আজ রবিবার, ৫ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২২শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ১৭ই শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি
আজ রবিবার, ৫ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২২শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ১৭ই শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

নির্বাচনী হলফনামা: ঋণগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের দখলে রাজনীতি!

নির্বাচনী হলফনামা কোনো আনুষ্ঠানিক কাগজপত্র নয় বরং এটি একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নৈতিকতার আয়না। এই আয়নায় তাকালেই বোঝা যায়—দেশের রাজনীতি কোন পথে হাঁটছে। কারা ক্ষমতার দিকে এগোচ্ছে এবং সেই ক্ষমতার মূল্য কীভাবে পরিশোধ করা হবে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করলে যে চিত্র ভেসে ওঠে, তা গণতন্ত্রের জন্য মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়; বরং এটি এক গভীর রাজনৈতিক অশনিসংকেত।

প্রিয় পাঠক,এই নিবন্ধে টিআইবির প্রতিবেদন এবং আমার নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব ইনশাল্লাহ।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর ‘নির্বাচনী হলফনামায় প্রার্থী পরিচিতি: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদন রাজনীতির দেউলিয়াত্মকে নির্মমভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রতিবেদনের তথ্যগুলো নিছক কিছু সংখ্যা নয় বরং এগুলো বাংলাদেশের রাজনীতির নৈতিক পতনের প্রামাণ্য দলিল।
টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশই ব্যবসায়ী। অন্যদিকে রাজনীতিক এক শতাংশের কিছু বেশি। সাড়ে ২৫ শতাংশ প্রার্থী ঋণগ্রস্ত। শুধু তাই নয়—বিএনপির ক্ষেত্রে ঋণগ্রস্ত প্রার্থীর হার ৫৯.৪১ শতাংশ, যা সব দলের মধ্যে সর্বোচ্চ। প্রার্থীদের মোট ঋণের পরিমাণ ১৮ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। যার সিংহভাগই ব্যাংকঋণ। এই বাস্তবতা কিসের ইঙ্গিত?

বাংলাদেশের রাজনীতি এখন আর আদর্শ, নীতি কিংবা জনসেবার ক্ষেত্র নয়; এটি কার্যত একটি বিনিয়োগ ও মুনাফাভিত্তিক ব্যবসায়িক প্রকল্পে পরিণত হয়েছে।

গণতন্ত্রের মৌলিক ধারণা হলো—রাজনীতি হবে জনস্বার্থের বাহন। কিন্তু বাংলাদেশে সেই ধারণা বহু আগেই ভেঙে পড়েছে। রাজনীতি আজ এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে নির্বাচনে অংশ নেওয়া মানেই কোটি কোটি টাকার হিসাব। হলফনামা বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় যে একজন প্রার্থী নির্বাচনে নামছেন তার ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়ানোর একটি নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে।

৮৯১ জন কোটিপতি প্রার্থী এবং ২৭ জন শতকোটিপতি—এই সংখ্যা কোনো উন্নত পুঁজিবাদী দেশের নয়। এটি আমাদের স্বল্পোন্নত বাংলাদেশের বাস্তবতা। আরও উদ্বেগজনক হলো—২৫৯ জন প্রার্থীর তুলনায় তাঁদের স্ত্রী বা নির্ভরশীলদের অস্থাবর সম্পদ বেশি। প্রশ্ন হচ্ছে, এই সম্পদের উৎস কী? রাজনীতি কি তবে পারিবারিক সম্পদ স্ফীত করার সবচেয়ে নিরাপদ করিডর হয়ে উঠেছে?

ঋণগ্রস্ত হওয়া অপরাধ নয়। কিন্তু যখন একজন ঋণগ্রস্ত ব্যবসায়ী রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে চান, তখন প্রশ্ন ওঠে—তিনি ক্ষমতায় গিয়ে কাকে আগে সন্তুষ্ট করবেন? জনগণকে, না ঋণদাতাদের?
টিআইবির তথ্য বলছে, সর্বশেষ পাঁচ নির্বাচনের মধ্যে এবার মোট ঋণের পরিমাণ সর্বোচ্চ। অর্থাৎ যারা রাজনীতিতে ঢুকছেন তারা পূর্বের তুলনায় আরও বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে ঢুকছেন। এর অর্থ হচ্ছে, ক্ষমতা ছাড়া এই ঋণ শোধ করা কঠিন। আর ক্ষমতা পেলে সেই ঋণ শোধের রাস্তা তৈরি হয় অনৈতিকভাবে রাষ্ট্রীয় টেন্ডার, কমিশন,প্রভাব খাটানো এবং লুটপাটের মাধ্যমে।

সেনা-সমর্থিত এক-এগারোর সময় বাংলাদেশের মানুষ ভেবেছিল—রাজনীতিতে হয়তো একটি গুণগত পরিবর্তন আসবে। দুর্নীতি কমবে, রাজনীতি শুদ্ধ হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। রাজনীতিবিদরা বরং আরও কৌশলী হয়েছেন।

লুটপাট, দুর্নীতি ও ভোগবিলাস—এই তিনটি শব্দ যেন বাংলাদেশের রাজনীতির স্থায়ী পরিচয়ে রূপ নিয়েছে। এর ফলাফল হিসেবে এসেছে গণঅসন্তোষ, আন্দোলন এবং শেষ পর্যন্ত জুলাই অভ্যুত্থান।

শেখ হাসিনার দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসন, বিরোধী দল দমন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। ৫ আগস্ট তাঁর দেশত্যাগ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। মানুষ বিশ্বাস করেছিল—এবার রাজনীতির চরিত্র বদলাবেই।
কিন্তু বাস্তবতা আবারও হতাশাজনক। গত দেড় বছরে দেখা গেছে—একটি নতুন শ্রেণি রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে উঠেছে। যারা আগে আর্থিক সংকটে ছিল, তারা এখন বিলাসবহুল গাড়ি ও বাড়ির মালিক। নির্বাচনী হলফনামা দেখলেই বোঝা যায়—পরিবর্তনের বদলে অব্যবস্থাপনা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।

তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচি প্রথম প্রকাশের পর আমি নিঃসন্দেহে আশান্বিত ও অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। বিশেষ করে ‘রেইনবো নেশন’—একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈচিত্র্যকে সম্মান করে একসঙ্গে এগিয়ে চলা জাতি গঠনের যে ধারণা তিনি তুলে ধরেছেন, তা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। ৩১ দফার দ্বিতীয় দফাটি পড়েই আমার মনে হয়েছিল—এটি আসলে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক ১৯ দফারই একটি আধুনিক ও সময়োপযোগী সংস্করণ। যেহেতু জিয়াউর রহমান আমার রাজনৈতিক আদর্শ, তাই এই দর্শনের সঙ্গে আমি নিজেকে স্বাভাবিকভাবেই একাত্ম মনে করেছি।

এই বিশ্বাস থেকেই আমি ঘরে বসে সমালোচনা করিনি। বরং মাঠে নেমেছি। নিজের এলাকায় মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেছি। হাজার হাজার মানুষের হাতে ৩১ দফার লিফলেট তুলে দিয়েছি। মতবিনিময় করেছি। প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি। মানুষের প্রত্যাশা শুনেছি। একজন নাগরিক ও রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি মনে করেছি—এই ৩১ দফাই পারে বিএনপিকে নতুনভাবে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এবারের নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তারেক রহমান যে মানদণ্ড ঘোষণা করেছিলেন—শিক্ষিত, মেধাবী, সৃজনশীল ও বিতর্কমুক্ত—সেগুলো আমি আন্তরিকভাবেই জীবনভর অনুসরণ করেছি এবং বিশ্বাস করেছি যে এই মানদণ্ড বাস্তবায়িত হবে।

কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমাকে কোনো ধরনের বিবেচনাতেই আনা হয়নি।
কারণটি ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে—আমার পকেটে কোটি কোটি টাকা নেই। সেখানে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে এমন একজনকে, যার বিরুদ্ধে রয়েছে অসংখ্য অভিযোগ, যার ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ। যিনি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বিতর্কিত তদন্তকারী কর্মকর্তা আব্দুল কাহার আকন্দের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। যদিও সেখানে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিল।

আরও দুঃখজনক হলো, মাঠে কাজ করার সময় আমি মানুষের কাছ থেকে যে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া পেয়েছিলাম, তা ওই বিতর্কিত মনোনয়নের পর যেন শাস্তিতে রূপ নেয়। আমি ওই প্রার্থীর বিরুদ্ধে একটি সংবাদ সম্মেলন করেছিলাম—শান্তিপূর্ণ ও যুক্তিনির্ভরভাবে। কিন্তু এর পরপরই এলাকায় গিয়ে আমি সংঘবদ্ধ হুমকি ও আক্রমণের মুখে পড়ি। আমাকে প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় আমি থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে বাধ্য হই।

শুধু তাই নয়, নিজের নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচারের আশায় আমি লিখিতভাবে তারেক রহমানের কাছে আবেদন জানিয়েছি। গুলশান কার্যালয়ে বিএনপির মহাসচিব, স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে চিঠি দিয়েছি। এমনকি খোলা চিঠির মাধ্যমেও বিষয়টি জনসমক্ষে তুলে ধরেছি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে—কোনো উত্তর তো দূরের কথা, ন্যূনতম সাড়াও পাওয়া যায়নি।
এই নীরবতাই অনেক কিছু বলে দেয়।

অন্যদিকে তারেক রহমান ভোটারদের উদ্দেশ্যে বলেছেন যে, তারা যেন প্রার্থী দেখে নয় বরং ধানের শীষ প্রতীক দেখে ভোট দেয়। আমি মনে করি এটা স্বৈরাচারী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। এই ধরনের ক্ষতিকর চিন্তা থেকে তারেক রহমানকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে।

বাস্তবতা হলো—এই মুহূর্তে তারেক রহমানের পছন্দের তালিকায় রয়েছেন তারাই, যারা ক্ষমতা, অর্থ ও বলপ্রয়োগের রাজনীতিতে পারদর্শী। টিআইবির রিপোর্টটি তার স্পষ্ট প্রমাণ।

এতে ব্যক্তিগতভাবে আমার কোনো ক্ষোভ নেই; কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এটি একটি ভয়ংকর বার্তা বহন করে।
কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, সন্ত্রাস, অর্থ ও ভয়ভীতির ওপর দাঁড়িয়ে কোনো টেকসই গণতান্ত্রিক রাজনীতি গড়ে ওঠে না। রেইনবো নেশনের স্বপ্ন তখনই বাস্তবায়িত হয়, যখন দল নিজের ভেতরেই ভিন্নমত, সততা ও নৈতিকতাকে জায়গা দেয়।

আমার অভিজ্ঞতায় অন্তত এটুকু বলতে পারি যে, মুখের কথা আর বাস্তব সিদ্ধান্তের মধ্যে যে গভীর ফারাক তৈরি হয়েছে, তা না ঘুচলে তারেক রহমানের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসার কোনো সম্ভাবনা আমি দেখছি না।

তারেক রহমানকে ঘিরে আমার অবস্থান কখনোই একমাত্রিক ছিল না। বরং সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে আমি একাধিক প্রবন্ধে তাঁর প্রশংসা করেছি, আশাবাদ ব্যক্ত করেছি যে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে তিনি হয়তো বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের সূচনা করবেন।
গত বছরের ফেব্রুয়ারী মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আমার ইউটিউব চ্যানেলে আমিই প্রথমবার বলেছিলাম যে, তারেক রহমানই আগামীর প্রধানমন্ত্রী।

পাশাপাশি আমার ইউটিউব চ্যানেলসহ বিভিন্ন আলোচনায় আমি প্রকাশ্যেই তাঁর প্রতি আহ্বান জানিয়েছি—লন্ডনে অবস্থানের সময়ে যেহেতু প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়া পরিচালনা করেছে ঢাকার বিএনপি নেতৃত্ব, সেহেতু সেখানে যদি কোনো ভুল নির্বাচন, বিতর্কিত ব্যক্তি বা অনৈতিক প্রভাব থেকে থাকে, তবে দেশে ফিরে তিনি যেন তা পুনর্বিবেচনা করেন, স্ক্রুটিনি করেন এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির মানুষদের মনোনয়ন দেন। এতে শুধু বিএনপিই নয়, তারেক রহমান নিজেও রাজনৈতিকভাবে উপকৃত হবেন—এমনটাই ছিল আমার বিশ্বাস।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো, দেশে ফেরার পরও তারেক রহমান সেই সুযোগটি গ্রহণ করেননি। মনোনয়ন প্রত্যারের শেষ দিন অর্থাৎ ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত মনোনয়ন প্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়নের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এর পেছনে অন্য কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ, চাপ বা স্বার্থ কাজ করেছে কি না—সেটি অবশ্যই প্রশ্নসাপেক্ষ। রাজনৈতিক মহলে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে এবার বিএনপির মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় অর্থনৈতিক প্রভাব বা ‘টাকার খেলা’ ভূমিকা রেখেছে। যদিও এ বিষয়ে আমার কাছে কোনো অকাট্য প্রমাণ নেই এবং সে কারণেই আমি দায়িত্বশীল সাংবাদিক হিসেবে বিষয়টি নিশ্চিতভাবে দাবি করতে পারি না। তবে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে এই পাবলিক পারসেপশন নিজেই একটি বড় রাজনৈতিক সংকেত। যা কোনো দলের জন্যই শুভ নয়।

এই প্রেক্ষাপটে আরও গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয় সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তারেক রহমান গুলশান অফিসে এমন কিছু মোবাইল ফোন চোরাকারবারির সঙ্গে বৈঠক করেছেন, যাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে, যাদের কার্যক্রম নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগীরা উদ্বেগ প্রকাশ করে সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়েছে। এই ধরনের অপরাধী ও বিতর্কিত চক্রের সঙ্গে বৈঠক—তা যতই রাজনৈতিক বা সামাজিক ব্যাখ্যা দেওয়া হোক না কেন—আন্তর্জাতিক অঙ্গনের জন্য এটি অত্যন্ত নেতিবাচক একটি বার্তা বলে আমি মনে করি।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সম্প্রতি হোটেল সেরিনায় এনইআইআর বিষয়ে আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ। মোবাইল চোরাকারবারিদের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন বিএনপি ক্ষমতায় গেলে এনইআইআর নীতিমালা পর্যালোচনা করা হবে। এই ঘটনাগুলো মোটেও বিচ্ছিন্ন নয়। বরং এতে একটি সমন্বিত ও সংগঠিত সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সুতরাং এখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, জাতীয় স্বার্থ ও জনস্বার্থবিরোধী এই ধরনের অবৈধ ব্যবসায়ী চক্রের সঙ্গে বিএনপির ঘনিষ্ঠতা কি দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করছে না?

এ ধরনের ঘটনা শুধু নৈতিক প্রশ্নই তোলে না বরং এটি বিএনপির নির্বাচনী সম্ভাবনার ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় খুব সূক্ষ্মভাবে এসব সংকেত পর্যবেক্ষণ করে। আজ যারা সম্ভাব্য রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তারেক রহমানকে দেখছে, তারা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করবে—তিনি কি সত্যিই দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের নেতৃত্ব দেবেন, নাকি অবৈধ ব্যবসা ও কালো অর্থনীতির প্রশ্রয়দাতা হবেন?
এই বিষয়গুলো নিয়ে আমি সম্প্রতি একটি পৃথক প্রবন্ধে তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি এবং বিএনপির পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন অবস্থান ও ব্যাখ্যা প্রত্যাশা করেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এখন পর্যন্ত বিএনপির তরফ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এই নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও সন্দেহজনক করে তুলছে।

নির্বাচনী হলফনামায় যখন ঋণগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের দাপট স্পষ্ট, তখন এসব ঘটনা একত্রে বিবেচনা করলে বোঝা যায়—বাংলাদেশের রাজনীতি এখন আর শুধু আদর্শের সংকটে নয় বরং এটি গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে অবৈধ অর্থ, ঋণনির্ভর ব্যবসা ও ক্ষমতার অনৈতিক সমীকরণের সঙ্গে। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতে চরম মূল্য দিতে হবে। এতে আমার কোন সন্দেহ নেই।

আরেকটি বড় উদ্বেগের জায়গা হলো গণমাধ্যম। আজ তারেক রহমানকে ঘিরে যে একচেটিয়া প্রশংসার জোয়ার দেখা যাচ্ছে, তা শেখ হাসিনার সময়কার চাটুকার মিডিয়াকেই মনে করিয়ে দেয়। তখনও সমালোচনা অনুপস্থিত ছিল। ফলাফল ছিল ফ্যাসিবাদ।
মিডিয়া যদি আবারও ক্ষমতার মুখপাত্রে পরিণত হয়। তবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি অনিবার্য।

প্রায় তিন দশকের সাংবাদিকতা ও নাগরিক অভিজ্ঞতা থেকে আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি—বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা দুর্নীতি। দুর্নীতি নির্মূল করা গেলে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক, সন্ত্রাস—সবই কমে যাবে। অন্যদিকে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুলাংশে হ্রাস পাবে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ফিরে আসবে স্বাচ্ছন্দ্য। শক্তিশালী হয়ে উঠবে নাগরিক সমাজ।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, চলমান নির্বাচনী প্রচারণায় শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের কারো মধ্যেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জোরালো কোনো অঙ্গীকার নেই।

ভোটারদের প্রতি আমার সবিনয় অনুরোধ। ভোট একটি আমানত। যারা দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেবে না। তাদের প্রত্যাখ্যান করাই নাগরিক দায়িত্ব। এবার ‘না ভোট’-এর সুযোগ রয়েছে। সুতরাং প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো প্রার্থী পছন্দ না হলে না ভোট ব্যবহার করাও একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা হতে পারে।

এখানে তারেক রহমানকে বলতে চাই যে, বিএনপি ও আপনার একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আপনার ভালো কাজের প্রশংসা যেমন করব, তেমনি ভুল সিদ্ধান্তের সমালোচনাও করব। এটি বিদ্বেষ থেকে নয় বরং ভালোবাসার জন্য ভৎসনার যে দর্শন, সেখান থেকেই। আমার সমালোচনার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে, আপনার সরকার যাতে স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের একজন অনুসারী হিসেবে এই দায়িত্ব আমি পালন করে যাব, ইনশাল্লাহ। এর পরিণতি আমার জন্য সুখকর নাও হতে পারে, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হতে পারি। বঙ্গভবন ও গণভবনের অতিথি তালিকায় হয়তো কখনোই আমার নাম উঠবে না—তাতে আমার কোনো আক্ষেপ নেই। কোনো ব্যক্তি বা ক্ষমতাকে খুশি করতে নয় বরং আমি লিখি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও বিবেকের স্বাধীনতা থেকে।

শেষ কথা
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু ক্ষমতা বদলের নয়। এটি বাংলাদেশ তথা প্রতিটি নাগরিকের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মুহূর্ত। এই সুযোগ নষ্ট হলে পুরনো বন্দোবস্তই ফিরে আসবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই।
দুর্নীতি-চাঁদাবাজমুক্ত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব না হলে বারবার ক্ষমতার পালাবদল হলেও আপনার আমার ভাগ্যের কোনো বদল হবে না।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin