আমাদের দীর্ঘদিনের প্রথাগত ও আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনিক সংস্কৃতি থেকে ‘মহামান্য’ এবং ‘মাননীয়’ শব্দের মতো অতিরিক্ত আড়ম্বরপূর্ণ উপাধিগুলো বিলোপ করার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য শুরুতেই আমি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও সাধুবাদ জানাতে চাই। স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তায় সাম্প্রতিক সময়ে যে গভীর ও মৌলিক পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে, এটি তার একটি ইতিবাচক সংকেত। রাষ্ট্রকে ব্যক্তিপূজা, তোষামোদ আর কৃত্রিম আভিজাত্যের ঘেরাটোপ থেকে বের করে এনে প্রতিষ্ঠান, দায়িত্ব ও জনগণের সেবার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার এই প্রয়াস অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
সরকারি দাপ্তরিক নথিপত্র, প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ কিংবা রাষ্ট্রীয় পরিসরে অযথা অপ্রয়োজনীয় ও রাজকীয় সম্মানসূচক শব্দের ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ নিছক কোনো ভাষাগত বা ব্যাকরণগত সংস্কার নয়; বরং এটি মূলত রাষ্ট্রের প্রশাসনিক মানসিক কাঠামো ও প্রাচীন ধ্যানধারণা আমূল বদলে দেওয়ার এক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ বলেই মনে হচ্ছে।
ঠিক এই ঐতিহাসিক প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট থেকেই আমাদের প্রিয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আমার একটি বিনীত কিন্তু অত্যন্ত জরুরি নাগরিক আবেদন—যদি সত্যিই আমরা এ দেশের প্রতিটি সাধারণ মানুষকে রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক এবং সরকারি কর্মকর্তাদের তাঁদের বেতনভোগী সেবক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাই, তবে এবার আমলাতন্ত্রের গভীরে শেকড় গেড়ে বসা ‘স্যার’ সংস্কৃতির বাধ্যতামূলক শৃঙ্খল ভেঙে একটি সুস্পষ্ট পরিপত্র জারি করা হোক।
এই কলামের শিরোনামটি হয়তো প্রথম পাঠে অনেকের কাছে কিছুটা অপ্রচলিত, চমকপ্রদ কিংবা ব্যঞ্জনাময় মনে হতে পারে—প্রধানমন্ত্রী—‘স্যার’-এর বিরুদ্ধে পরিপত্র চাই! তবে বিভ্রান্তির কোনো অবকাশ নেই; এটি ব্যক্তি বা তাঁর পদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ কিংবা অসন্তোষের প্রকাশ নয়। বরং প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী ও সংস্কারমুখী নেতৃত্বের ওপর আস্থা রেখেই একটি শতাব্দী প্রাচীন আমলাতান্ত্রিক ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্বের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক আদেশ চাওয়ার আকুল আবেদন।
বিষয়টিকে আইন ও সংবিধানের আলোকেও গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের সংবিধান কিংবা দেশের প্রচলিত কোনো আইনি বিধানেই কোথাও বলা হয়নি যে, একজন স্বাধীন দেশের সাধারণ নাগরিককে সরকারি অফিসে গিয়ে কোনো কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলকভাবে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করতে হবে। উল্টো আমাদের মহান সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের ভূমিকা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, “Every person in the service of the Republic has a duty to strive at all times to serve the people.” অর্থাৎ প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত প্রতিটি ব্যক্তির সর্বোচ্চ ও সর্বাত্মক সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো জনগণকে আন্তরিকভাবে সেবা দেওয়া।
