১২ই ফেব্রুয়ারি কেবল একটি ভোটের তারিখ নয়।
এটি আপনার, আমার, আমাদের—মালিকানা পুনরুদ্ধারের দিন।
৫৫ বছরের বস্তা-পচা রাজনীতির শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার দিন। ভোগবাদ, তোষামোদ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলদারি আর আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর দিন।
হ্যাঁ—ভোট দিয়ে দেশের মালিকানা দখলে নেওয়ার দিন।
আমাদের রাজনীতির সবচেয়ে নির্মম সত্যটি হলো—এই দেশে ভোটাররা কেবল নির্বাচন পর্যন্তই গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন এলেই তারা হয়ে ওঠেন “জনগণ”, “ক্ষমতার উৎস”, “রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক”। অথচ ভোট শেষ হলেই তারা পরিণত হন বিস্মৃত এক জনগোষ্ঠীতে—যাদের আর কেউ খোঁজ রাখে না। এই দ্বিচারিতা কোনো সাম্প্রতিক ব্যাধি নয়; এটি গত ৫৫ বছর ধরে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে লালিত একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি। একে আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এটি একটি ধারাবাহিক প্রতারণার ইতিহাস।
নির্বাচনের আগে দৃশ্যপট বদলে যায়। কর্দমাক্ত রাস্তার ধারে দাঁড়ানো ভোটারকে বুকে টেনে নেওয়া হয়। ঘর্মাক্ত শরীরের ক্লান্ত মানুষটির সঙ্গেও হাত মেলাতে কার্পণ্য থাকে না। ছবি তোলা হয়, হাসি বিনিময় হয়, “ভাই”, “আপন মানুষ”—এমন সব সম্বোধনে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। কিন্তু ভোট শেষ হলে সেই একই মানুষ অদৃশ্য হয়ে যায়। প্রার্থী তখন ব্যস্ত, অপ্রাপ্য, ‘বিশিষ্টজন’। ভোটার আর নাগরিক নন—তিনি হয়ে যান কেবল ব্যবহৃত একটি সংখ্যা। এই ভণ্ডামিই আমাদের রাজনীতির রক্তে মিশে গেছে।
এই দেশটি বহুদিন ধরে ভদ্রলোকের উর্দি পরা প্রতারকদের হাতে বন্দী। তারা মুখে সততার কথা বলেন, অথচ কাজে অনৈতিকতার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকেন। তারা উন্নয়নের গল্প শোনান, কিন্তু সেই উন্নয়নের সুফল সীমাবদ্ধ থাকে হাতে গোনা কিছু মানুষের মধ্যে। চাঁদাবাজি, দখলদারি, দুর্নীতি, মাদক ও সন্ত্রাস—এসবই তাদের নীরব মিত্র। নির্বাচনের সময় এসব ঢেকে যায় মাইক, ব্যানার আর আবেগী স্লোগানের আড়ালে। ভোট কেনা হয়—কখনো নগদ টাকায়, কখনো উপহারে, কখনো ভয় দেখিয়ে, কখনো মিথ্যা আশ্বাসে। আর ভোটাররা ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন এই অপমানজনক বাস্তবতায়।
আমি দৃঢ়ভাবে মনে করি, এই দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো ভোটারদের সচেতনতা। সচেতনতা মানে শুধু ভোটকেন্দ্রে যাওয়া নয়; সচেতনতা মানে বুঝে-শুনে ভোট দেওয়া। সৎ, যোগ্য ও জবাবদিহিমূলক মানুষকে বেছে নেওয়া। কোনো কিছুর বিনিময়ে ভোট না দেওয়া। কারণ যে ভোট কেনা হয়, সেই ভোটে যে ক্ষমতা আসে—তা জনগণের প্রতি নয় বরং ক্রেতার প্রতি দায়বদ্ধ থাকে। তখন ভোটার মালিক থেকে ক্ষমতার গোলামে পরিণত হন।
আমি আগেও বহুবার বলেছি, আবারও বলছি—১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়। এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এটি ১৮ কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের দিন। এটি সেই দিন, যেদিন আমরা চাইলে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অবস্থান নিতে পারি। এটি সেই সুযোগ, যখন বস্তা-পচা রাজনীতির কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন হলো—আমরা কি সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারব?
এই নির্বাচন একটি স্পষ্ট বার্তা নিয়ে এসেছে আমাদের সামনে। আর তা হল-দুর্নীতিবাজকে না বলতে হবে। চাঁদাবাজকে না বলতে হবে।দখলবাজকে না বলতে হবে। মাদক ও সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষককে না বলতে হবে।
ঋণখেলাপি ও ক্ষমতার অপব্যবহারকারীকে না বলতে হবে। দল, প্রতীক কিংবা স্লোগান নয়—মানুষটাই মুখ্য। তার অতীত, তার নৈতিকতা, তার জবাবদিহি—এসবই হওয়া উচিত সিদ্ধান্তের ভিত্তি। অন্যথায় আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। তারা প্রশ্ন করবে—তোমরা সুযোগ পেয়েও কেন সঠিক সিদ্ধান্ত নাওনি?
এই প্রসঙ্গে একটি গল্প উল্লেখ করা জরুরি—যেটি আমার প্রিয় বন্ধুবর শফিক ভাই সম্প্রতি আমার সঙ্গে শেয়ার করেছেন।
একদিন হিটলার একটি মুরগি হাতে নিয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এলেন। তিনি মুরগিটির মাথা বগলের নিচে শক্ত করে চেপে ধরে হাঁটতে হাঁটতে তার পালক একে একে ছিঁড়তে শুরু করলেন। যন্ত্রণায় মুরগিটি ছটফট করতে লাগল, চিৎকার করল—কিন্তু হিটলার কোনো ভ্রুক্ষেপ করলেন না। মন্ত্রিসভার সদস্যরা অনুরোধ করলেন, “এই নিরীহ প্রাণীটাকে কষ্ট দেবেন না।” কিন্তু তিনি কারো কথা শুনলেন না।
সব পালক ছিঁড়ে ফেলার পর তিনি মুরগিটিকে মাটিতে ছুড়ে ফেললেন। এরপর পকেট থেকে কয়েকটি শস্যদানা বের করে সেটিকে খাওয়াতে শুরু করলেন। ক্ষুধায় কাতর মুরগিটি আবার তার হাতের দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ পর সে কাছে এসে সেই দানাগুলো খেতে লাগল।
যে মুরগিটি কিছুক্ষণ আগেও প্রাণ বাঁচাতে ছটফট করছিল, সেই মুরগিটিই এখন কয়েকটি দানার জন্য নির্যাতনকারীর পাশে বসে আছে।
মন্ত্রিসভার সদস্যরা বিস্ময়ে প্রশ্ন করলেন—“এটা কী?”
হিটলারের উত্তর ছিল ভয়ংকর:
“ভোটাররা ঠিক এমনই। সাড়ে চার বছর আমরা তাদের পালক ছিঁড়ি। আর শেষ ছয় মাসে কয়েকটি দানা ছুঁড়ে দিই। সেই দানার বিনিময়ে তারা সব ভুলে যায়—এবং আবার আমাদেরই ভোট দেয়।”
এটি কোনো কৌতুক নয়। এটি একটি সতর্কবার্তা। আমাদের রাজনীতিতে এই ‘দানা ছোড়া’ সংস্কৃতি বহু পুরোনো—পাঁচ বছর অবহেলা, আর নির্বাচনের আগে সামান্য সুবিধা। তারপর আবার ক্ষমতা। প্রশ্ন হলো—আমরা কি আবারও সেই কয়েকটি দানার কাছে আত্মসমর্পণ করব?
ভোটাররা যদি আজ সিদ্ধান্ত নেন—“একদিনের গোলামি নয়, পাঁচ বছরের মালিকানা”—তাহলে রাজনীতির ভাষা বদলে যাবে। তখন নেতারা আর জনগণকে এড়িয়ে যেতে পারবে না। তখন ক্ষমতা হবে শর্তসাপেক্ষ, সীমাবদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক। নেতারা ঘুরবে জনগণের পেছনে—শুধু ভোটের আগে নয়, ভোটের পরেও।
এটি কোনো দলীয় আহ্বান নয়। এটি একটি নাগরিক ডাক। সম্মানিত ভোটারদের প্রতি আমার সবিনয় নিবেদন। কারণ সততা কোনো দলের একচেটিয়া সম্পদ নয়, আর দুর্নীতি কোনো দলের একক ব্যাধিও নয়। সৎ মানুষ দলের চেয়েও মূল্যবান। যোগ্যতা দলের চেয়েও বেশি জরুরি। আমরা যদি যোগ্যকে বেছে নিতে পারি, রাষ্ট্র শক্ত হবে; না পারলে রাষ্ট্র দুর্বলই থেকে যাবে।
শেষ কথা:
আমার বিশ্বাস—অনেক দেরি হয়ে গেছে। আর নয়। এবার ঘুরে দাঁড়ানোর সময়। ১২ ফেব্রুয়ারির আসল নায়ক আপনারাই। প্রমাণ করুন, এই দেশের প্রকৃত মালিক ভোটাররা। প্রমাণ করুন, রাজনীতি আর অভিনয় নয়—এটি জনগণের সঙ্গে করা একটি চুক্তি। দয়া করে নিজেকে বিক্রি করবেন না। কোনো কিছুর বিনিময়ে নয়। কোনো কিছুর লোভে একদিনের জন্য প্রতারিত হয়ে পাঁচ বছরের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করবেন না। বরং পাঁচ বছরের জন্য মালিক হয়ে উঠুন। তাহলেই ইতিহাসের পাতায় লেখা হবে আপনার নাম—কারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভোটাররাই আসল নায়ক।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com