আজ বুধবার, ২৭শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১০ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
আজ বুধবার, ২৭শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১০ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

পাসপোর্ট অফিসের ঘুষ বাণিজ্য থামছে না কেন?

 

রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবাগুলোর একটি হলো পাসপোর্ট। এটি শুধু বিদেশ ভ্রমণের অনুমতিপত্র নয়; বরং নাগরিক পরিচয়, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক আস্থা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার প্রতীক। অথচ বাংলাদেশের বাস্তবতায় পাসপোর্ট অফিস মানেই অনেক মানুষের কাছে দালাল, ঘুষ, হয়রানি, ফাইল আটকে যাওয়া, তথ্য সংশোধনের নামে অনন্ত ভোগান্তি এবং “চ্যানেল ছাড়া কাজ হয় না”—এমন এক ভয়ঙ্কর সংস্কৃতির নাম। প্রশ্ন হচ্ছে, ডিজিটাল বাংলাদেশ, ই-পাসপোর্ট, অনলাইন আবেদন, বায়োমেট্রিক ব্যবস্থা—সবকিছু চালু হওয়ার পরও কেন পাসপোর্ট অফিসের ঘুষ বাণিজ্য থামছে না?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্নীতি নয়; বরং বহু বছর ধরে গড়ে ওঠা এক প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক সিন্ডিকেট, যেখানে দালাল, কর্মকর্তা, রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল, এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসাধু অংশ পর্যন্ত জড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি এখানে আর ব্যক্তিগত লোভের পর্যায়ে নেই; এটি একটি সংগঠিত “সিস্টেম”।

সম্প্রতি বিভিন্ন অনুসন্ধান ও অভিযোগে যে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, তা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। “চ্যানেল মাস্টার” নামে পরিচিত বিশেষ কর্মচারীর মাধ্যমে দালালদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ, হিসাব সংরক্ষণ এবং ভাগবাঁটোয়ারার যে পদ্ধতির কথা উঠে এসেছে, তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সেবাকে জিম্মি করে গড়ে ওঠা এক ছায়া অর্থনীতি।

অভিযোগ রয়েছে, আবেদনপ্রতি দেড় হাজার থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়, যা সরকার নির্ধারিত ফি’র বাইরে। ভয়ঙ্কর বিষয় হলো—এই অর্থ কেবল নিচু স্তরে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ হয়ে যায়।

বাংলাদেশের পাসপোর্ট অফিসগুলোকে “এ”, “বি” এবং “সি” ক্যাটাগরিতে ভাগ করার যে তথ্য সামনে এসেছে, তা দুর্নীতির আরেকটি অন্ধকার বাস্তবতা তুলে ধরে। কোথায় কত আবেদন জমা পড়ে, কোথায় কত টাকা ওঠে—সেটিই যেন পোস্টিংয়ের মূল যোগ্যতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে অফিসে আবেদন বেশি, সেখানে পোস্টিং পেতে হলে মোটা অঙ্কের ঘুষ লাগে—এমন অভিযোগ বহুদিনের।
অর্থাৎ, কেউ যদি অবৈধভাবে কোটি টাকা খরচ করে একটি “লাভজনক পোস্টিং” নেয়, তাহলে সে সেই টাকা তুলতে চাইবেই। এভাবেই ঘুষ একটি “ইনভেস্টমেন্ট মডেল”-এ পরিণত হয়।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—এই দুর্নীতিকে অনেক জায়গায় “ওপেন সিক্রেট” হিসেবে দেখা হয়। সাধারণ মানুষ জানে, দালাল ছাড়া কাজ করা কঠিন। কর্মকর্তা জানেন, কোথায় টাকা যাচ্ছে। দালাল জানে, কার ভাগ কত। এমনকি সেবাগ্রহীতারাও অনেকে ধরে নিয়েছেন—“টাকা না দিলে সময়মতো পাসপোর্ট পাওয়া যাবে না।” যখন কোনো অন্যায় সমাজে স্বাভাবিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়, তখন সেটি থামানো সবচেয়ে কঠিন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ বিদেশে যান—কেউ শ্রমিক হিসেবে, কেউ শিক্ষার্থী, কেউ চিকিৎসা বা ব্যবসার প্রয়োজনে। তাদের বড় একটি অংশ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত। একজন প্রবাসগামী শ্রমিক যখন পাসপোর্ট করতে গিয়ে অতিরিক্ত কয়েক হাজার টাকা ঘুষ দিতে বাধ্য হন, তখন সেটি শুধু অর্থনৈতিক চাপ নয়; এটি তার আত্মমর্যাদার ওপরও আঘাত। কারণ, রাষ্ট্র তাকে নাগরিক হিসেবে সম্মান দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে—ডিজিটালাইজেশন কেন দুর্নীতি কমাতে পারেনি? বাস্তবতা হলো, প্রযুক্তি নিজে দুর্নীতি বন্ধ করতে পারে না, যদি দুর্নীতিবাজ মানুষ সেই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকে। অনলাইন আবেদন চালু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আবেদন যাচাই, পুলিশ ভেরিফিকেশন, তথ্য সংশোধন, জরুরি অনুমোদন, ডেলিভারি—প্রতিটি ধাপে মানুষের হস্তক্ষেপ রয়ে গেছে। আর যেখানে discretionary power থাকে, সেখানেই দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সাধারণ আবেদনকারীর ফাইল “অপেক্ষমাণ” অবস্থায় পড়ে থাকে, অথচ দালালের মাধ্যমে আসা আবেদন দ্রুত এগিয়ে যায়। অর্থাৎ, কৃত্রিম জট তৈরি করে পরে ঘুষের বিনিময়ে সমাধান দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এটি কেবল প্রশাসনিক দুর্নীতি নয়; এটি এক ধরনের মানসিক নির্যাতন।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার অভিযান অতীতে কিছু আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। বিশেষ করে ২০১৯ সালে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) অভিযানে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠে আসে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—তারপর কী হয়েছে? যদি দুর্নীতির বড় অংশ রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক আশ্রয় এবং ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় টিকে থাকে, তাহলে বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে কি এই সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব?

বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতির একটি বড় সমস্যা হলো—দুর্নীতির বিচার প্রায়ই ব্যক্তি নির্ভর, কিন্তু সংস্কার হয় না প্রতিষ্ঠানভিত্তিক। ফলে এক কর্মকর্তা বদলি হন, আরেক কর্মকর্তা আসেন; কিন্তু “সিস্টেম” অপরিবর্তিত থাকে। যে কারণে একই অভিযোগ বারবার ফিরে আসে।

এই সংকটের আরেকটি ভয়ঙ্কর দিক হলো—দালালদের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। দেশের অনেক পাসপোর্ট অফিসের আশপাশে প্রকাশ্যেই দালালদের সক্রিয়তা দেখা যায়। তারা আবেদনপত্র পূরণ থেকে শুরু করে পুলিশ ভেরিফিকেশন পর্যন্ত সবকিছুর “প্যাকেজ” অফার করে। প্রশ্ন হচ্ছে, প্রশাসন কি সত্যিই তাদের চেনে না? নাকি এই অদৃশ্য সম্পর্কই পুরো দুর্নীতির চালিকাশক্তি?

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে পাসপোর্ট সেবা সাধারণত সময়নির্ভর, স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিনির্ভর। সেখানে আবেদনকারী জানেন—কত দিনে পাসপোর্ট পাবেন, কোথায় সমস্যা হলে অভিযোগ করবেন এবং কর্মকর্তার জবাবদিহি কোথায়। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা দুর্বল, তথ্যের স্বচ্ছতা সীমিত এবং নাগরিক সেবার মান অঞ্চলভেদে অসম।

তবে ই-পাসপোর্ট চালু হওয়া, অনলাইন ফি প্রদান, এসএমএস ট্র্যাকিং—এসব উদ্যোগ ইতিবাচক। কিন্তু সমস্যা হলো, প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে প্রশাসনিক নৈতিকতা ও জবাবদিহি তাল মিলিয়ে এগোয়নি। ফলে ডিজিটাল ব্যবস্থার আড়ালেও পুরোনো দুর্নীতির চক্র টিকে গেছে।

এই অবস্থায় কী করা জরুরি?
প্রথমত, পাসপোর্ট অফিসে পোস্টিং বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। যেসব অফিসকে “লাভজনক” হিসেবে দেখা হয়, সেখানে দীর্ঘদিন একই ব্যক্তিকে রাখা যাবে না। স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক বদলি নীতি চালু করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, দালালমুক্ত জোন ঘোষণা করলেই হবে না; বাস্তবে কঠোর অভিযান চালাতে হবে। পাসপোর্ট অফিসের আশপাশে দালালদের প্রকাশ্য উপস্থিতি প্রশাসনের ব্যর্থতার প্রতীক।

তৃতীয়ত, প্রতিটি আবেদন প্রক্রিয়ার ডিজিটাল ট্র্যাকিং বাধ্যতামূলক করতে হবে। কোন কর্মকর্তা কতক্ষণ ফাইল আটকে রাখলেন, কোথায় বিলম্ব হলো—সবকিছু কেন্দ্রীয় সার্ভারে দৃশ্যমান থাকতে হবে।

চতুর্থত, দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো কর্মকর্তা রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে দায়মুক্তি পেলে পুরো ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট হয়।

পঞ্চমত, সাধারণ মানুষের জন্য সহজ অভিযোগ ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যেখানে অভিযোগকারী নিরাপত্তা পাবেন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিকার নিশ্চিত হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, নাগরিক সেবা কি অধিকার, নাকি বাণিজ্য? যদি পাসপোর্টের মতো মৌলিক সেবাও দালাল ও ঘুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে ডিজিটাল রাষ্ট্রের দাবিগুলো কাগজে সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। পাসপোর্ট অফিসের ঘুষ বাণিজ্য কেবল কিছু অসাধু কর্মকর্তার অনিয়ম নয়; এটি প্রশাসনিক নৈতিকতার গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি।

পরিশেষে বলতে চাই,এই সংকট মোকাবিলায় শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সংস্কার এবং কঠোর জবাবদিহি। কারণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় লড়াই প্রযুক্তির নয়—মানসিকতার। রাষ্ট্র যদি সত্যিই নাগরিকের মর্যাদা রক্ষা করতে চায়, তাহলে পাসপোর্ট অফিসকে ঘুষের বাজার নয়, সেবার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। নয়তো জনগণের মনে এক ভয়ংকর বিশ্বাস আরও দৃঢ় হবে যে, বাংলাদেশে টাকা ছাড়া কোনো দরজা খোলে না। সুতরাং পাসপোর্ট অফিসের ঘুষ বাণিজ্য ও দুর্নীতি বন্ধ করতেই হবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin