আজ মঙ্গলবার, ২রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১৬ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
আজ মঙ্গলবার, ২রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১৬ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই কি বিটিভিতে দুর্নীতি-লুটপাটের উৎসব?

একসময় সন্ধ্যা নামলেই বাংলাদেশের ঘরে ঘরে একটি পরিচিত দৃশ্য দেখা যেত। পরিবারের সবাই টেলিভিশনের সামনে বসত, আর পর্দাজুড়ে ভেসে উঠত রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম -এর অনুষ্ঠান। বিটিভি তখন কেবল একটি টেলিভিশন চ্যানেল ছিল না; এটি ছিল জাতির সাংস্কৃতিক চেতনার অন্যতম প্রধান বাহক। “আনন্দমেলা”, “ইত্যাদি”, ঈদের নাটক, দেশাত্মবোধক গান কিংবা বিশেষ আয়োজন ঘিরে মানুষের আবেগ ছিল অন্যরকম।

কিন্তু সময়ের নির্মম বাস্তবতায় সেই বিটিভিই আজ দুর্নীতি, অনিয়ম, আর্থিক লুটপাট, দলীয়করণ এবং জবাবদিহিহীনতার ভয়াবহ প্রতীকে পরিণত হয়েছে। যে প্রতিষ্ঠান জনগণের সাংস্কৃতিক বিকাশের দায়িত্ব পালন করবে, সেই প্রতিষ্ঠানই আজ জনগণের ট্যাক্সের টাকা লুটপাটের অভিযোগে অভিযুক্ত।

সাম্প্রতিক ঈদ আয়োজনকে কেন্দ্র করে বিটিভির বিরুদ্ধে যে ভয়াবহ অনিয়মের তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে, তা শুধু বিস্ময়কর নয়; এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা ও সুশাসনের জন্য গভীর অশনিসংকেত।

ঈদের দিন প্রচারিত “ঈদ আনন্দমেলা” নামের মাত্র ৫০ মিনিটের একটি অনুষ্ঠানে শিল্পী সম্মানী বাবদ ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ২৬ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। অথচ বাস্তবে অনুষ্ঠানটির দৈর্ঘ্য ছিল মাত্র ৫০ মিনিট। কিন্তু কাগজে-কলমে সেটিকে দেখানো হয়েছে ২০০ মিনিটের অনুষ্ঠান হিসেবে। উদ্দেশ্য একটাই—বিল বাড়ানো, সম্মানী বাড়ানো এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের পথ তৈরি করা।

প্রশ্ন হচ্ছে—এটি কি নিছক প্রশাসনিক ভুল? নাকি এটি পরিকল্পিত আর্থিক জালিয়াতি?
বাংলাদেশের অধিকাংশ বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের পুরো বছরের বিশেষ অনুষ্ঠান নির্মাণ বাজেট যেখানে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, সেখানে বিটিভির একটি মাত্র অনুষ্ঠানে শুধু শিল্পী সম্মানী বাবদ ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ২৭ লাখ টাকা।

এই তুলনাই প্রমাণ করে, এখানে মূল লক্ষ্য অনুষ্ঠান নির্মাণ নয়; বরং সরকারি অর্থ লুটপাটের বৈধ পথ তৈরি করা। বিটিভিতে যারা বসে আছেন, তাদের অনেকেই যেন দর্শকপ্রিয় অনুষ্ঠান নির্মাণের জন্য নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কোষাগারকে ব্যক্তিগত আয়ের উৎসে পরিণত করার জন্য দায়িত্বে আছেন।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—এই অপচয় এমন একটি প্রতিষ্ঠানে ঘটছে, যেটি বছরের পর বছর লোকসানে চলছে এবং যার দর্শকসংখ্যা ক্রমাগত কমছে। মানুষ এখন ইউটিউব, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এবং বেসরকারি টেলিভিশনের দিকে ঝুঁকছে। অথচ দর্শকহীন একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সবচেয়ে বেশি অর্থ অপচয়ের অভিযোগ উঠছে।

ঈদের এই আলোচিত অনুষ্ঠানে উপস্থাপক হিসেবে ছিলেন আওয়ামীপন্থি অভিনেতা । স্ক্রিপ্ট রাইটিংয়ের জন্য দেওয়া হয়েছে ৫৯ হাজার ১২৫ টাকা। আবার নৃত্যনাট্যের নামে অতিরিক্ত এক লাখ ৬৩ হাজার ৬০ টাকাও নিয়েছেন তিনি।
অর্থাৎ একই অনুষ্ঠানে এক ব্যক্তির নামে একাধিক খাতে আলাদা বিল দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। এটি কেবল অনিয়ম নয়; এটি সংঘবদ্ধ দুর্নীতির স্পষ্ট আলামত।

আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ না করেও শিল্পী রুনা লায়লার স্বামী অভিনেতা আলমগীরের নামে এক লাখ ১১ হাজার ২০০ টাকা সম্মানী দেখানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, সংগীতশিল্পী রুনা লায়লাকে তিন লাখ টাকা দেওয়ার জন্য স্বামী-স্ত্রীর নামে আলাদা বিল করা হয়েছে।
এটি নিছক অনৈতিকতা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের কৌশলী পদ্ধতি।

নৃত্যশিল্পীর সম্মানী দেখানো হয়েছে ৬৭ হাজার টাকা। আবার একই অনুষ্ঠানে নৃত্যনাট্যের জন্য আরও এক লাখ ৯৫ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। শিল্পী পেয়েছেন দুই লাখ ২২ হাজার ২০০ টাকা।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই সম্মানী নির্ধারণের নীতিমালা কোথায়? কোন কমিটি এই ব্যয় অনুমোদন দিয়েছে? কোন আর্থিক নিরীক্ষা হয়েছে? জনগণের টাকায় পরিচালিত একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে এত বড় অঙ্কের অর্থ কীভাবে এত সহজে বিতরণ করা হলো?

বিটিভির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে এখনো এমন ব্যক্তিরা বহাল আছেন, যারা অতীতের কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতির সুবিধাভোগী ছিলেন। তারাই অনুষ্ঠান পরিকল্পনা, শিল্পী নির্বাচন এবং বাজেট নিয়ন্ত্রণ করছেন। ফলে বিটিভি কার্যত একটি বিশেষ গোষ্ঠীর আর্থিক স্বার্থ রক্ষার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারকে অজনপ্রিয় করার জন্য পরিকল্পিতভাবে এই লুটপাটের ঘটনা ঘটানো হয়েছে কি না? এ বিষয়টিও খতিয়ে দেখা দরকার বলে আমি মনে করি।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—বিটিভির দুর্নীতি নতুন কিছু নয়। বছরের পর বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া বিল, অতিরিক্ত সম্মানী, নিয়োগ বাণিজ্য ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। তদন্তও হয়েছে অসংখ্যবার। কিন্তু শাস্তির কোনো দৃশ্যমান নজির নেই। যেন তদন্ত কেবল জনগণের ক্ষোভ সাময়িকভাবে প্রশমিত করার একটি নাটকীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া মাত্র।

এই সংস্কৃতিই আজ বিটিভিকে একটি গভীরভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানে রূপ দিয়েছে। যেখানে যোগ্যতা নয়, সততা নয়, দর্শকের চাহিদাও নয়—বরং রাজনৈতিক আনুগত্য, সিন্ডিকেট এবং অর্থ ভাগাভাগির সমীকরণই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে আরও সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই আর্টিকেলটি লিখতে বসে আমি বিটিভি কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের বক্তব্য জানার প্রয়োজন অনুভব করি। সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও পেশাগত দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই আমি একাধিকবার ফোন করি বাংলাদেশ টেলিভিশনের অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান , বিটিভির মহাপরিচালক , তথ্য সচিব এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কারও কাছ থেকেই কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

এই নীরবতা কি কেবল ব্যস্ততার কারণে, নাকি এর ভেতরে লুকিয়ে আছে দায় এড়ানোর সংস্কৃতি? রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে প্রশ্ন উঠলে যদি দায়িত্বশীলরা জবাবদিহি না করেন, তাহলে জনগণ উত্তর পাবে কোথায়?

সবচেয়ে বড় কথা হলো, শুরু থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বার্তা দিয়ে আসছেন প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচনী ইশতেহারে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে “জিরো টলারেন্স” নীতির কথা বলেছেন।
সরকারের ব্যয় সংকোচন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

সেখানে সরকারের মাত্র একশ দিন পেরোতেই বিটিভির মতো একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে এমন ভয়াবহ অনিয়ম প্রকাশ্যে আসা সমাজে কী বার্তা দিচ্ছে?

যেখানে প্রধানমন্ত্রী নিজে রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানোর জন্য ব্যক্তিগত আচরণেও সরলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন—পোশাক-আশাক, প্রটোকল, সরকারি ব্যয় সবক্ষেত্রেই সংযম প্রদর্শন করছেন। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের লাঞ্চ ভাতা ৮০০ টাকা থেকে কমিয়ে ১৫০ টাকায় নামিয়ে এনেছেন। অপ্রয়োজনীয় প্রটোকল কমিয়েছেন। এমনকি ঈদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণের জন্য নিজেই মাঠে নেমেছেন।

অর্থাৎ একজন প্রধানমন্ত্রী প্রাণপণ চেষ্টা করছেন জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য, একটি সুশাসিত রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য, জনকল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য।

কিন্তু সেই সরকারের অধীনেই যদি বিটিভির মতো প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে সরকারি অর্থ লুটপাটের অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; সেটি সরাসরি সরকারের নৈতিক অবস্থানকে আঘাত করে। আরও স্পষ্ট করে বললে, বিটিভির এই ঘটনা সরকারের সমস্ত ইতিবাচক প্রচেষ্টাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকারকেও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।

এখানে বিটিভির মহাপরিচালক কি দায় এড়াতে পারেন? তিনি একটি গণমাধ্যমকে বলেছেন, ঈদের এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে দাপ্তরিকভাবে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। কিন্তু একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে তিনি কি সত্যিই দায়মুক্ত?

যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম হয়, আর প্রধান কর্মকর্তা বলেন তিনি কিছুই জানেন না—তাহলে সেটি আরও ভয়ংকর সংকেত। কারণ এতে বোঝা যায়, হয় তিনি সম্পূর্ণ অযোগ্য, নয়তো তিনি দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন।

বাংলাদেশের মানুষ আজ দ্রব্যমূল্যের চাপে দিশেহারা। বেকার তরুণ চাকরি পাচ্ছে না। হাসপাতালগুলোতে ওষুধের সংকট। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত দুরবস্থা। অথচ সেই দেশের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে কয়েকজন ব্যক্তি মিলে কোটি কোটি টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করছেন। এটি কেবল দুর্নীতি নয়; এটি সাধারণ মানুষের সঙ্গে নির্মম উপহাস।

সরকার যদি সত্যিই পরিবর্তনের বার্তা দিতে চায়, তাহলে বিটিভির এই কেলেঙ্কারি হতে পারে একটি পরীক্ষার ক্ষেত্র। এজন্য প্রয়োজন একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত। শুধু বিভাগীয় তদন্ত নয়; আর্থিক নিরীক্ষা, দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনে ফৌজদারি মামলাও হওয়া উচিত।

যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাদের দ্রুত অপসারণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রথম কয়েকটি পদক্ষেপই জনগণের কাছে সরকারের প্রকৃত চরিত্র তুলে ধরে।

যদি এই ঘটনারও শেষ পরিণতি হয় আরেকটি ফাইলবন্দী তদন্ত, তাহলে জনগণের মনে একটি ভয়ংকর বার্তা যাবে—সরকার বদলায়, মুখ বদলায়, কিন্তু রাষ্ট্রীয় লুটপাটের সংস্কৃতি বদলায় না।

আর সেটিই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ব্যর্থতা। কারণ একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার প্রতিষ্ঠানগুলো স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং নৈতিকভাবে দৃঢ় হয়।

সুতরাং এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে অবশ্যই দ্রুত, স্বচ্ছ এবং দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলতে থাকলে জনগণের ক্ষোভ, হতাশা এবং রাষ্ট্রের প্রতি অনাস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো উপায় থাকবে না।

বিটিভি যদি আবার জনগণের আস্থা ফিরে পেতে চায়, তাহলে প্রথম কাজ হতে হবে দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলা। অন্যথায় রাষ্ট্রীয় এই গণমাধ্যম একসময় শুধু লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবেই নয়, বরং দুর্নীতির প্রতীকে পরিণত হবে। যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin