বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বৈরশাসন শব্দটি উচ্চারিত হলেই দুটি সময়কাল বিশেষভাবে আলোচনায় আসে—এরশাদ আমল এবং সাম্প্রতিক অতীতের শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন দীর্ঘ শাসনকাল। দুই সময়ের প্রেক্ষাপট, শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক আচরণ এক নয়; তবে নাগরিক স্বাধীনতা, বিরোধী রাজনীতির প্রতি দমননীতির অভিযোগ এবং ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্য বা ক্ষমতার অপব্যবহার—এই তিনটি বিষয়ে অদ্ভুত সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। স্বৈরাচার পতন দিবসে ইতিহাসের এই ধারাবাহিকতাই আজ আমার আলোচনার বিষয়।
১৯৮২ সালে সামরিক বাহিনীর প্রধান হিসেবে ক্ষমতা দখলের পর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আট বছরের বেশি সময় দেশ শাসন করেন। তার শাসনামলে রাজনৈতিক বিরোধিতা দমনে যে ধরনের কর্তৃত্ববাদী নীতি গৃহীত হয়েছিল—তা তৎকালীন সংবাদমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন ও রাজনৈতিক গবেষকদের বিশ্লেষণে আজও তা মূর্ত হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিক দলগুলোর গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা ও স্বাধীনভাবে সাংগঠনিক কর্মকান্ডে বাধা, ছাত্র আন্দোলনে দমননীতি, বিরোধীদের গ্রেপ্তার ও হেনস্তা ছিল সেই সময়ের প্রতিদিনের বাস্তবতা। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যিনি তৎকালীন বিরোধী রাজনীতির প্রধান শক্তি। সেই বেগম জিয়া এরশাদ সরকারের নানা নিষেধাজ্ঞা, হয়রানি ও গৃহবন্দিত্বের মুখোমুখি হন। বিএনপির বহু নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হন বিভিন্ন আন্দোলনের সময়। দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক মিছিল ভেঙে দেওয়া, রাতের আঁধারে নেতাকর্মীদের আটক—এসব ছিল সামরিক স্বৈরতন্ত্রের চেনা চিত্র।
এরশাদবিরোধী গণআন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা তাকে “আপসহীন নেত্রী” উপাধি এনে দেয়। বিশেষ করে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে প্রহসনের নির্বাচনে অংশ না নিয়ে তিনি গণতন্ত্রের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন। পক্ষান্তরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ও জামায়াত ইসলাম সেই প্রহসনের নির্বাচনে অংশীদার ছিল। পরবর্তীতে ১৯৮৭–৯০ সময়কালের ঢাকার রাজপথের আন্দোলন—যেখানে ছাত্র, শ্রমিক, পেশাজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণ—এরশাদের পতনের ডাক দিয়েছিল—সেই বৃহৎ গণপ্রতিরোধের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
বিভিন্ন আন্দোলনের সময় তিনি একাধিকবার গৃহবন্দি হন, পার্টি অফিসে পুলিশি বাধার মুখে পড়েন, কিন্তু তার অবস্থান ছিল অটল-অবিচল। তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন যে স্বৈরাচারের পতনের আগ পর্যন্ত কোনো আপস নয়। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এই সংগ্রামই তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে।
১৯৯০ সালের ডিসেম্বরের গণঅভ্যুত্থানে যখন এরশাদের পতন ঘটে, তখন নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে খালেদা জিয়া সবচেয়ে আলোচিত মুখ। এই প্রেক্ষাপটেই তিনি জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার এমন উচ্চতায় পৌঁছান যা তাকে পরবর্তী সময়ে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ তৈরি করে।
অন্যদিকে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের ব্যাপক বিজয় ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। মুক্তিযুদ্ধ, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি নিয়ে শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসেন। শুরুতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের প্রত্যাশা থাকলেও—সময়ের সাথে সাথে তার শাসন কঠোর-কর্তৃত্ব পরায়ণতার দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
বিশেষ করে বিএনপির ওপর নজিরবিহীন রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার, দীর্ঘদিন কারাগারে বন্দী করে নির্যাতন। এসবই রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক তৈরি করে।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা যা আজও অগণিত বিএনপি নেতাকর্মীদের মাথার উপর ঝুলছে।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, তারেক রহমানকে ২১ আগস্ট মামলায় জড়ানো, তার বিরুদ্ধে বহু মামলার পুনরুজ্জীবন, এবং নির্বাসনে থাকতে বাধ্য করে পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা।
স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে অন্যতম সমালোচিত বিষয় ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া।
সামাজিকমাধ্যমে মন্তব্যের কারণে গ্রেপ্তার। সাংবাদিকদের উপর চাপ।এগুলো দেশের নাগরিক স্বাধীনতাকে চরমভাবে ব্যাহত করে।
এমন প্রেক্ষাপটে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনও এ সময়ে রাজনৈতিক নিখোঁজ হওয়া, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিরোধী কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের বিষয়টি নিয়মিতই তুলে ধরেছে।
বিএনপি কর্মীদের ওপর হামলা, গ্রেপ্তার ও মামলা-নির্যাতন নিয়ে বারবার রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনেও বহুবার এসব বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশিত হয়। যদিও সরকার বরাবরইই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে উন্নয়ন, সন্ত্রাস দমন ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার হাস্যকর ও ভিত্তিহীন ঢোল বাজিয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল ও টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনে প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বিরোধী দল অর্থাৎ প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি সংসদের বাইরে থাকা, একাধিক নির্বাচন বয়কট, এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হওয়ার কারণে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সংকুচিত হয়।এ কারণে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শেখ হাসিনার সরকারকে “স্বৈরাচারী ও কর্তৃত্ববাদী”হিসেবে পরিচিত করে তোলে।
শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরশাসনের ফলে জুলাই মাসের অভ্যুত্থান—রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নাটকীয় মোড় এনে দেয়। জনআন্দোলন, প্রশাসনিক অচলাবস্থা, যুবসমাজের ক্ষোভ এবং রাষ্ট্রশক্তির ভেতরকার নড়াচড়ার ফলে শেখ হাসিনার পতন ঘটে।
এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবারই প্রমাণ হয়েছে যে,ক্ষমতা যখন কেন্দ্রীভূত হয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়ে এবং বিরোধী কণ্ঠরোধ করা হয়।তখন রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে অসন্তোষ জমতে থাকে।
শেষ কথা:
এরশাদ থেকে শেখ হাসিনা—ক্ষমতার উচ্চতা ভিন্ন হলেও দমননীতির অভিযোগ, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার তৎপরতার মাঝে অদ্ভুত মিল দেখা যায়।সুতরাং গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে জরুরি হলো ক্ষমতার জবাবদিহি, নির্বাচনের স্বচ্ছতা এবং নাগরিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। স্বৈরতন্ত্রের পতন বারবার প্রমাণ করেছে—শেষ পর্যন্ত জনগণের সম্মিলিত শক্তিই সবচেয়ে বড় শক্তি।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ahabibhme@gmail.com