মুক্তিযুদ্ধ, রোহিঙ্গা আর করোনাকালে প্রফেসর ইউনূসের ভূমিকা নিয়ে লিখছি। নিজের দেখা, ওনার বক্তৃতা এবং কিছু নথিপত্র ঘেঁটে যা পেয়েছি তার চুম্বাকাংশ তুলে ধরছি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় উনি ছিলেন আমেরিকাতে। ৩১ বছর বয়স। টগবগে তরুণ। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন। আমেরিকার জনগণ এবং কংগ্রেসম্যানদের সম্মতি আদায় করতে আমেরিকা প্রবাসী বাঙালিদের অবদানের কথা হয়তো অনেকেই জানেন।
প্রফেসর ইউনূস থাকতেন টেনেসির ন্যাসভিল শহরে। ৭১ এর ২৫শে মার্চের খবর শুনেই সেই শহরের বাঙালিদের একত্র করলেন। তৈরি করলেন বাংলাদেশ সিটিজেন কমিটি। সেক্রেটারি এবং স্পোকসপারসনের দায়িত্ব পালন করলেন। প্রেস রিলিজ লিখে সংবাদপত্র এবং টিভি মিডিয়াদের বিলি করলেন।
দুইদিন পরেই ২৮শে মার্চ টিভির পর্দায় উঠলেন। আমেরিকার জনগণ, স্থানীয় সিনেটরগণ এর কাছে মুক্তিযুদ্ধের বার্তা পৌঁছালো।
নিজেদের দূতাবাস বলতে যা ছিল তা হলো পাকিস্তান দূতাবাস। সেখান থেকে ওনারা কি খবর প্রত্যাশা করতে পারেন?
তবে পাকিস্তান দূতাবাসের সেকেন্ডম্যান ছিলেন একজন বাঙালি। নাম এনায়েত করিম। বাড়ি চট্টগ্রামে। প্রফেসর ইউনূসের দেশি লোক। ছুটে গেলেন ওয়াশিংটন ডিসিতে। ১০০০ কি.মি দূর। বোস্টন, ন্যুয়র্ক এবং অন্যান্য শহর থেকে আরও বাঙালি এসে যোগ দিলেন। ক্যাপিটল হিলের সামনে ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়াতে আপিল করবেন সেটাই উদ্দেশ্য।
প্রফেসর ইউনূসের হাতের লেখা সুন্দর ছিল। কার্টুন আঁকতেন। নিজ থেকেই ফেস্টুন বানিয়ে সবার হাতে ধরিয়ে দিলেন। একটা বিক্ষোভ বিক্ষোভ ভাব এলো। শুধু রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিক্ষোভ করলেই কি আর সবার কানে বার্তা পৌঁছে? বিশেষ করে যাদের জানা সবচেয়ে বেশি দরকার, তাদের জানাতে হবে না?
বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে…।
সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন প্রত্যেকটি দূতাবাসে লিখিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের বার্তা জানাবেন। প্রফেসর ইউনূস এবং সামসুল বারী নামক একজন বাঙালি- এই দুইজন দায়িত্ব নিলেন। ৩০শে মার্চ থেকে প্রত্যেকটি দূতাবাসের দরজায় নক করলেন, স্বাধীনতার ডাক পৌঁছে দিলেন। স্বাধীনতা ঘোষণার মাত্র চারদিনের মধ্যে এতগুলো কাহিনী। এতগুলো অ্যাক্টিভিটি।
সমস্যা দাঁড়ালো আইডেন্টিটি নিয়ে। মানুষ জানতে চাইলো- তোমরা কোন দেশের নাগরিক, কাদের রিপ্রেজেন্ট করছো? বাংলাদেশ তখনো ফর্মাল কোনো দেশ না। ওনারা সমস্যায় পড়লেন।
১৭ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠনের পর নিজেদের বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। সভাপতি ছিলেন এফআর খান আর সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করলেন প্রফেসর ইউনূস। অনেকটা একা একাই ক্যাপিটল হিলের প্রত্যেকটি সিনেটরের কামরা ভিজিট করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের কথা ব্যাখ্যা করেছেন। বাংলাদেশের পক্ষে মৌখিক সম্মতি আদায় করেছেন। পাকিস্তানকে যেন কোনো অস্ত্র সাপ্লাই না দেয়া হয় তার জন্য আপিল করে এসেছেন। ২০১৩ সালে কংগ্রেশনাল মেডেল পুরস্কার নেয়ার সময় প্রফেসর ইউনূসের একটা বক্তৃতা ছিল। সেই বক্তৃতায় ১৯৭১ সালের সেই কাহিনী তুলে ধরেন। সেই বক্তৃতা শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল বলেই এই কাহিনীর সঙ্গে আমার পরিচিতি।
পুরো মুক্তিযুদ্ধ সময়কালীন দেশের খবারাখবর ‘বাংলাদেশ নিউজলেটার’ নামক একটা পত্রিকাতে নিজেরা লিখে আমেরিকায় থাকা বাংলাদেশিদের বিলিয়ে দিতেন। প্রফেসর ইউনূসের নিজের হাতের লেখা পত্রিকা। পত্রিকার কয়েকটি কপি আমাদের জাতীয় যাদুঘরে রাখা আছে। সময় পেলে গিয়ে দেখে আসতে পারেন।
যুদ্ধের সময় দেশে ফেরার কোনো উপায় ছিল না। যুদ্ধ শেষ হবার পর পর ১৯৭২ সালে আমেরিকার ইউনিভার্সিটির চাকরি ইস্তফা দিয়ে দেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে দেশে ফিরলেন।
(২) রোহিঙ্গা–
সমস্যাটা বিশাল। আমরা বাংলাদেশ থেকে সমস্যাটা দেখেছি একভাবে আর আন্তর্জাতিক মহল দেখেছে অন্যভাবে। অনেকেই মিয়ানমারের সাপোর্টে ছিল। ভারত থেকে শুরু করে জাপান। আন্তর্জাতিক মহল জানতো রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে এসে মিয়ানমারে বসতি করেছে। এরা এখানে যতসব জঙ্গি তৎপরতা চালাচ্ছে। যেই দেশের নাগরিক তারা সেই দেশে চলে যাক। কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থা আসল তথ্য তুলে ধরলো।
বাংলাদেশ থেকে দেখা রোহিঙ্গা সমস্যা তুলে ধরার জন্য দু’জন বাংলাদেশি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। একজন হলেন বৃটেনে অবস্থানরত বাংলাদেশি হাইকমিশনার মান্যবর সাঈদা মুনা তাসনিম (বুয়েটের সিনিয়র আপা) আর আমার জানা মতে দ্বিতীয় ব্যক্তিটি হচ্ছেন প্রফেসর ইউনূস।
আলজাজিরার মেহেদি হাসানের একটি প্রোগ্রামের প্রশ্নোত্তর পর্বে জোরালো কণ্ঠে সুন্দর ইংরেজিতে মুনা আপা রোহিঙ্গা সমস্যায় বাংলাদেশ কি করছে, বৃটিশ কি করছে আর সারা বিশ্ব কি করছে তা তুলে ধরেছেন। যা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল।
আর প্রফেসর ইউনূস?
(ক) সরাসরি আপিল করলেন তাদের কাছে যারা এই ধরনের ইস্যু দেখেন। টঘঈঐজ এর কাছে খোলা চিঠি লিখলেন। সই নিলেন ১২ জন নোবেল লরিয়েট থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্ট, ইড়হড় থেকে শুরু করে অনেক মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, খান একাডেমির সালমান, উইকিপিডিয়ার জিমি ওয়েলসদের কাছ থেকে।
এ ধরনের খোলা চিঠিতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো অ্যাকশন তৈরি হয় না তবে যাদের ঘিলুতে নাড়া দেয়ার কথা সেখানে ঠিকই নাড়া দেয়। বিশ্বের এনসাইক্লোপিডিয়াতে রেকর্ড হয়ে যায়। আবেশী প্রেশার তৈরি হয়।
(খ) আলজাজিরার মেহেদি হাসানের কঠিন প্রশ্নে বজ্রকণ্ঠে অং সান সুচির সমালোচনা করেছেন। ইন্টারভিউর একাংশ দিচ্ছি।
মেহেদি-রোহিঙ্গাদের এই সিচুয়েশনে আপনি সুচিকে কতোটুকু দোষ দিবেন?
ইউনূস- ১০০%
মেহেদি- বলেন কি? সে কি আপনার বন্ধু না? একই নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী।
ইউনূস- যখন পুরস্কার পায় তখন ছিল তার এক চেহারা। শান্তিকামী, গণতন্ত্রের লড়াকু সৈনিক। সারা পৃথিবী তাকে সম্মান দেখিয়েছে। আর এখন তার চেহারা ১৮০ ডিগ্রি ভিন্ন। রোহিঙ্গা তাদেরই জনগণ। তার উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো।
মেহেদি- মানুষ বলে, মিলিটারির ভয়ে সে কিছু করতে পারছে না।
ইউনূস- তাহলে তার রিজাইন দেয়া উচিত। একজন লিডার ভয় পাবে কেন? নিজস্ব নীতি থেকে যে সরে আসে সে কীভাবে একজন আদর্শ লিডার হয়?
ইন্টারভিউটা দেখে নিতে পারেন। পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ লোক আলজাজিরা দেখে। ওনার বার্তা পৌঁছেছে আন্তর্জাতিক মহলে।
লেখক: এসোসিয়েট প্রফেসর, কিউশু ইউনিভার্সিটি জাপান। লেখকের ফেসবুক ওয়াল থেকে নেয়া