আজ সোমবার, ২০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৩রা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
আজ সোমবার, ২০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৩রা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

হাদী গুলিবিদ্ধ: নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র

ইনকিলাব মঞ্চের প্রধান নেতা এবং ঢাকা ৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী ওসমান হাদী গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক ধরে এদেশের মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। এর ফলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তাই শুধু একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার, রাজনৈতিক আস্থা ফেরানো এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক উত্তরণের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। শেখ হাসিনার দীর্ঘ কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা সেই অর্থে জাতির সামনে একটি নতুন প্রত্যাশার জানালা খুলে দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে যে এই নির্বাচন বানচাল করতে চাই কারা, এবং কেন?

এ কথা সত্যি যে, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। বিশেষত বিগত এক দশকে ভোটাধিকার কার্যত সীমিত হয়ে পড়ে। ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচন, ২০১৮ সালের প্রশ্নবিদ্ধ ভোটগ্রহণ এবং ২০২৪ সালের প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের আস্থাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ভোটার উপস্থিতি কমেছে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সংকুচিত হয়েছে এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন বেড়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট ডাল গণতন্ত্রের ন্যূনতম শর্ত হিসেবে “অর্থবহ অংশগ্রহণ ও প্রতিযোগিতা”-র কথা বলেছিলেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দুই উপাদানই দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত ছিল।

এই প্রেক্ষাপটে মানুষ সত্যিকার অর্থে ভোটার হিসেবে তাদের অধিকার প্রয়োগ করতে দীর্ঘ প্রতীক্ষায় আছে। উন্নয়নের অবকাঠামো যত দৃশ্যমানই হোক, গণতান্ত্রিক উত্তরণ ছাড়া উন্নয়ন যে টেকসই হয় না এটি বারবার প্রমাণিত হয়েছে। ভারতের নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন যথার্থই বলেছেন, “গণতন্ত্র শুধু ভোটের ব্যবস্থা নয়; এটি মানুষের কণ্ঠস্বর ও জবাবদিহির একটি কাঠামো।” বাংলাদেশের সংকট মূলত এই কণ্ঠস্বরের সংকট।

নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণার মাত্র ২০ ঘণ্টার মধ্যে রাজধানীর বিজয়নগর কালভার্ট রোডে প্রকাশ্য দিবালোকে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদির ওপর গুলির ঘটনা ঘটে। এর কিছুদিন আগে চট্টগ্রামে এক প্রার্থীকে লক্ষ্য করে গুলি, রংপুরে মুক্তিযোদ্ধা দম্পতিকে কুপিয়ে হত্যা এবং লক্ষ্মীপুর জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন বলে দেখছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের বক্তব্য হচ্ছে তদন্তের আগে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা যাবে না।

কিন্তু আমি মনে করি, এই ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন বলে উড়িয়ে দেয়া মোটেও সুবিবেচনার পরিচায়ক নয়। বিশেষ করে যখন প্রশ্ন ওঠে যে, ঘটনাগুলোর সময়কাল ও লক্ষ্যবস্তু কি কাকতালীয়? তফসিল ঘোষণার পরপরই প্রার্থী, নির্বাচন অবকাঠামো ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্বদের ওপর হামলা নির্বাচনী পরিবেশে ভীতির আবহ তৈরি করছে। যদিও এটি নির্বাচনের ইতিহাসে নতুন কিছু নয়।
রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে গবেষক স্যামুয়েল হান্টিংটন সতর্ক করে ছিলেন এই বলে যে, গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সময় “অস্থিরতা ও সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ে”, বিশেষত যখন ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা প্রবল হয়।

এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র কারা করতে পারে। এ প্রশ্নের সহজ উত্তর হচ্ছে, ক্ষমতার বাইরে থাকা এমন গোষ্ঠী যারা গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের অপ্রস্তুত মনে করে। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের রায় এলে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে তারা ভীতি, সহিংসতা ও উসকানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়।

দ্বিতীয়ত, আদর্শগতভাবে নির্বাচনবিরোধী বা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অনাস্থাশীল কিছু রাজনৈতিক শক্তি। সাম্প্রতিক অতীতে আমরা লক্ষ্য করেছি যে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা ও অংশগ্রহণে অনীহার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশ করা তাদের অধিকার; কিন্তু দুঃখজনকভাবে সহিংসতা বা উসকানির মাধ্যমে নির্বাচন বানচাল করার চেষ্টা গণতন্ত্রবিরোধী। যা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।

তৃতীয়ত, রাষ্ট্রের ভেতরে বা আশপাশে থাকা স্বার্থান্বেষী চক্র, যারা দীর্ঘদিনের অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সুবিধাভোগী ছিল। জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সুবিধা হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই নির্বাচনকে অনিশ্চিত রাখা তাদের জন্য লাভজনক।

চতুর্থত, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও বিবেচ্য। একটি অস্থিতিশীল নির্বাচন প্রক্রিয়া আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির কাছে বাংলাদেশকে আরও দুর্বল করে তুলতে পারে। গণতন্ত্র দুর্বল হলে পররাষ্ট্রনীতিতেও স্বচ্ছতা কমে। এ কথা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্না আরেন্টের বিশ্লেষণে বারবার উঠে এসেছে।

সরকার ও নির্বাচন কমিশন বলছে, তারা যেকোনো মূল্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে করতে চায়। তারা বলছে,প্রশাসন তাদের তত্ত্বাবধানে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয় আছে। তবে বাস্তবতা হলো, কমিশনের নিরপেক্ষতা ও দৃঢ়তা নিয়ে জনমনে এখনো সংশয় রয়ে গেছে। বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে সহিংসতাকে হালকা করে দেখার প্রবণতা বর্তমান পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করে তুলতে পারে বলেও আমি মনে করি।

জন স্টুয়ার্ট মিল বলেছেন, “গণতন্ত্রের শক্তি তার প্রতিষ্ঠানগুলোর সাহসে।” কমিশনের সাহস মানে শুধু নির্বাচন ঘোষণা নয়; বরং প্রতিটি সহিংস ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত, দৃশ্যমান ও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ।

একথা স্বীকার করতে হবে যে,দীর্ঘকাল গণতন্ত্রহীনতা আমাদের রাষ্ট্রের গভীরে মারাত্মক ক্ষত সৃষ্টি করেছে। প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়েছে, আইন প্রয়োগে বৈষম্য বাড়ছে, তরুণ প্রজন্ম রাজনীতিবিমুখ হয়েছে।

অ্যালেক্সিস দ্য তোকভিল গণতন্ত্রকে আখ্যা দিয়েছিলেন “শিক্ষণীয় অভ্যাস” হিসেবে যা মানুষকে নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। বাংলাদেশে সেই অভ্যাস দীর্ঘদিন অনুশীলিত না হওয়ায় রাজনৈতিক সংস্কৃতি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সুতরাং ১২ ফেব্রুয়ারীর নির্বাচন সেই সংস্কৃতি পুনর্গঠনের একটি সুযোগ বলে আমি মনে করি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচাল করার চেষ্টা থাকবে।এটাই বাস্তবতা। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র ও সমাজ কি তা মোকাবিলা করতে পারবে? এর জন্য তিনটি বিষয় জরুরি: এক, নির্বাচন কমিশনের দৃঢ় ও স্বচ্ছ ভূমিকা; দুই, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা; তিন, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের সক্রিয় নজরদারি।

নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, “ভোটই গণতন্ত্রের আত্মা।” বাংলাদেশের মানুষের সেই আত্মা দীর্ঘদিন অবদমিত ছিল। এই নির্বাচন যদি সহিংসতা ও ষড়যন্ত্রের কাছে পরাজিত হয়, তবে ক্ষতি শুধু একটি ভোটের নয় বরং ক্ষতি হবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের। প্রতিটি মানুষের। আর যদি সব বাধা অতিক্রম করে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তবে তা হবে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে এক ঐতিহাসিক বাঁক। সুতরাং সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হতেই হবে। আমাদের সামনে সত্যিই এর কোন বিকল্প নেই।
লেখক:সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin