মানুষ আসে, মানুষ যায়। কিন্তু কিছু মানুষ থেকে যান—নিজের কাজের ভেতর, নিজের সুদৃঢ় অবস্থানের ভেতর। পরম শ্রদ্ধেয় মতিউর রহমান চৌধুরী তেমনই একজন মানুষ। সময় বদলেছে, ক্ষমতা বদলেছে, শাসক বদলেছে। কিন্তু তিনি বদলাননি। বদলাননি তার কলম, তার নীতি, তার সাংবাদিক সত্তা। তাই তিনি কেবল একজন সাংবাদিক নন। আমি মনে করি, তিনি বাংলাদেশের সাংবাদিকতার এক জীবন্ত দলিল। আমাদের জন্য আশির্বাদ।
“সাংবাদিক পরিচয়েই মরতে চাই”—এই একটি বাক্যেই যেন তার দীর্ঘ জীবনের মর্মকথা ফুটে ওঠেছে। বাক্যটি ছোট, কিন্তু এর ভেতরে জমে আছে পাঁচ দশকের লড়াই, অসংখ্য না–বলা কষ্ট, আর আপসহীন সাহসের ইতিহাস।
মতিউর রহমান চৌধুরীর লেখার একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে। সেখানে বাহুল্য নেই। শব্দের জটিলতা নেই। আছে ছোট ছোট বাক্য। কিন্তু প্রতিটি বাক্য পাঠকের বিবেককে স্পর্শ করে। তার লেখায় আবেগ আছে, তবে তা সংযত। উচ্চকণ্ঠ নয়, অথচ দৃঢ়। এই সংযমী দৃঢ়তাই তাকে করে তুলেছে অনন্য-অতুলনীয়।
‘সাংবাদিক পরিচয়েই মরতে চাই’
মঙ্গলবার দুপুরে শিরোনামটি দেখেই বুঝলাম যে এটা মতি ভাইয়ের লেখা। তার লেখার দারুন একজন ভক্ত আমি। তাই দেরি না করে ক্লিক করলাম। যদিও তখন আমি একটি আর্টিকেল লিখছিলাম।
একবার পড়ে থামতে পারিনি। আবার পড়েছি। তৃতীয়বার পড়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। মনে মনে আফসোস করলাম-ইস আমি যদি মতি ভাইয়ের মত সাংবাদিক হতে পারতাম।
আরো মনে হয়েছে—এটি শুধু একটি লেখা নয়। এটি একজন মানুষের জীবনের স্বীকারোক্তি। একজন সাংবাদিকের আত্মকথা। সেখানে অভিযোগ নেই, আত্মহংকার নেই। আছে শুধু নিজের পেশার প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা এবং সত্যের প্রতি অটল-অবিচল আনুগত্য।
এই আনুগত্যই তাকে অনন্য করেছে। আপসহীন করেছে।
আর এই আপসহীনতাই মতিউর রহমান চৌধুরীকে পরিণত করেছে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার এক জীবন্ত দলিলে।
এখানে নিজের কথা না বললেই নয়। কারণ এই লেখার পেছনে আছে ব্যক্তিগত স্মৃতি, ঋণ আর অনুপ্রেরণা। মানবজমিন পত্রিকা দিয়েই আমার সাংবাদিকতার হাতে খড়ি। তখন আমি কলেজপড়ুয়া ছাত্র। ১৯৯৮ সালে মানবজমিন প্রকাশের পরপরই কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদীর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ শুরু করি। জেলা প্রতিনিধি ছিলেন শ্রদ্ধেয় মু. আ. লতিফ ভাই। তিনি আমাকে স্নেহ করতেন।
দেশের প্রথম ট্যাবলয়েড দৈনিক হিসেবে মানবজমিন তখন পাঠকের কাছে দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। আমি কটিয়াদীর নানা সমস্যা নিয়ে রিপোর্ট করেছি। মাদক ব্যবসা, উপজেলা প্রশাসনের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে লিখেছি। রাজনৈতিক রিপোর্টের কারণে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—দুই পক্ষেরই অনেকেই আমার ওপর বিরক্ত ছিলেন।
এক সময় মাদক নিয়ে না লিখতে মাসে দেড় হাজার টাকার মাসোহারা অফার পেয়েছিলাম। আজকের দিনে সেটি সামান্য মনে হলেও তখন তা ছিল বড় প্রলোভন। কিন্তু নীতির সঙ্গে আপস করিনি। এর ফলও পেয়েছি—লাঞ্ছনা, হুমকি, এমনকি হামলার শিকারও হয়েছি। তবুও থামিনি।
আজও কটিয়াদীর অনেক মানুষ বলেন—সেই সময় একজন তরুণ সংবাদকর্মী হিসেবে আমি সততার সঙ্গে সাহসী ভূমিকা রেখেছিলাম। এটুকুই আমার জীবনের বড় প্রাপ্তি। তবে সত্য বলতে কী, একজন সংবাদকর্মী হিসেবে যা কিছু সামান্য অর্জন করেছি, তার পেছনে অনুপ্রেরণার বড় উৎস ছিলেন মতিউর রহমান চৌধুরী।
একটি ঘটনা এখানে বলতেই হয়। একদিন হঠাৎ করেই মতি ভাই আমাকে একটি রিপোর্ট নিয়ে ফোন করলেন। আমি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিলাম, আবার ভেতরে ভেতরে রোমাঞ্চিতও হয়েছিলাম। কারণ তখন তিনি ভয়েস অব আমেরিকার বাংলাদেশ প্রতিনিধি। রেডিওতে নিয়মিত তার কণ্ঠ শুনতাম।
সাধারণত প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন মফস্বল সম্পাদক। তাই সরাসরি মতি ভাইয়ের ফোন পাওয়ার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না।
কটিয়াদীতে কোরআন অবমাননার একটি ঘটনায় পাঠানো রিপোর্টটি তার মনঃপূত হয়নি। তিনি প্রশ্ন করলেন, যুক্তি দিলেন, সংশোধনের কথা বললেন। সেদিনই আমি বুঝেছিলাম—তিনি কতটা পেশাদার, কতটা পরিশ্রমী একজন সম্পাদক।
পেশাগত মানের প্রশ্নে তিনি কাউকে একচুলও ছাড় দেন না।
কিন্তু এই কঠোরতার আড়ালে তিনি এক ভীষণ মানবিক মানুষ। তিনি কখনো কাউকে অসম্মান করেননি। সৌজন্য, শালীনতা ও সরলতা তার চরিত্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
মতিউর রহমান চৌধুরী বহুবার লিখেছেন—তার সাংবাদিক হওয়ার কথা ছিল না। কথা ছিল বিলেত প্রবাসী হওয়ার। পুরো পরিবারই প্রবাসী ছিল। বাবাও ছিলেন প্রবাসী। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি বেছে নেন সাংবাদিকতাকে। কিছু পাওয়ার জন্য নয়, দেশকে দেওয়ার জন্য।
১৯৭১ সালেই তার মৃত্যুর কথা ছিল। সাত বন্ধু মিলে রাস্তায় ব্যারিকেড দিতে গিয়ে ২৬ মার্চ ভোরে পাকবাহিনীর হাতে বন্দি হন। চার বন্ধু ব্রাশফায়ারে নিহত হন। তার বাড়িতেও তখন কুলখানি হয়ে গেছে। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে তিনি আজীবন আপসহীন থেকেছেন।
তিনি নিজেই লিখেছেন—বন্ধুরা তাকে জিজ্ঞেস করত, “তোর জন্ম কি শুধু বিরোধিতা করার জন্য?”