সুতরাং এখানে প্রশ্ন হচ্ছে,একজন করদাতা সাধারণ নাগরিক যখন কোনো সরকারি দপ্তরে যান, তখন তিনি কি তাঁর সংবিধান স্বীকৃত সেবা ও অধিকার আদায় করতে যাচ্ছেন, নাকি কোনো প্রভুর দরবারে হাত জোড় করে প্রজা হিসেবে করুণা ভিক্ষা করতে হাজির হচ্ছেন? তিনি যদি সেবা চাইতে যান, তবে একজন স্বাধীন দেশের মালিক হিসেবে তাঁর আত্মসম্মান ও নাগরিক মর্যাদা পূর্ণাঙ্গভাবে অক্ষুণ্ণ থাকা অপরিহার্য। একজন সরকারি কর্মকর্তা তাঁর মেধা, অভিজ্ঞতা ও পদমর্যাদায় বড় হতে পারেন, প্রশাসনিক ফাইল সই করার ক্ষমতা রাখতে পারেন; কিন্তু সেই ক্ষমতা সাধারণ মানুষের ওপর ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার হাতিয়ার নয়। সেটি কেবলই রাষ্ট্রের অর্পিত দাপ্তরিক দায়িত্ব।
আমাদের সাধারণ সামাজিক জীবনে ‘স্যার’ শব্দটি প্রায়শই সৌজন্য ও স্বাভাবিক শিষ্টাচারের প্রকাশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কোনো নাগরিক যদি স্বেচ্ছায়, শ্রদ্ধাবোধ থেকে বা হৃদয়ের টানে কোনো কর্মকর্তাকে ‘স্যার’ বলেন, তাতে প্রাতিষ্ঠানিক বা মানসিকভাবে বিন্দুমাত্র আপত্তির কিছু নেই। সংকট ও ক্ষোভের জন্ম মূলত তখনই হয়, যখন এই ‘স্যার’ শব্দটি কোনো কর্মকর্তার টেবিল ও কামরায় তাঁর কাছে আনুগত্য প্রমাণের এক অলিখিত ও বাধ্যতামূলক পরীক্ষায় রূপ নেয়। একজন প্রান্তিক নাগরিক ‘স্যার’ না বলে সহজ ভাষায় কথা বললে যখন কর্মকর্তা ক্ষুব্ধ হন, ভ্রু কুঁচকে তাকান, কথা শুনতে অনাগ্রহ দেখান, ফাইল আটকে রাখেন, কাজের গতি কমিয়ে দেন কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে সাধারণ মানুষকে প্রকাশ্যে অপদস্থ করেন—তখন বিষয়টি আর সামাজিক সৌজন্যের সীমানায় থাকে না। তখন তা পরিণত হয় আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতার নগ্ন অপব্যবহার এবং প্রজা-শাসক মনস্তত্ত্বের বহিঃপ্রকাশে। যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ‘ইউএনও সাহেব’, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ‘ওসি সাহেব’, জেলা পুলিশ সুপারকে ‘এসপি সাহেব’ কিংবা কোনো মন্ত্রণালয়ের সচিবকে ‘সচিব সাহেব’ বলে স্বাভাবিক সম্ভাষণ করা হলে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা কিংবা পদের গুরুত্ব বিন্দুমাত্র কমে যায় না। বরং এতে রাষ্ট্রের মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক চরিত্র আরও অনেক উঁচুতে উঠে যায়। কারণ তখন কর্মকর্তার আসল পরিচয় গড়ে ওঠে তাঁর কাজের দক্ষতা, বিনয় ও অর্পিত দায়িত্ব পালনে—ব্যক্তিগত অহংকার বা কৃত্রিম প্রভুত্বের অনুভূতিতে নয়।
আমরা ১৯৭১ সালে লাখো শহীদের রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জন করেছি। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, স্বাধীনতার এতগুলো দশক পার হয়ে গেলেও আমাদের প্রশাসনিক কাঠামো, আমলাতান্ত্রিক মানসিক আচরণ, দাপ্তরিক ভাষা ও ক্ষমতার সংস্কৃতিতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের দীর্ঘ কালো ছায়া আজও তাড়া করে বেড়ায়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে রাষ্ট্রযন্ত্রের মূল দর্শনই ছিল শাসক ও শাসিতের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব বজায় রাখা, যেখানে আমলারা ছিলেন শাসক শক্তির পরাক্রমশালী প্রতিনিধি আর জনগণ ছিল কেবলই শাসিত প্রজা। স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রের দর্শন পুরোপুরি বদলে গিয়ে ঘোষণা করা হলো—জনগণই রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক। কিন্তু প্রশাসনিক দপ্তরের দৈনন্দিন আচরণের বহু জায়গায় আজও যেন সেই পুরোনো ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্বের প্রেতাত্মা রয়ে গেছে।
আজও বাংলাদেশের হাজার হাজার সাধারণ মানুষ—কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ চাকরিজীবী—সরকারি অফিসে ঢোকার আগে এক অজানা আতঙ্ক ও ইতস্তত বোধ করেন। কর্মকর্তা রাগ করবেন কি না, কীভাবে কথা বলতে হবে, কীভাবে দাঁড়াতে হবে, হাত কোথায় রাখতে হবে, আর ভুল করে ‘স্যার’ না বললে ফাইলটি হিমাগারে চলে যাবে কি না—এসব দুশ্চিন্তায় সাধারণ মানুষ তটস্থ থাকেন। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তা নাগরিকের মূল সমস্যা সমাধানের চেয়ে নাগরিক তাঁকে কীভাবে সম্ভাষণ করলেন, তা নিয়ে বেশি ব্যতিব্যস্ত ও সোচ্চার হয়ে ওঠেন। এটি কোনো স্বাধীন, প্রগতিশীল ও আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর চিত্র হতে পারে না।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্য প্রতিবেশী দেশগুলোতেও ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের কিছু ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার রয়ে গেছে। ভারতীয় দাপ্তরিক ব্যবস্থায় ‘Sir’, ‘Madam’, ‘Shri’ কিংবা সরকারি চিঠিপত্রে ‘Dear Sir/Madam’ লেখার প্রথা রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক প্রশাসনিক নীতি ও আধুনিক প্রোটোকলের দিকে তাকালে দেখা যায়—চিঠিপত্রের আনুষ্ঠানিক ভাষা আর একজন সাধারণ নাগরিককে সেবা দেওয়ার মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি এক জিনিস নয়। দাপ্তরিক নথির কোণে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘Sir’ লেখা হতে পারে, কিন্তু টেবিলের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা রক্তমাংসের একজন মানুষের প্রাপ্ত সেবা ও মর্যাদা কখনোই নির্ভর করতে পারে না তিনি কর্মকর্তাকে ‘স্যার’ বললেন কি বললেন না তার ওপর। এই সূক্ষ্ম অথচ পরম সত্যটি বাংলাদেশকে আজ উপলব্ধি করতেই হবে।
বিশ্বের উন্নত ও প্রগতিশীল পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা আরও স্পষ্ট ধারণা পাই। সেখানে প্রোটোকলের চেয়ে পদ, দায়িত্ব ও প্রতিষ্ঠানের সম্মানকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, কোনো ব্যক্তিকে ব্যক্তিগতভাবে ভগবান বা প্রভু বানানো হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্বোধনের রীতিতে উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পদবি (যেমন: ‘Mr./Madam Secretary’, ‘Governor’, ‘Senator’) ব্যবহারের রীতি রয়েছে এবং অন্যান্য স্তরে নাম ও পারিবারিক পদবি ব্যবহারের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়। অস্ট্রেলিয়ার সরকারি স্টাইল ম্যানুয়াল ও প্রোটোকলেও পদবি ও নামের যথাযথ ব্যবহারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে; আনুষ্ঠানিক চিঠিপত্রে মন্ত্রীকে ‘Dear Minister’ এবং বিভিন্ন পদাধিকারীকে তাঁদের যথাযথ পদবি দিয়ে সম্বোধনের নির্দেশনা রয়েছে। সেখানে প্রতিটি সরকারি চাকরিজীবীকে ঢালাওভাবে ‘Sir’ বলা নাগরিকের পরম কর্তব্য—এমন প্রজা-সুলভ ধারণার কোনো স্থান নেই। আন্তর্জাতিক এই অভিজ্ঞতার শিক্ষা খুবই পরিষ্কার: রাষ্ট্র সম্মান জানাবে কাজ ও পদকে, নাগরিক শ্রদ্ধা করবে প্রতিষ্ঠানকে, কিন্তু কোনো কর্মকর্তা ব্যক্তিগত প্রভুত্বের অহংকারে নিমজ্জিত হতে পারবেন না।
অতএব, আমাদের মূল বক্তব্য এটি নয় যে ‘স্যার’ শব্দটিকে সমাজ বা অভিধান থেকে রাতারাতি নিষিদ্ধ বা বাজেয়াপ্ত করতে হবে; বরং মূল দাবি হলো—সরকারি দপ্তরে সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে ‘স্যার’ শব্দকে বাধ্যতামূলক করার মানসিকতাকে প্রশাসনিকভাবে রুদ্ধ করতে হবে। এটি অনেক বেশি যুক্তিসংগত, বাস্তবসম্মত ও গণতান্ত্রিক। কোনো সাধারণ মানুষ যদি স্বেচ্ছায় বা শ্রদ্ধাবোধ থেকে বলেন, ‘স্যার, আমার আবেদনটি একটু বিবেচনা করবেন?’—তাতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু কেউ যদি নাগরিকের অধিকার নিয়ে বলেন, ‘ইউএনও সাহেব, আমার জমির মিউটেশনের ফাইলটি দেখবেন?’ কিংবা ‘ওসি সাহেব, আমার জিডিটি গ্রহণ করুন’—তাতে কর্মকর্তার অহমে আঘাত লাগার বা অসন্তুষ্ট হওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না। এতে কর্মকর্তার পদের সম্মান ক্ষুণ্ন হওয়া তো দূরের কথা, বরং প্রাতিষ্ঠানিক পদের প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশের বিদ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ব্যাধি হলো কর্মকর্তার প্রতি সাধারণ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ভয়। আমাদের মনে রাখা উচিত, কর্মকর্তাকে ভয় পাওয়া আর কর্মকর্তাকে অন্তর থেকে সম্মান করা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। সম্মান আসে কর্মকর্তার দায়িত্বশীলতা, বিনয় ও সেবা দেওয়ার মানসিকতা থেকে; আর ভয় জন্ম নেয় ক্ষমতার চরম অসমতা ও হয়রানির আশঙ্কা থেকে। একজন নাগরিক যদি মনে করেন যে ভুলবশত ‘স্যার’ না বললে তাঁর কাজের ফাইল আটকে যাবে, তবে তা একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক সংকেত। কারণ তখন সরকারি দপ্তরটি সেবাকেন্দ্র না হয়ে ক্ষমতার শোষক দুর্গে পরিণত হয়। দীর্ঘ প্রায় তিন দশকের সাংবাদিকতা জীবনের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় আমি প্রত্যক্ষ করেছি—আমাদের সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তাঁরা সরকারি অফিসে গিয়ে নিজেদের সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী হতে পারেন না। তাঁরা ধরে নেন, কর্মকর্তা সদয় হলে কাজ হবে, আর অখুশি হলে ভাগ্য অন্ধকার। এই পরবশতার মানসিকতা ও ভয়ের সংস্কৃতি এখনই উপড়ে ফেলতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী চাইলে খুব সহজ ও স্পষ্ট একটি প্রশাসনিক পরিপত্র বা প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে দীর্ঘদিনের এই চিত্র নিমেষেই বদলে দিতে পারেন। সেই নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে বলা যেতে পারে—কোনো সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, চিকিৎসক কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি সেবাগ্রহীতা নাগরিকের কাছ থেকে নির্দিষ্ট কোনো সম্মানসূচক শব্দ (যেমন ‘স্যার’) দাবি করতে পারবেন না। নাগরিকগণ কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে তাঁর পদবি, নাম, পেশাগত পরিচয় বা প্রচলিত ভদ্র সম্বোধনে (যেমন: ইউএনও সাহেব, ওসি সাহেব, এসপি সাহেব, সচিব সাহেব, ডাক্তার সাহেব, এমপি সাহেব, মন্ত্রী সাহেব,পরিচালক সাহেব, অধ্যক্ষ মহোদয়) নির্দ্বিধায় ডাকতে পারবেন। আর কোনো নাগরিক যদি স্বেচ্ছায় ‘স্যার’ বলেন, তবে তা তাঁর ব্যক্তিগত সৌজন্য হিসেবে গণ্য হবে, কিন্তু তা কখনোই সেবা পাওয়ার পূর্বশর্ত বা বাধ্যতামূলক আনুগত্যের মাপকাঠি হবে না।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস,এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন কেবল সাধারণ নাগরিকের আত্মসম্মান রক্ষা করবে তা নয়; বরং এটি আমাদের সরকারি কর্মকর্তাদের জন্যও এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক মুক্তি এনে দেবে। একজন কর্মকর্তা প্রতিদিন সকালে দপ্তরে বসে যদি ভাবেন—আমি ‘স্যার’, আর আমার সামনে দাঁড়ানো মানুষগুলো আমার অধীনস্থ প্রজা—তবে অজান্তেই তাঁর ভেতরে ক্ষমতার অহংকার ও মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়। পক্ষান্তরে, তিনি যদি প্রতিদিন অনুধাবন করেন যে—আমি প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী, জনগণের দেওয়া করের টাকায় আমার সংসার ও বেতন চলে এবং আমার পদটি ক্ষমতার নয় বরং পরম দায়িত্বের—তবে তাঁর আচরণের কেন্দ্রবিন্দু আমূল বদলে যায়। তখন তিনি নিজেকে জিজ্ঞেস করবেন: ‘আজ আমি কতজন মানুষের জীবনকে একটু সহজ করতে পেরেছি?’
তবে এখানে আমি এটাও বলতে চাই যে,কেবল কাগজ-কলমে পরিপত্র জারি করাই শেষ কথা নয়; এর পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। কোনো কর্মকর্তা যদি কেবল ‘স্যার’ না বলার কারণে কোনো নাগরিকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন, সেবা প্রদানে অনীহা প্রকাশ করেন বা ফাইল আটকে রাখেন, তবে সেই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যেন নাগরিকেরা সহজে অভিযোগ জানাতে পারেন এবং দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়—সেই পথ খোলা রাখতে হবে। দেশের প্রতিটি সরকারি অফিসের নোটিশ বোর্ডে ও প্রবেশমুখে বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকা উচিত—“আপনি যে কোনো শালীন ও প্রচলিত সম্বোধনে কর্মকর্তাকে ডাকতে পারেন। নির্দিষ্ট কোনো শব্দ ব্যবহার না করার কারণে আপনার প্রাপ্য সরকারি সেবা প্রত্যাখ্যান করা যাবে না।” এখানে আমি অত্যন্ত দৃঢ় চিত্তে বলতে পারি যে, সরকারি অফিসের দরজায় লেখা এই একটিমাত্র বাক্য কোটি কোটি সাধারণ মানুষের মনে যে আত্মবিশ্বাস ও স্বস্তি এনে দেবে, তা কোনো বাজেট দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়।
এখানে আমাকে আরেকটি নির্মম সত্য বলতেই হবে যে, বাংলাদেশ এখন একটি নতুন রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং গণতন্ত্রকে কেবল নির্বাচন বা ভোটের দিন দিয়ে পরিমাপ করলে ভুল হবে; গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় প্রতিদিন দেশের হাজার হাজার সরকারি অফিসের বন্ধ দরজায়। একজন প্রান্তিক কৃষক যখন ভূমি অফিসে যান, একজন শ্রমজীবী যখন শ্রম দপ্তরে যান, একজন অসহায় নারী যখন থানায় বিচারপ্রার্থী হন, কিংবা একজন অভিভাবক যখন শিক্ষা অফিসে যান—তখন তাঁরা সরাসরি রাষ্ট্রের মুখোমুখি হন। সেই রাষ্ট্রের মুখটি যদি হয় কড়া, ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও ক্ষমতাদম্ভী, তবে রাষ্ট্রের প্রতি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও আস্থা নষ্ট হয়ে যায়। আর সেই মুখটি যদি হয় সহমর্মী, বিনয়ী, সহানুভূতিশীল ও সেবামুখী—তবে রাষ্ট্র মানুষের পরম আশ্রয় হয়ে ওঠে। সুতরাং, আমাদের আমলাতন্ত্রের মূল ভাবনা হওয়া উচিত নয় ‘আমাকে স্যার বলা হলো কি না’, তা নয় বরং প্রধান চিন্তা হওয়া উচিত ‘আমি জনগণকে হাসিমুখে সেবা দিতে পেরেছি কি না’।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যে ইতিবাচক ও যুগোপযোগী দূরদর্শিতা দেখিয়েছেন, তার পূর্ণতার স্বার্থেই আমি এই ‘স্যার’ সংস্কৃতি অবসানের পরিপত্রের আকুল আবেদন জানাচ্ছি। ‘স্যার’ শব্দটি থাকুক নাগরিকের স্বাধীন সামাজিক সৌজন্যের জায়গায়, কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে তা বাধ্যতামূলক আনুগত্যের জায়গা থেকে চিরতরে উপড়ে ফেলা হোক। পরিপত্রে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হোক যে, সম্মানসূচক শব্দের অজুহাতে কোনো নাগরিককে হয়রানি করা হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মচারীকে কঠোর প্রশাসনিক শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। এটি কোনো কর্মকর্তাকে খাটো বা ছোট করার পদক্ষেপ নয়; বরং এটি তাঁদের পেশাগত দায়িত্বকে পবিত্র ও লোকসেবার সুউচ্চ মর্যাদায় আসীন করার একমাত্র পথ। একজন সরকারি কর্মকর্তার সাফল্যের পরম মাপকাঠি হওয়া উচিত,কত হাজার বার তিনি ‘স্যার’ শুনেছেন তা নয়, বরং তিনি কত মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন এবং কতজন নাগরিকের জীবনকে সহজ করেছেন।
বাংলাদেশকে যদি সত্যিই একটি আধুনিক, নাগরিককেন্দ্রিক, মানবিক ও প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তবে আমাদের প্রশাসনিক ভাষা, প্রতিদিনের আচরণ এবং ক্ষমতার প্রাচীন মনস্তত্ত্ব বদলাতেই হবে। ‘স্যার’ থাকুক মানুষের স্বেচ্ছাধীন সৌজন্যের স্বাধীনতায়, আর রাষ্ট্রীয় দপ্তরে চিরস্থায়ী আসন পাক নাগরিকের পরম মর্যাদা ও অধিকার।
প্রধানমন্ত্রী কাছে আমার বিনীত ও আকুল আহ্বান—অবিলম্বে একটি পরিপত্র জারি করুন। ‘স্যার’ শব্দটিকে সমাজ থেকে নিষিদ্ধ করার জন্য নয়; বরং ‘স্যার’ শব্দকে বাধ্য করার ঔপনিবেশিক ও মানসিক শৃঙ্খলকে চিরতরে নিষিদ্ধ করার জন্য।
তাহলে আর কোনো সরকারি অফিসের সামনে লেখা থাকবে না—“স্যারকে সালাম দিন” কিংবা “ভিতরে আসার আগে অনুমতি নিন”; বরং প্রতিটি সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিজের হৃদয়ের গভীরে সোনার অক্ষরে লিখে রাখবেন—“আমি জনগণের বিনয়ী সেবক।” আর সেটিই হবে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড়, গৌরবোজ্জ্বল ও ঐতিহাসিক বিজয়।
লেখক:সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক,আমার দিন।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com