ্তর আজও বহুকালের পুরনো, জরাজীর্ণ এবং অপ্রশস্ত একটি ভবনে তাদের মূল কার্যক্রম পরিচালনা করতে বাধ্য হচ্ছে।
এখানে বলে রাখা ভালো যে,ডিবি প্রধানের দপ্তর ও কনফারেন্স রুমটি অবকাঠামোগত দিক থেকেও অত্যন্ত সংকুচিত। একজন ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তা এবং তার অধীনস্থ শত শত সদস্য যে পরিসরে কাজ করেন, আধুনিক আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বিচারে তা অত্যন্ত অপ্রতুল ও সংকুচিত বলে আমার স্পষ্ট মনে হয়েছে। এমনকি ডিবি প্রধানের কার্যালয়ে যাওয়ার জন্য সিঁড়ি বেয়ে যখন দোতলায় উঠছিলাম, তখন লক্ষ্য করলাম—একটি আধুনিক প্রশাসনিক ভবনের সিঁড়ি যেমন পাকা বা টেকসই হওয়া উচিত, তেমনটি নয়; বরং সিঁড়িগুলো ছিল পুরনো আমলের কাঠের তৈরি। পায়ে পা মেলানোর সাথে সাথেই সেখানে এক ধরনের জরাজীর্ণতার শব্দ পাওয়া যায়।
বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট কিংবা বিভিন্ন রেঞ্জ ও মেট্রোপলিটন পুলিশের কার্যালয়গুলো অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন, আধুনিক সুবিধা সংবলিত করে সাজানো হয়েছে। পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তাদের জন্য সুসংহত কার্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সত্য যে, পুলিশের সবচেয়ে কর্মব্যস্ত, কার্যকর এবং গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট হওয়া সত্ত্বেও ডিবির মূল কার্যালয়টি এখনো সেই জরাজীর্ণ ও মান্ধাতা আমলের কাঠামোর ভেতরেই বন্দি হয়ে আছে।
একটি আধুনিক রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন উইংয়ের কার্যালয় কেবল একটি অফিস নয়; তা হতে হয় একটি সুবিন্যস্ত, সুরক্ষিত এবং প্রযুক্তিগতভাবে সমৃদ্ধ। জরাজীর্ণ ভবন, মাথার ওপর ইঁদুরের দৌড়াদৌড়ি আর কাঠামোসংকটের মধ্যে বসে কর্মকর্তাদের যেমন মনস্তাত্ত্বিক পেশাদারিত্ব বজায় রাখা কঠিন, তেমনি বিদেশি প্রতিনিধি কিংবা ভিআইপিদের আগমন ঘটলে তা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তির জন্যও ইতিবাচক বার্তা বহন করে না।
পরিশেষে বলতে চাই,অতীতে ক্ষমতা প্রদর্শন আর ‘ভাতের হোটেল’ বানিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির যে চর্চা এখানে হয়েছিল, তার অবসান ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে পেশাদারিত্ব ও আধুনিকতার ছাঁচে ঢেলে সাজানোর সময় এসেছে। সুতরাং ডিবি কার্যালয়ের কাজের পরিধি, কর্মব্যস্ততা এবং জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এর অপরিসীম গুরুত্ব বিবেচনা করে অনতিবিলম্বে এই কার্যালয়ের সার্বিক সংস্কার এবং আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ করা প্রয়োজন। ডিবির পেশাগত কাজের মানোন্নয়নের স্বার্থেও এটা অত্যন্ত জরুরি বলে আমি মনে করি।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com