তিনি উত্তর দিতেন—“ভালো যা, তা বলি। খারাপের সমালোচনা করলেই শাসকেরা চটে যায়।”
বঙ্গবন্ধুর আমলে চাকরি হারিয়েছেন। গেজেটেড সরকারি চাকরিতে যোগ দেননি। এরশাদ সরকারের আমলে লেখার কারণে একাধিক মামলার আসামি হয়েছেন। পত্রিকা নিষিদ্ধ হয়েছে। তার নামে হুলিয়া জারি হয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ি তুলে নিয়ে ব্রিজ থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
কলকাতায় ডেপুটি হাইকমিশনে প্রেস মিনিস্টারের দায়িত্বের প্রস্তাব বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছেন। নিজের জায়গায় অন্য সাংবাদিকের নাম প্রস্তাব করেছেন। এতে বন্ধুও হারিয়েছেন। কিন্তু নৈতিক অবস্থান হারাননি।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত হয়েছেন। আট মাস দেশে ফিরতে পারেননি। ছাত্র অভ্যুত্থানের আগে ২ আগস্ট দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। অথচ বন্ধু ও আত্মীয়দের কেউ কেউ তখন সরকারের উচ্চপদে ছিলেন।
জিয়া পরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক বরাবরই ভালো। কিন্তু এই সম্পর্ক কখনো দেনা-পাওনার হয়নি। তিনি কিছু চাননি। তারাও তাকে কিছু দিতে পারেননি।
তারেক রহমানের সঙ্গে তার সম্পর্ক স্বচ্ছ ও নির্ভেজাল। আলোচনা করেন। সমালোচনা করেন। কিন্তু নিজের পত্রিকা চালানোর কষ্টের কথা বলেন না।
তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন—বাংলাদেশে তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজন নেই। পৃথিবীর অধিকাংশ গণতান্ত্রিক দেশে এমন মন্ত্রণালয় নেই। এই মন্ত্রণালয় অনুগত সাংবাদিক বাহিনী তৈরি করেছে। যার মূল্য আজ অনেকেই দিচ্ছেন—কেউ জেলে, কেউ পলাতক, কেউ নিঃস্ব।
তিনি বিশ্বাস করেন, একটি স্বাধীন মিডিয়া রেগুলেটরি কমিশনই পারে গণমাধ্যমের ভারসাম্য রক্ষা করতে। মতি ভাইয়ের এই ধারণার সঙ্গে আমি সম্পূর্ণরূপে একমত।
উগ্রবাদ নিয়ে কথা বলায় তিনি আক্রমণের শিকার হয়েছেন। জামায়াতের নাম না নিয়েও সমালোচিত হয়েছেন। তবুও বলেছেন—উগ্রবাদ কারও বন্ধু নয়। ইতিহাস তার প্রমাণ। আফগানিস্তান তার উদাহরণ।
ভিন্নমত দমন করা গণতন্ত্র নয়। সাংবাদিকতার কাজই প্রশ্ন করা। বিবেককে নাড়া দেওয়া। আমাদের মতি ভাই পুরোটা সময় এই মহান কর্তব্যটিই পালন করছেন পরম মমতায়।
পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি এই পেশায়। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার ঘোষণা খুবই স্পষ্ট, খুবই দৃঢ়—
“৫৪ বছর আগে এসেছিলাম সাংবাদিকতা করতে।
জীবনের শেষে এসে বলছি—
সাংবাদিক পরিচয়েই মরতে চাই।
অন্য কোনো পরিচয়ে নয়।”
শেষ কথা:
আমার গভীর বিশ্বাস, মতিউর রহমান চৌধুরী শুধু সাংবাদিক সমাজের জন্য নন বরং তিনি পুরো বাংলাদেশের জন্য এক অনুকরণীয় নাম। তিনি একটি চলমান বিবেক। আপস না করা এক সাহসী অবস্থান। সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্যের পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়া এক জীবন্ত দলিল। তাঁর কলম আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে,বিবেক এখনো মরে যায়নি। সত্য এখনো পরাজিত হয়নি। এমন মানুষ একটি জাতির জন্য কেবল গর্ব নয় বরং আশীর্বাদ। ইতিহাসের ধারায় কালে ভদ্রে এমন মানুষের আবির্ভাব ঘটে, যাঁরা নীরবে একটি জাতির নৈতিক মানচিত্র আঁকেন। তাই পরম করুণাময়ের দরবারে বিনীত প্রার্থনা—হে আল্লাহ সোবহানা তা’আলা দেশ ও জাতির কল্যাণে আমাদের প্রিয় মতি ভাইকে দীর্ঘ, সুস্থ ও সম্মানিত হায়াত নসিব করুন।