আজ সোমবার, ২০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৩রা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
আজ সোমবার, ২০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৩রা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

সশস্ত্র বাহিনী : স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী

২১ নভেম্বর। আজ সশস্ত্র বাহিনী দিবস। প্রতি বছর এই দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশের তিন বাহিনী-সেনা,নৌ ও বিমান বাহিনীর সম্মিলিত আত্মত্যাগ এবং দেশপ্রেমের কথা। জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে আজকের বাংলাদেশ পর্যন্ত, প্রতিটি ক্রান্তিকালে সশস্ত্র বাহিনী ‘অতন্দ্র প্রহরী’র ভূমিকা পালন করে চলেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার সময়ে তাদের দৃঢ় ও নিরপেক্ষ ভূমিকা দেশের সাংবিধানিক স্থিতাবস্থা এবং গণতন্ত্রের অভিযাত্রাকে অটুট রাখতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। এই প্রতিবেদনে আজ সশস্ত্র বাহিনীর ঐতিহাসিক ভিত্তি, বহুমুখী অবদান এবং কঠিনতম সময়ে তাদের সাহসিক ভূমিকা নিয়ে আলোকপাত করতে চাই।
১.
বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ইতিহাস কেবল একটি পেশাদার সামরিক কাঠামোর ইতিহাস নয়, এটি জাতির স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসের সমার্থক। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর এবং বাঙালি সামরিক সদস্যদের স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ ও অংশগ্রহণই ছিল সশস্ত্র সংগ্রামের মূল ভিত্তি।
স¦াধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে তারা সামরিক শৃঙ্খলার ঊর্ধ্বে উঠে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সেক্টর কমান্ডার হিসেবে বিভিন্ন রণাঙ্গনে নেতৃত্ব দেন। তাঁদের সামরিক কৌশল, প্রশিক্ষণ এবং চূড়ান্ত আত্মত্যাগের করণেই মাত্র নয় মাসে স্বাধীনতা অর্জনকে সম্ভব করে তোলে। মুক্তিযুদ্ধের এই রক্তস্নাত ভিত্তিই বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীকে পৃথিবীর অন্য যেকোনো সামরিক বাহিনীর চেয়ে এক ভিন্ন মর্যাদা ও দেশপ্রেমের প্রেরণা যুগিয়েছে। সুতরাং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার শপথ তাদের মজ্জাগত, যা জন্মসূত্রেই পাওয়া।

২.
স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্ব শুধু দেশের সীমান্ত রক্ষা বা বহিরাগত শত্রুর মোকাবেলায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। জাতীয় উন্নয়ন, দুর্যোগ মোকাবেলা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেশের সুনাম বৃদ্ধিতে তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
দেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই সংকটকালীন মুহূর্তে, বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য সশস্ত্র বাহিনীই প্রথম সাড়াদানকারী শক্তি হিসেবে মাঠে নামে। দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ, জরুরি চিকিৎসা সহায়তা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুত সচল করতে তারা দক্ষতা ও নিষ্ঠার পরিচয় দেয়। এই ভূমিকা তাদের কেবল সামরিক শক্তি নয়, মানবতার প্রতীক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে।
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সশস্ত্র বাহিনী বিশেষ করে সেনাবাহিনীর প্রকৌশল শাখা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, নদীমাতৃক এলাকায় সড়ক, সেতু ও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো নির্মাণে তাদের কারিগরি দক্ষতা অতুলনীয়। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে তাদের এই অবকাঠামোমূলক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ আজ এক ‘শান্তি মডেল’ হিসেবে পরিচিত। জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যরা সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে বিশ্বের যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। জাতিসংঘের শীর্ষস্থানীয় শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এই আন্তর্জাতিক ভূমিকা একদিকে দেশের সামরিক সক্ষমতার প্রমাণ দেয়। অন্যদিকে বহির্বিশ্বে দেশের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

৩.
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে যে গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট সৃষ্টি হয়েছিল, তা ছিল স্বাধীনতা উত্তর ইতিহাসে দেশের জন্য এক কঠিনতম চ্যালেঞ্জ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, বিভিন্ন স্থানে থানা ও সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা, এবং নৈরাজ্যের পরিস্থিতিতে দেশের সাংবিধানিক কাঠামো হুমকির মুখে পড়েছিল।
এই চরম সংকটকালে সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এক সাহসী ও ঐতিহাসিক ভূমিকা গ্রহণ করেন। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার ভিত্তিতে তিনি দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সামরিক বাহিনীকে মাঠে নামানোর নির্দেশ দেন। এটি কেবল একটি সামরিক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সিদ্ধান্ত। তাঁর এই দৃঢ় নেতৃত্ব এবং নিরপেক্ষ পদক্ষেপের কারণেই রাষ্ট্রীয সংহতি রক্ষা সম্ভব হয়েছিল।
অরাজকতার মুখে যখন বেসামরিক প্রশাসন ভেঙে পডার উপক্রম হয়, তখন সশস্ত্র বাহিনী, বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ে মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনী। তারা দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে, নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের দমন করে এবং জনগণের জীবন ও সম্পদ রক্ষা নিশ্চিত করে। তাদের উপস্থিতি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে ‘ক্যাটালিস্ট’ হিসেবে কাজ করে, যা পরবর্তীতে একটি সাংবিধানিক উত্তরণের পথ প্রশস্ত করে। তারা প্রমাণ করে, দেশের যেকোনো প্েরয়াজনে, বিশেষ করে সংকটকালীন মুহূর্তে, সশস্ত্র বাহিনীই দেশের সর্বশেষ নির্ভরতার প্রতীক।

৪.
আগস্ট পরবর্তী সময়ে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা কেবল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং তারা দেশের গণতন্ত্রের পথে একটি নিরাপদ উত্তরণ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। সেনাবাহিনী কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেছে যে, দেশে সম্পূর্ণ স্থিতাবস্থা না আসা পর্যন্ত এবং আগামী নির্বাচন আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন, সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তারা মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করে যাবেন। নির্বাচনকালীন সময়ে তাদের এই ভূমিকা ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং একটি ভয়-ভীতিমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করবে, যা জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের অন্যতম ভিত্তি। তাদের নিরপেক্ষতা এবং পেশাদারিত্বই আগামী নির্বাচনকে সকল মহলের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে প্রধান সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে।
সংকটকালীন সময়ে সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহল থেকে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। বিশেষ করে কিছু অভ্যন্তরীণ স্বার্থান্বেষী মহল এবং ইউটিউবার বা অনলাইন প¬্যাটফর্ম ব্যবহার করে নানা ধরনের মিথ্যা তথ্য ও প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষতা নিযয় প্রশ্ন তোলা, সামরিক নেতৃত্বকে বিব্রত করা এবং বাহিনী ও জনগণের মধ্যে আস্থার ফাটল ধরানো।
সশস্ত্র বাহিনী অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে এই সকল ‘মিথ্যা প্রচারের ষড়যন্ত্র’ মোকাবেলা করেছে। তারা কোনো প্রকার প্ররোচনায় পা না দিয়ে কেবল সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে মনোযোগী ছিল। তাদের নিরপেক্ষতা ও দেশপ্রেমের কারণে সকল ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে, যা প্রমাণ করে সামরিক বাহিনীর ভিত্তি কতটা মজবুত।

শেষ কথা:
২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবস আমদেও এই বার্তাই দেয় যে, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী কেবল যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত একটি বাহিনী নয়। তারা জাতির প্রতিটি মুহূর্তের সঙ্গী। স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের জন্ম, আর ৫ আগস্টের মতো কঠিন সময়ে তাদের সাহসী ও নিরপেক্ষ ভূমিকা ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও একবার প্রমাণ করেছে। দেশের নিরাপত্তা, উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং গণতন্ত্রের পথে নিরাপদ উত্তরণ প্রতিটি ক্ষেত্রেই সশস্ত্র বাহিনী আপোষহীন অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে কাজ করছে। তাদের এই নিরলস আত্মত্যাগ এবং দেশের প্রতি অবিচল আনুগত্যই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করবে, যেখানে জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব থাকবে চিরন্তন অটুট-অক্ষুন্ন।-লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক,ঢাকা।

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin