আজ মঙ্গলবার, ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৪ঠা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৯শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি
আজ মঙ্গলবার, ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৪ঠা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৯শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

দেশ বিনির্মাণে ঐক্য ও সুশাসনের বার্তা তারেক রহমানের

নির্বাচন শেষ হলেও রাজনীতির উত্তাপ একদিনে থেমে যায় না। ভোটের বাক্স বন্ধ হয়, কিন্তু আবেগের বাক্স খোলা থাকে—কোথাও বিজয়ের উচ্ছ্বাস, কোথাও পরাজয়ের হতাশা। এমন এক সংবেদনশীল মুহূর্তে আগামীর প্রধানমন্ত্রী ও তারেক রহমান–এর প্রথম সংবাদ সম্মেলন ছিল সময়োপযোগী এবং তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে উঠে এলো ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার এক প্রাথমিক রূপরেখা। তাঁর বক্তব্যে সবচেয়ে জোরালোভাবে উচ্চারিত দুটি শব্দ—ঐক্য এবং সুশাসন—নতুন রাজনৈতিক যাত্রার মূল প্রতিশ্রুতি হিসেবেই প্রতিভাত হয়েছে।

নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, ভাঙচুর ও ভয়ভীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন—“কোনো অজুহাতেই দুর্বলের ওপর সবলের আক্রমণ মেনে নেওয়া হবে না, আইন নিজের হাতে তোলা যাবে না।” এই উচ্চারণ নিছক রাজনৈতিক শ্লোগান নয়; এটি শাসনদর্শনের ভিত্তি হওয়া উচিত। কারণ ক্ষমতার পালাবদলের মুহূর্তেই রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার মুখে পড়ে। সে বিচারে তাঁর বক্তব্য রাষ্ট্রনায়কোচিত বলেই প্রতীয়মান হয়।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি দেশবাসীকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন—“এ বিজয় বাংলাদেশের, এ বিজয় গণতন্ত্রকামী মানুষের।” ৫১টি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে সকলকে ধন্যবাদ জানান। গণতন্ত্রে সরকার ও বিরোধী দল প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও তারা শত্রু নয়—এই মৌলিক সত্যটি স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা।” এই উপলব্ধি যদি নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হয়, তবে তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা ঘটাতে পারে।

তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকাও স্বীকার করেন। দীর্ঘ সময় পর জনগণের সরাসরি ভোটে জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াকে তিনি গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ হিসেবে দেখেন। ক্ষমতায় এসেও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা নেতৃত্বের উদারতার পরিচায়ক—এটি রাজনৈতিক পরিপক্বতার লক্ষণ।

সংবাদ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। নির্ধারিত সময়ের কিছুটা পর অনুষ্ঠান শুরু হলেও সেখানে উপস্থিত থেকে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে চোখে পড়েছে—রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শৃঙ্খলার ঘাটতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। সাংবাদিকদের জন্য নির্ধারিত আসনে দলীয় নেতাকর্মীদের বসে থাকা নিয়ে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। মাইকে বারবার সরে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলেও খুব একটা আমলে নেওয়া হয়নি। বড়জোর সামনে থেকে সরে এসে পেছনে দাঁড়িয়ে জটলা সৃষ্টি করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনের পর চা-নাস্তার টেবিলেও বিশৃঙ্খলা চোখে পড়ে—যা অত্যন্ত অনভিপ্রেত।

একজন সংবাদকর্মী হিসেবে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি—অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা যতই বেশি হোক, সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা অনিবার্য নয়। তাহলে রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আয়োজনে কেন এই শৃঙ্খলাহীনতা? এই প্রশ্ন কেবল আয়োজন নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকেও আঙুল তোলে। গণতন্ত্র কেবল ভোটের প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি আচরণ, সহনশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্মানের সংস্কৃতি। নতুন নেতৃত্বের কাছে তাই প্রত্যাশা—শাসনের সূচনা হোক আচরণগত সংস্কার দিয়ে।

ব্যক্তিগতভাবে বলতে গেলে, এমন হাই-প্রোফাইল অনুষ্ঠানগুলো আমি সাধারণত এড়িয়ে চলি। তবুও সেখানে গিয়েছিলাম প্রশ্ন করব বলে। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে যেখানে একটি চেয়ারে বসার সুযোগ পেয়েছিলাম, সেখান থেকে প্রশ্ন করা কার্যত অসম্ভব ছিল। ফলে প্রশ্নটি আর করা হলো না। এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে—গণতন্ত্রের চর্চা কেবল বক্তব্যে নয়, পরিবেশেও নিশ্চিত করতে হয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছিল। বিজয় মিছিল, দখলদারিত্ব, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো—এসব যেন রাজনৈতিক চর্চার অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেখানে তারেক রহমান ঘোষণা দেন—বিজয় মিছিল নয়, আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যমে উদযাপন করা হবে। তিনি সতর্ক করে দেন—নির্বাচনী বিরোধ যেন প্রতিশোধে রূপ না নেয়। কোনো অপশক্তি যাতে পরিস্থিতির সুযোগ নিতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে বলেন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া গণতন্ত্রের সাফল্য অসম্ভব—এই উপলব্ধিই তাঁর বক্তব্যে সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

আইন যদি সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ না হয়, তবে রাজনৈতিক বিজয়ও অর্থহীন হয়ে যায়। রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে ন্যায়বিচারের ওপর। এই জায়গায় তাঁর দৃঢ়তা পরীক্ষিত হবে মাঠপর্যায়ে।
তিনি স্বীকার করেছেন—দেশ ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও জটিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নতুন যাত্রা শুরু করছে। তাঁর দলের ঘোষিত ৩১ দফা ও রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, প্রশাসনিক অদক্ষতা—এসব মোকাবিলায় প্রয়োজন সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। রাজনৈতিক সদিচ্ছা গুরুত্বপূর্ণ, তবে যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।

সুশাসন মানে শুধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নয়; এটি একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া—যেখানে বিচার বিভাগ স্বাধীন, প্রশাসন দক্ষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরপেক্ষ এবং গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করাই হবে নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি ভারতের সঙ্গে জনস্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের কথাও বলেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতায় ভারত–এর সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে—এমন ইঙ্গিতই পাওয়া গেছে তাঁর বক্তব্যে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ঐতিহাসিকভাবে ভারসাম্যনির্ভর। আঞ্চলিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব—এসব ক্ষেত্রেই দায়িত্বশীল ও বাস্তববাদী অবস্থান জরুরি।

রাষ্ট্র বিনির্মাণ কেবল নীতিগত ঘোষণা দিয়ে সম্ভব নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কৃতি পরিবর্তনের প্রক্রিয়া। ক্ষমতার খুব কাছে গেলে আচরণে অসংযম দেখা দেয়—এটি আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ। নতুন নেতৃত্ব যদি দলীয় পর্যায়ে শৃঙ্খলা ও সংযমের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে, তবে সেটিই হবে প্রকৃত পরিবর্তনের সূচনা।

ঐক্যের রাজনীতি মানে বিরোধী মতকে সম্মান করা, গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাব দেওয়া এবং নাগরিক সমাজের সঙ্গে সংলাপ অব্যাহত রাখা। সুশাসনের রাজনীতি মানে আইনের সমান প্রয়োগ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
তারেক রহমানের বক্তব্যে আশা আছে, প্রতিশ্রুতি আছে, দিকনির্দেশনা আছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—ঘোষণা ও বাস্তবতার মধ্যে দূরত্বই রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। মাঠপর্যায়ে যদি সহিংসতা, দখল বা প্রতিহিংসা অব্যাহত থাকে, তবে ঐক্যের বার্তা দুর্বল হয়ে পড়বে। অন্যদিকে, যদি তিনি সত্যিই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আপসহীন থাকেন এবং বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা দেখান, তবে সেটিই হবে তাঁর নেতৃত্বের স্থায়ী পরিচয়।

শেষ কথা:
দেশ আজ এক নতুন অধ্যায়ের দ্বারপ্রান্তে। ঐক্য ও সুশাসনের যে বার্তা তিনি দিয়েছেন, তা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল ও মানবিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পথে এগোতে পারে। দুষ্কৃতিকারীদের প্রতি কঠোরতা, দুর্বলের প্রতি সুরক্ষা, আইনের সমান প্রয়োগ এবং জাতীয় ঐক্যের চর্চা—এই চার ভিত্তিই হতে পারে নতুন সরকারের নৈতিক মেরুদণ্ড।
প্রতিশোধ নয়, পুনর্গঠন। বিভাজন নয়, ঐক্য। উচ্ছ্বাস নয়, দায়িত্ব—এই দর্শনই যদি শাসনের মূলমন্ত্র হয়, তবে সত্যিই দেশ বিনির্মাণের যাত্রা শুরু হবে।
আগামী রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমানের জন্য অফুরন্ত শুভকামনা।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin