যে কোনো মানুষকে যদি প্রশ্ন করা হয়—বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা কী? তাহলে নিঃসন্দেহে দেশের সিংহভাগ মানুষের জবাব হবে যে, দুর্নীতি এবং চাঁদাবাজিই সবচেয়ে বড় সমস্যা। সুতরাং সর্বগ্রাসী জঞ্জাল এই দুর্নীতি-চাঁদাবাজিমুক্ত বাংলাদেশ গড়াই হওয়ার কথা নির্বাচনী প্রচারণার প্রধান অনুষঙ্গ। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, প্রধান কিছু রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা চাঁদাবাজির প্রশ্নে কার্যত নীরবতাকেই বেছে নিয়েছেন, যা মোটেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
প্রধান সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে রাজনৈতিক নেতারা ভোটের মাঠে কার্যত জাদুকরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। জাদুকররা যেমন করে দর্শকদের সামনে মঞ্চ মাতিয়ে রাখেন, শীর্ষ নেতারাও ভোটারদের মাতিয়ে রাখছেন নানা ছলাকলায়। নানা প্রতিশ্রুতি আর স্বপ্নের পসরা সাজিয়ে নেতারা ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ১২ তারিখে ভোটের পর এই নেতারাই সেই জনগণের দিকে ফিরেও তাকাবেন না। নেতার সাক্ষাৎ পেতেও দিতে হবে নজরানা। এটাই আমাদের রাজনীতির বাস্তবতা।
অপ্রিয় হলেও সত্য যে, আমাদের রাজনীতিতে কিছু শব্দ আছে, যেগুলো উচ্চারণ করলেই অস্বস্তি নেমে আসে। চুলকানি শুরু হয়ে যায় সবখানে। ‘মাদক’, ‘দুর্নীতি’, ‘দখল’, ‘সিন্ডিকেট’—এই শব্দগুলোর সঙ্গে আরেকটি শব্দ অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে, তা হলো ‘চাঁদাবাজি’। অথচ এই চাঁদাবাজিই আজ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, ব্যবসা-বাণিজ্য, উন্নয়ন প্রকল্প এমনকি রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার জন্য এক ভয়ংকর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। বিস্ময়ের বিষয় হলো—রাজনৈতিক নেতারা প্রায় সব ইস্যুতে উচ্চকণ্ঠ হলেও চাঁদাবাজির প্রশ্নে অধিকাংশ সময়ই তাদের কণ্ঠ নীরব, চোখ বন্ধ, মুখে তালা।
চাঁদাবাজি আজ আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়; বরং এটি অনেক ক্ষেত্রে এক ধরনের ‘প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা’তে পরিণত হয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা, হাট-বাজার, পরিবহন খাত, নির্মাণ প্রকল্প, শিল্পাঞ্চল—সবখানেই কোনো না কোনো রূপে চাঁদাবাজির অস্তিত্ব দৃশ্যমান। কোথাও এটি ‘লাইন খরচ’, কোথাও ‘ম্যানেজমেন্ট ফি’, আবার কোথাও ‘দলীয় সহযোগিতা’ নামে পরিচিত।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই চাঁদাবাজির বড় অংশই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক পরিচয়ে সংঘটিত হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ের কর্মী থেকে শুরু করে প্রভাবশালী নেতার আশীর্বাদ—এই অদৃশ্য সুরক্ষাবলয়ই চাঁদাবাজিকে দিয়েছে ভয়ংকর শক্তি।
প্রশ্ন হচ্ছে, রাজনীতিবিদরা কেন চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেন না? কারণ অনুসন্ধান করলে কয়েকটি বাস্তব ও অস্বস্তিকর সত্য সামনে আসে।
১. বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়ন এখনো পুরোপুরি স্বচ্ছ নয়। নির্বাচনী প্রচার, সভা-সমাবেশ, পোস্টার-ব্যানার, কর্মী ব্যবস্থাপনা—সবকিছুর জন্যই বিপুল অর্থ প্রয়োজন। এই অর্থের বড় একটি অংশ আসে চাঁদাবাজির মাধ্যমে সংগৃহীত ‘কালো অর্থ’ থেকে। ফলে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান মানে নিজের রাজনৈতিক তহবিলেই কোপ বসানো।
২. স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখতে অনেক সময় দলগুলো এমন ব্যক্তিদের ওপর নির্ভর করে, যারা এলাকায় ‘ক্ষমতাধর’—এবং প্রায়ই এই ক্ষমতার উৎস চাঁদাবাজি, দখল বা ভয়ভীতি। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে দলীয় সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
৩. ‘আমার লোক’ সংস্কৃতি
আইনের চোখে সবাই সমান—এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ রাজনীতিতে খুবই দুর্লভ। ‘আমার লোক হলে কিছুটা ছাড় দেওয়া যায়’—এই মানসিকতাই চাঁদাবাজদের সবচেয়ে বড় ঢাল। ফলে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কথা বললেও, বাস্তবে অনেক রাজনীতিবিদই নীরব সম্মতি দিয়ে যান।
রাজনীতিবিদদের দ্বিচারিতার কারণে চাঁদাবাজির সবচেয়ে বড় মূল্যটা দেয় সাধারণ মানুষ। একজন দোকানদারকে যদি মাসে নির্দিষ্ট অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়, সেই টাকা দোকানদার তার পণ্যের দামের ওপর চাপিয়ে দেয়। পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির বোঝা গিয়ে পড়ে ভাড়ার ওপর। উন্নয়ন প্রকল্পে চাঁদাবাজি মানে কাজের মান কমে যাওয়া, ব্যয় বেড়ে যাওয়া। ফলে চাঁদাবাজি কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; বরং এটি সরাসরি মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং দারিদ্র্যের সঙ্গে যুক্ত।
বাংলাদেশের দণ্ডবিধি ও বিশেষ আইনে চাঁদাবাজি স্পষ্টভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আইনের প্রয়োগ কোথায়? পুলিশ প্রশাসনের একটি অংশ রাজনৈতিক চাপের কাছে অসহায়। আবার কোথাও কোথাও চাঁদাবাজির অর্থেই গড়ে ওঠে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট, যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে বদলি বা শাস্তির ভয় কাজ করে। অন্যদিকে পুলিশের একটি অংশ চাঁদাবাজির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সিভিল প্রশাসনের অনেকেই চাঁদাবাজির ভাগ পেয়ে থাকে। একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ ও রাজনীতিবিদদের বিলাসবহুল জীবনযাপনের পেছনে মূলত রসদ জোগায় এই চাঁদাবাজি।এই পরিস্থিতিতে রাজনীতিবিদদের নীরবতা কার্যত চাঁদাবাজদের জন্য এক ধরনের ‘বৈধ লাইসেন্স’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বের অনেক দেশেই রাজনৈতিক অর্থায়ন ও সংগঠিত অপরাধের মধ্যে সম্পর্ক ছিল। কিন্তু যেসব দেশে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, সেখানে রাজনৈতিক নেতৃত্ব সাহসিকতার সঙ্গে এই সমস্যার মোকাবিলা করেছে। উদাহরণ হিসেবে ইতালির ‘মাফিয়া বিরোধী আন্দোলন’ কিংবা হংকংয়ের দুর্নীতি দমন কমিশনের কথা বলা যায়। এসব জায়গায় রাজনৈতিক সদিচ্ছাই ছিল সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের চালিকাশক্তি। সেখানে প্রশ্ন ওঠেনি—‘আমার লোক কে?’ বরং প্রশ্ন ছিল—‘আইন কে ভাঙছে?’
আমি মনে করি, রাজনীতি শুধু ক্ষমতার খেলা নয়; বরং এটি নৈতিক নেতৃত্বের পরীক্ষাও। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে নীরব থাকা মানে অন্যায়ের পাশে দাঁড়ানো। একজন রাজনীতিবিদ যখন চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কথা বলেন না, তখন তিনি আসলে একটি বার্তা দেন যে, ‘এই ধরনের অপরাধ কোনো ব্যাপার নয়—চালিয়ে যাও।’
এই নীরবতা গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক। কারণ এতে রাষ্ট্র ও রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা প্রচণ্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে সবখানেই দেখা দেয় সীমাহীন অরাজকতা। জাতি হিসেবে আমাদের সামনে এগিয়ে চলার পথে প্রধানতম অন্তরায়হচ্ছে দুর্নীতি-চাঁদাবাজি।অর্থাৎ দুর্নীতি-চাঁদাবাজি যে কোনো বিচারে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় অভিশাপ।
চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াইয়ের জন্য কয়েকটি বিষয় জরুরি বলে আমি মনে করি—
১. রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়ন ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ করতে হবে।
২. দলীয়ভাবে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণ করতে হবে।
৩. অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক চাপমুক্ত করতে হবে।
৫. গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
৬. চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে।
৭. চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজদের সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করতে হবে।
৮. চাঁদাবাজদের আজীবনের জন্য রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করতে হবে।
৯. বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দল চাঁদাবাজদের সদস্য করতে পারবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—রাজনীতিবিদদের নৈতিক সাহস ও সততা। কারণ চাঁদাবাজি কোনো বিমূর্ত শক্তি নয়। এটি কার্যত নীতি-নৈতিকতাহীন ও ভোগবাদী রাজনীতিরই সৃষ্টি, যা দুর্নীতিবাজ চক্র ও রাজনীতিবিদদের দ্বারাই লালিত।
শেষ কথা:
চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে রাজনীতিবিদদের নীরবতা কেবল একটি রাজনৈতিক কৌশল নয়; বরং এটি একটি গভীর নৈতিক ব্যর্থতা। এই নীরবতা যতদিন থাকবে, ততদিন সাধারণ মানুষের ঘাড়ে অন্যায়ের বোঝা চেপে বসবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই।সুতরাং প্রাসঙ্গিকভাবেই এই প্রশ্ন তোলা যায়—আমাদের রাজনীতি কি সত্যিই দেশ ও সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য? নাকি চাঁদাবাজির টাকায় বিলাসী জীবনযাপনের জন্য?
এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যালটের মাধ্যমে।লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com