রাজনীতিতে নীরবতাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে যখন একটি জাতি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন রাজনৈতিক নেতৃত্বের চুপ থাকা আর কৌশল থাকে না। তখন তা দায়িত্ব এড়ানোর শামিল হয়ে ওঠে। এমন সময় জনগণ শুধু কথা নয়, স্পষ্ট অবস্থান চায়।
জুলাই অভ্যুত্থান ছিল জনগণের ক্ষোভ, আশা আর পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। এই চেতনার আলোকে অনুষ্ঠিতব্য গণভোট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে যে নীরবতা ও দ্বিধা চলছিল, তা মানুষের মনে গভীর প্রশ্ন তুলেছিল। মানুষ জানতে চেয়েছিল—এই সময়ে কে জনগণের পাশে আছে, আর কে দূরে দাঁড়িয়ে হিসাব কষছে?
জুলাই অভ্যুত্থান কোনো সাধারণ রাজনৈতিক ঘটনা নয়। এটি ছিল জনগণের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বঞ্চনা ও অধিকারবঞ্চিত কণ্ঠের বিস্ফোরণ। সেই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে গণচেতনার উন্মেষ ঘটেছে, তা উপেক্ষা করে রাজনীতি করা বর্তমান বাংলাদেশে কার্যত অসম্ভব। এই বাস্তবতা অনুধাবন করেই তারেক রহমান অবশেষে মুখ খুলেছেন এবং প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে নীরব থাকার পর তার এই বক্তব্য শুধু একটি রাজনৈতিক ঘোষণা নয়; বরং এটি তার রাজনৈতিক বোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি বলেই মনে হচ্ছে।
তারেক রহমানের এই অবস্থান বিএনপির রাজনীতির জন্যও একটি ইতিবাচক দিক। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপিকে নিয়ে একটি বড় অভিযোগ ছিল—দলটি জনচেতনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর যখন দেশের বড় অংশের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে সরব, তখন ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিরোধিতা কিংবা এ বিষয়ে নীরব থাকা মানেই সেই জনস্রোতের বিপরীতে অবস্থান নেওয়া। তারেক রহমান সেই কঠিন বাস্তবতা বুঝতে পেরেছেন বলেই শেষ পর্যন্ত জনগণের মনের ভাষার সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন।
এখানে স্পষ্ট করে বলা দরকার—জুলাই চেতনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জনসমর্থন পাওয়া মোটেও সহজ নয়। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশের মানুষ শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষেই দাঁড়ায়, যারা পরিবর্তন, ন্যায়বিচার ও মর্যাদার প্রশ্নে আপসহীন। তারেক রহমানের সাম্প্রতিক অবস্থান প্রমাণ করে, তিনি সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে শুরু করেছেন। এজন্য একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে, একজন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে, তাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়।
তবে সাধুবাদের পাশাপাশি কিছু প্রত্যাশা ও সতর্ক বার্তাও উচ্চারণ করা জরুরি। তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—নিজেকে বিতর্কিত বলয় থেকে বের করে আনা। বিএনপির রাজনীতিতে এমন অনেক ব্যক্তি রয়েছেন, যাদের অতীত ভূমিকা, বক্তব্য ও আচরণ দলটির ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এইসব বিতর্কিত ব্যক্তিদের সান্নিধ্য এড়িয়ে চলা তারেক রহমানের জন্য এখন সময়ের দাবি। কারণ নেতৃত্ব মানেই শুধু সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়, নেতৃত্ব মানে সঠিক মানুষকে বেছে নেওয়ার প্রজ্ঞা।
তারেক রহমান যদি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদে জনগণের আস্থা অর্জন করতে চান, তাহলে তাকে ফিরে তাকাতে হবে তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের দিকে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শুধু একজন রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন না; তিনি ছিলেন স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতীক। তার রাজনীতি ছিল সাহসী, বাস্তববাদী এবং জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত। একইভাবে বেগম খালেদা জিয়া বারবার আপসহীনভাবে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে অবস্থান নিয়েছেন, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও কখনো মাথা নত করেননি।
এই দুটি রাজনৈতিক আদর্শ যদি তারেক রহমান সত্যিকার অর্থে ধারণ করেন, তাহলে তাকে আলাদা করে ‘জনসমর্থন তৈরি’ করতে হবে না—জনসমর্থন আপনাতেই তার দিকে ধাবিত হবে। কারণ বাংলাদেশের মানুষ এখনো জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার নাম উচ্চারণ করে শ্রদ্ধার সঙ্গে। তারা প্রমাণ করে গেছেন, ক্ষমতাই শেষ কথা নয়। বরং মানুষের ভালোবাসা, বিশ্বাস ও আস্থাই একজন রাজনৈতিক নেতার সবচেয়ে বড় অর্জন।
ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়া নেতৃত্ব যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকে। একজন জিয়াউর রহমান, একজন খালেদা জিয়া—এই সত্য ইতিহাসে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। তাই তারেক রহমানের প্রতি আমার সবিনয় আহ্বান থাকবে—আপনি যদি তাদের পথ অনুসরণ করেন, তাদের আদর্শকে রাজনৈতিক কৌশল নয় বরং নৈতিক দিকনির্দেশনা হিসেবে গ্রহণ করেন, তাহলে সাফল্য আপনাকে খুঁজে নেবে। অন্যথায় রাজনীতির পথে বাধা, প্রতিবন্ধকতা ও জনবিচ্ছিন্নতার সম্মুখীন হওয়াই হবে নিয়তি।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জনগণ আর মুখরোচক বক্তব্য বা কৌশলী নীরবতায় বিশ্বাস করে না। মানুষ এখন স্পষ্ট অবস্থান চায়, সাহসী নেতৃত্ব চায়, এবং সর্বোপরি সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর দৃঢ়তা চায়। জুলাই অভ্যুত্থান সেই দাবিরই বহিঃপ্রকাশ। তারেক রহমানের ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান সেই বাস্তবতার সঙ্গে একটি ইতিবাচক সমন্বয়।
এখন দেখার বিষয়—এই অবস্থান কি কেবল একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত, নাকি ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিকনির্দেশনার সূচনা? যদি এটি পরবর্তীটির সূচনা হয়, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন ভারসাম্য তৈরি হতে পারে। আর যদি এটি কেবল সময়ক্ষেপণের কৌশল হয়, তাহলে জনগণ খুব দ্রুতই তা বুঝে ফেলবে—কারণ বাংলাদেশের মানুষ ভুলে যায় না, ক্ষমাও করে না সহজে।
শেষ কথা:
সবশেষে বলা যায়, তারেক রহমানের এই সিদ্ধান্ত তাকে একটি সুযোগ এনে দিয়েছে—নিজেকে নতুন করে উপস্থাপনের, জনগণের সঙ্গে নতুন করে সংযোগ স্থাপনের। সেই সুযোগ তিনি কীভাবে ব্যবহার করবেন, সেটাই নির্ধারণ করবে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। ইতিহাস অপেক্ষা করছে, জনগণ পর্যবেক্ষণ করছে, আর সময় খুব দ্রুতই তার রায় দিয়ে দেবে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ahabibhme@gmail.com