৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের মানুষ একটি নতুন প্রত্যাশা নিয়ে সামনে তাকিয়েছিল। পতিত স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের পর জনগণের আশা ছিল—দুর্নীতি, দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজির সংস্কৃতি থেকে মুক্ত একটি প্রশাসনিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু সেই প্রেক্ষাপটে নবনিযুক্ত সড়ক পরিবহন ও যোগাযোগ মন্ত্রীর বক্তব্য—“সমঝোতার ভিত্তিতে নেওয়া অর্থ চাঁদা নয়”—এমন বক্তব্য শুধু বিস্ময়করই নয়, সম্পূর্ণরূপে অপ্রত্যাশিত এবং অগ্রহণযোগ্য।
৫ আগস্টের পর থেকেই বিএনপির বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহল থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠতে শুরু করে। বিএনপি’র শীর্ষ নেতৃত্ব হাজার হাজার নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করে। বহু চড়াই উৎরায় পেরিয়ে দুই দশক পর বিএনপি আবারো রাষ্ট্র ক্ষমতায়। কিন্তু শুরুতেই এই ধরনের অনভিপ্রেত কথাবার্তা মোটেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষের প্রথম প্রত্যাশা থাকে—আইনের শাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। কিন্তু মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরপরই চাঁদাবাজির পক্ষে সাফাই গাওয়া সেই প্রত্যাশার বুকে সরাসরি ছুরিকাঘাত।
মন্ত্রী যুক্তি দিয়েছেন, মালিক ও শ্রমিক সংগঠন কল্যাণমূলক তহবিলের জন্য অর্থ তুললে তা চাঁদা নয়; বাধ্য করলে তবেই চাঁদা। এই যুক্তি ভাষাগতভাবে সরল মনে হলেও বাস্তবে খুবই বিপজ্জনক। কারণ বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় “স্বেচ্ছা” ও “বাধ্যতা”র সীমারেখা অত্যন্ত অস্পষ্ট।
বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন খাত বহুদিন ধরেই রাজনৈতিক প্রভাবাধীন। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা চাঁদা তোলা হয় সড়ক থেকে। মালিক সমিতি, শ্রমিক ফেডারেশন ও টার্মিনাল কমিটির সঙ্গে ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এমন বাস্তবতায় একজন বাসচালক, ট্রাকচালক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কি সত্যিই স্বেচ্ছায় অর্থ দেন? এটা কি বিশ্বাসযোগ্য, নাকি সত্য আড়াল করার অপপ্রয়াস?
আমাদের সমাজে পাওনা টাকা আদায়ের জন্য মামলা-হামলা হয়, এমনকি খুনখারাবি পর্যন্ত হয়। সেখানে নিজের কষ্টার্জিত পকেটের টাকা স্বেচ্ছায় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা চাঁদাবাজদের কেন খয়রাত দেবে মানুষ?
বাস্তবতা হলো—অধিকাংশ ক্ষেত্রে অর্থ দেওয়া হয় আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে। রুট বন্ধ হয়ে যাওয়া, গাড়ি আটকে দেওয়া, প্রশাসনিক হয়রানি বা সহিংসতার আশঙ্কা—এসবই নীরব চাপ তৈরি করে। এই নীরব জবরদস্তিকে “সমঝোতা” বলা বাস্তবতাকে আড়াল করার শামিল।
মন্ত্রী যদি বুঝাতে চান বৈধ কল্যাণ তহবিলের কথা, তাহলে তার জন্য প্রয়োজন লিখিত বিধিমালা, নিরীক্ষিত হিসাব, স্বচ্ছ আর্থিক প্রতিবেদন। “অলিখিত নিয়ম” শব্দবন্ধটি বরং আইনের শাসনের পরিপন্থী। রাষ্ট্র চলবে লিখিত আইনে; অলিখিত নিয়মে নয়।
বহুদিন ধরে চলা অলিখিত নিয়মের পরিবর্তনের জন্যই মানুষ ভোট দিয়ে বিএনপিকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। মন্ত্রী সাহেব যদি এই সত্য উপলব্ধি করতে না পারেন, তাহলে জনগণ শীঘ্রই আবারও বিকল্প খুঁজে নেবে। এতে আমার ন্যূনতম সন্দেহ নেই।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—মন্ত্রীর এই বক্তব্যের মাত্র একদিন আগে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। চাঁদাবাজি দুর্নীতির অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। তাহলে একদিকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের ঘোষণা, অন্যদিকে চাঁদার একটি অংশকে “সমঝোতা” বলে ব্যাখ্যা—এই দ্বৈত বার্তা অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর।
সরকার প্রধান তথা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরু থেকেই পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছেন। শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট না নেওয়ার ঘোষণা, নিরাপত্তা প্রটোকল ও প্রধানমন্ত্রীর বহরের গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে আনা, শনিবার ছুটির দিনেও অফিস করা, সাদামাঠা পোশাক পরা—অর্থাৎ সবকিছুতেই ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর এই আচরণকে অনেকেই তার পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তুলনা করছেন।
সেখানে যোগাযোগ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এবং ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক ইতোমধ্যেই বিতর্কের সৃষ্টি করেছেন। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছেন।
যে সমস্ত মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর সহকর্মী সরকার প্রধানের উদ্দেশ্য ও আদর্শ ধারণ করতে না পারেন, তাদেরকে অবিলম্বে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেওয়াই হবে সরকারের বিচক্ষণতার পরিচয়।
সরকারের ভাবমূর্তি গঠিত হয় বার্তা ও কর্মের সামঞ্জস্যে। সেখানে যদি মন্ত্রিসভার সদস্যদের বক্তব্য প্রধানমন্ত্রীর অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে তা নেতৃত্বের দৃঢ়তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠবেই।
বাংলাদেশে চাঁদাবাজি কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; এটি প্রতিদিনের অর্থনৈতিক বাস্তবতা। পরিবহন খাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায় মানেই ভাড়া বৃদ্ধি। সাধারণত যে ভাড়া ১০০ টাকা, ঈদের সময় তা ২০০ বা ৩০০ টাকায় পৌঁছায়। এর পেছনে মূল কারণ ঈদ ঘিরে অতিরিক্ত চাঁদাবাজি।
পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি বন্ধ হলে বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় প্রায় অর্ধেক কমে আসবে বলে আমি মনে করি। একথা আমি আগেও বহুবার বলেছি। সুতরাং চাঁদাবাজি বন্ধের কোনো বিকল্প নেই। জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে বিএনপিকে এই সত্য উপলব্ধি করতেই হবে।
রমজান মাস শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যেই নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। বাজারে অতিরিক্ত খরচের চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়ে। চাঁদাবাজি এক ধরনের অপ্রাতিষ্ঠানিক কর—যার কোনো স্বচ্ছতা নেই, জবাবদিহি নেই, কিন্তু প্রভাব পড়ে প্রতিটি পণ্যের দামে।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হন মধ্যবিত্ত ও খেটে খাওয়া মানুষ—দিনমজুর, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তারা বাজারে গিয়ে দেখেন চাল, ডাল, তেল—সবকিছুর দাম বেড়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে চাঁদাবাজি একটি মৌলিক কারণ হিসেবে কাজ করে।
একজন মন্ত্রীর কাছ থেকে জনগণ প্রত্যাশা করে সংবেদনশীলতা ও দূরদর্শিতা। কিন্তু শপথ নেওয়ার পরপরই এমন বক্তব্য দেওয়া রাজনৈতিক অবিবেচনার পরিচায়ক। এটি শুধু ভুল শব্দচয়ন নয়; এটি মানসিক দৈন্যতার বহিঃপ্রকাশ বলেই মনে হয়। কারণ চাঁদাবাজির মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হয়। সেখানে যদি ব্যাখ্যার মাধ্যমে বিষয়টিকে হালকা করা হয়, তাহলে তা কার্যত চাঁদাবাজদের উৎসাহ জোগায়।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, রাজনীতিতে সংকেত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মন্ত্রীর বক্তব্য মাঠপর্যায়ে কী বার্তা দিচ্ছে? চাঁদাবাজ ও সংগঠনগুলোর কাছে কি এটি এক ধরনের নীরব অনুমোদন নয়?
চাঁদাবাজি নিয়ে মন্ত্রীর এই নতুন সংজ্ঞারোপের ফলে চাঁদাবাজরা দেশব্যাপী আরো বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে-এমন আশঙ্কা করার যথেষ্ট কারণ আছে।
নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনআস্থা অর্জন ও ধরে রাখা। যদি শুরুতেই এমন বিতর্ক তৈরি হয়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। ইতোমধ্যে এই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা ও নানা বিতর্কের কথা জনপরিসরে আলোচিত হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে চাঁদাবাজি বিষয়ে অসতর্ক মন্তব্য সরকারের নৈতিক অবস্থানকে নিঃসন্দেহে দুর্বল করেছে।
সরকারের সাফল্য নির্ভর করে নেতৃত্বের দৃঢ়তা ও সঠিক বার্তার ওপর। যদি সরকার চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বিরোধীরা নয়—জনগণই বিচার করবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই।
এই প্রেক্ষাপটে মন্ত্রীর উচিত তার বক্তব্য প্রত্যাহার করা এবং জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া। ভুল স্বীকার করা দুর্বলতা নয়; বরং দায়িত্বশীলতার পরিচয়। কারণ চাঁদাবাজির পক্ষে কোনো ধরনের সাফাই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি উন্নয়নের শত্রু, ন্যায়বিচারের পরিপন্থী এবং সাধারণ মানুষের জীবনের ওপর এক অদৃশ্য অভিশাপ।
শেষ কথা:
বাংলাদেশের মানুষ পরিবর্তন চায়—শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, সংস্কৃতির পরিবর্তন। তারা চায় চাঁদাবাজিমুক্ত সড়ক, ন্যায্য ভাড়া, সাশ্রয়ী বাজার এবং নিরাপদ জীবন। “সমঝোতা” শব্দের আড়ালে যদি নীরব জবরদস্তিকে আড়াল করা হয়, তাহলে তা দমন না করে বরং চাঁদাবাজিকে বৈধতা দেওয়া হয়। সুতরাং মন্ত্রীর এই সাফাই শুধু অপ্রত্যাশিতই নয়, বরং সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য।
এখন দেখার বিষয়, সরকার চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়, নাকি “সমঝোতা” শব্দের আড়ালে এই সর্বগ্রাসী সমস্যাকে ঢেকে রাখে। এই সিদ্ধান্তের উপরই নির্ভর করছে বিএনপি সরকারের ভবিষ্যৎ ভাবমূর্তি ও জনআস্থা।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com