আজ রবিবার, ২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১৯শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি
আজ রবিবার, ২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১৯শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

বিশ্বকাপ সম্প্রচার: সরকারের লুটপাট ও সাশ্রয়ের গল্প

ইতিহাস কখনো কখনো একটি সংখ্যা দিয়েই একটি যুগের চরিত্র উন্মোচন করে দেয়। বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিশ্বকাপ ফুটবল সম্প্রচারস্বত্ব কেনার দুটি ঘটনা ঠিক তেমনই একটি আয়না, যেখানে আমরা দেখতে পাই দুই সরকারের দুই বিপরীত দর্শন, দুই ধরনের রাষ্ট্র পরিচালনা এবং জনগণের অর্থের প্রতি দুই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি।

একদিকে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ। ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ সরকার, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অন্যদিকে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ। ক্ষমতায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সময়ের ব্যবধান মাত্র চার বছর। কিন্তু এই চার বছরে পৃথিবী বদলে গেছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক

মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, সরবরাহ শৃঙ্খলের বিপর্যয়—সবকিছুর কারণে চাল, ডাল, তেল, লবণ থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়েছে। এমন বাস্তবতায় সাধারণ অর্থনীতির নিয়ম বলছে, ২০২৬ সালে বিশ্বকাপ সম্প্রচারস্বত্বের দাম ২০২২ সালের চেয়ে বেশি হওয়ার কথা।

কিন্তু বাংলাদেশে ঘটেছে উল্টো ঘটনা।
২০২২ সালে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিশ্বকাপ সম্প্রচারস্বত্ব কিনতে ব্যয় করা হয়েছিল ৯৮ কোটি টাকা। আর ২০২৬ সালে সেই স্বত্ব কেনা হয়েছে ভ্যাট-ট্যাক্সসহ প্রায় ৬৩ কোটি টাকায়।
প্রশ্ন হলো, চার বছরে পৃথিবীর সবকিছুর দাম যখন বেড়েছে, তখন বিশ্বকাপ সম্প্রচারস্বত্বের দাম কমল কীভাবে?
বিষয়টি যতটা অর্থনীতির, তার চেয়েও বেশি রাজনৈতিক।

কারণ এখানে শুধু ৩৫ কোটি টাকার পার্থক্য নয়; এখানে আছে রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিকতার পার্থক্য। এখানে আছে জনগণের টাকার প্রতি দায়বদ্ধতা ও উদাসীনতার পার্থক্য। এখানে আছে সাশ্রয়ী প্রশাসন এবং পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক অর্থনীতির পার্থক্য।

২০২২ সালের ঘটনা স্মরণ করলে প্রশ্নগুলো আরও বড় হয়ে ওঠে। তখন বাংলাদেশ টেলিভিশন সরাসরি ফিফার কাছ থেকে সম্প্রচারস্বত্ব কেনেনি। ফিফা থেকে শুরু করে একাধিক বিদেশি কোম্পানির হাত ঘুরে সেটি এসে পৌঁছায় একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের কাছে। এরপর রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম অর্থাৎ বিটিভি সেই নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কিনে নেয় বিশ্বকাপ সম্প্রচারের অধিকার।

প্রশ্ন হচ্ছে,একটি নির্মাণ কোম্পানি কীভাবে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সম্প্রচারস্বত্ব ব্যবসার মধ্যস্থতাকারী হয়ে উঠল—এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর আজও জাতি পায়নি।

জাতি বরং দেখেছে, আওয়ামী লীগ আমলে ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আতাউর রহমানের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কন্সট্রাকশন জনগণের কোটি কোটি টাকা নিয়ে গেছে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রের অর্থ যেন জনগণের সম্পদ নয়, বরং ক্ষমতাসীনদের অনুগ্রহ বণ্টনের একটি যন্ত্রে পরিণত হয়েছিল।

এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ গত দেড় দশকে বাংলাদেশে এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে যেখানে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের অস্বাভাবিকতা জনমনে প্রশ্ন তুলেছে। একটি সেতুর ব্যয় কয়েকগুণ বেড়েছে, একটি সড়কের খরচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডকে ছাড়িয়ে গেছে, ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা উধাও হয়েছে, খেলাপি ঋণ পাহাড়সম আকার ধারণ করেছে, বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে।
ফলে বিশ্বকাপ সম্প্রচারস্বত্বের এই ৯৮ কোটি টাকার ঘটনা অনেকের কাছে একটি বৃহত্তর বাস্তবতার ক্ষুদ্র প্রতীক মাত্র।

আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থকেরা বলতে পারেন, সেই সময়ের বাজার পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি সরাসরি ফিফার সঙ্গে আলোচনা করে অনেক কম খরচে স্বত্ব কেনা সম্ভব হয়ে থাকে, তাহলে ২০২২ সালে সেই পথ অনুসরণ করা হয়নি কেন?

কেন জনগণের অর্থ ব্যয় করে একের পর এক মধ্যস্বত্বভোগীর মুনাফা নিশ্চিত করা হয়েছিল? কেন প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল? কেন এমন একটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা দেখা গিয়েছিল?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আসলে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, দুর্নীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ হলো সেই দুর্নীতি, যা আইনের কাগজে বৈধতার পোশাক পরে। যেখানে কাগজপত্র ঠিক থাকে, অনুমোদন থাকে, মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত থাকে—কিন্তু জনগণের স্বার্থ থাকে না।

বাংলাদেশের বহু নাগরিকের কাছে আওয়ামী লীগ আমলের বহু সিদ্ধান্ত ঠিক এমনই মনে হয়েছে।
তারা দেখেছেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে দলীয় আনুগত্যের কাঠামোয় পরিণত হয়েছে। জবাবদিহির জায়গা সংকুচিত হয়েছে। সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হয়েছে। আর সেই পরিবেশে জনগণের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ক্রমশ দুর্লভ হয়ে উঠেছে।

একটি জাতি তখনই বিপদে পড়ে, যখন লুটপাট ব্যতিক্রম না হয়ে সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। যখন একটি প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয় সংবাদ হয় না, বরং স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়।
যখন জনগণ ধরে নেয় যে সরকারি অর্থ মানেই অপচয় হবে। যখন রাষ্ট্রীয় সম্পদকে জনগণের আমানত নয়, ক্ষমতার পুরস্কার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বাংলাদেশ দুর্ভাগ্যজনকভাবে দীর্ঘ সময় এমন এক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে। বিশ্বকাপ সম্প্রচারস্বত্বের ঘটনাটি সেই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে কোনো জটিল অর্থনৈতিক তত্ত্ব নেই। এখানে সাধারণ মানুষও সহজে হিসাব মেলাতে পারে। একই দেশ।
একই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন। একই ধরনের টুর্নামেন্ট। চার বছরের ব্যবধান।
কিন্তু ব্যয় কমে গেছে ৩৫ কোটি টাকা।এই পার্থক্য শুধু অর্থের নয়; এটি তারেক রহমান সরকারের একটি রাজনৈতিক বার্তা।

এটি মনে করিয়ে দেয়, রাষ্ট্রীয় অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব, যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে। মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো সম্ভব, যদি প্রশাসনিক সাহস থাকে। জনগণের টাকার মূল্য দেওয়া সম্ভব, যদি সরকার জনগণকে প্রকৃত মালিক মনে করে।

বাংলাদেশের মানুষ বহু বছর ধরে দুর্নীতি, অর্থপাচার এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ শুনে এসেছে। তারা দেখেছে উন্নয়নের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প। কিন্তু সেই উন্নয়নের সুফল অনেক ক্ষেত্রে তাদের জীবনে পৌঁছায়নি। বরং দ্রব্যমূল্যের চাপ, কর্মসংস্থানের সংকট এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তাদের বাস্তবতাকে আরও কঠিন করেছে।

তাই বিশ্বকাপ সম্প্রচারস্বত্বের এই দুটি সংখ্যা—৯৮ কোটি ও ৬৩ কোটি—আসলে শুধু দুটি অঙ্ক নয়। এগুলো দুই যুগের প্রতীক। একটি অঙ্ক প্রশ্ন তোলে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে। অন্যটি স্মরণ করিয়ে দেয়, সুশাসন চাইলে সাশ্রয় সম্ভব। একটি অঙ্ক জনগণের মনে ক্ষোভ জাগায়। অন্যটি জাগিয়ে তোলে সম্ভাবনার আশা।

পরিশেষে বলতে চাই, বিশ্বকাপের সম্প্রচারস্বত্বের এই গল্প আসলে ফুটবলের গল্প নয়; বরং এটি রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনের গল্প। এটি সেই প্রশ্নের গল্প, জনগণের অর্থ জনগণের কল্যাণে ব্যয় হবে, নাকি ক্ষমতার ছায়ায় গড়ে ওঠা সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর স্বার্থে ব্যবহৃত হবে। ৯৮ কোটি ও ৬৩ কোটি—এই দুটি সংখ্যা আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দুটি ভিন্ন বার্তার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি সংখ্যা অতীতের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলে, অন্যটি দেখায় বিকল্প পথের সম্ভাবনা।

জনগণ আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সচেতন। তারা শুধু উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না, তারা হিসাবও দেখতে চায়। কারণ রাষ্ট্রের কোষাগার কোনো সরকারের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি জনগণের ঘাম, শ্রম ও স্বপ্নের সঞ্চয়। আর সেই সঞ্চয়ের প্রতিটি টাকার হিসাব সরকারকে অবশ্যই দিতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin