আইনের শাসন বনাম বেআইনি বলপ্রয়োগের মনস্তত্ত্ব—বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক গভীর সংকটের নাম। এই দুইয়ের দ্বন্দ্ব কেবল আইনি বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, মানবাধিকারের সুরক্ষা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দেয়। সোমবার রাজধানীর চকবাজারে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের দেওয়া একটি বক্তব্য দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক, বিস্ময় ও গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের দায়িত্ব, আইন-সংবিধান অনুযায়ী যখন যেখানে যা প্রয়োগ করা দরকার, সেইটাই আমরা করব। ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাও করে, সেইটা আমরা করব।’
একজন দায়িত্বশীল পুলিশপ্রধানের মুখ থেকে এমন বক্তব্য শোনার পর যেকোনো সচেতন ও বিবেকবান নাগরিকের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বোচ্চ পদে আসীন একজন কর্মকর্তা কীভাবে ক্রসফায়ারের মতো বিতর্কিত বিষয়কে সরকারের অনুমোদনসাপেক্ষ ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন? ক্রসফায়ার কি কোনো দাপ্তরিক আদেশ, প্রশাসনিক অনুমতি কিংবা সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য বৈধ পুলিশি কার্যক্রম? এটি কি কোনো প্রশাসনিক নীতি, যা সরকার অনুমোদন করলেই প্রয়োগ করা যাবে? যেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈর্ব্যক্তিক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বোচ্চ অভিভাবক কীভাবে এমন একটি আইনগতভাবে বিতর্কিত ধারণাকে সরকারি অনুমোদনের কাঠামোর মধ্যে আনার কথা বললেন? প্রকৃতপক্ষে, এমন বিভ্রান্তিকর ও বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে তিনি কার স্বার্থ রক্ষা করলেন?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো,সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের আলোকে ক্রসফায়ার কোনো স্বতন্ত্র বিচারিক প্রক্রিয়া বা শাস্তির বিধান নয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় লাভ ও আইনানুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ৩২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইনানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ ব্যতীত কোনো ব্যক্তিকে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান রয়েছে। সহজ ভাষায়, ক্রসফায়ার বলতে সাধারণত দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির পরিস্থিতিকে বোঝানো হয়। কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অপরাধী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ ঘটতে পারে; আত্মরক্ষার্থে প্রয়োজনীয় ও আইনসম্মত বলপ্রয়োগের প্রশ্নও উঠতে পারে। কিন্তু সেই পরিস্থিতির বৈধতা নির্ধারিত হবে প্রযোজ্য আইন, ঘটনার প্রকৃতি, বলপ্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতার ভিত্তিতে। এটিকে আগে থেকে পরিকল্পিত কিংবা সরকারের অনুমোদনসাপেক্ষ কোনো সরকারি কৌশল হিসেবে উপস্থাপন করা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন সৃষ্টি করে।
আইজিপির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত একজন কর্মকর্তার এই মৌলিক আইনগত পার্থক্য অনুধাবন করতে না পারা কোনো সাধারণ অসতর্কতা হিসেবে উপেক্ষা করার বিষয় নয়। সরকার কীভাবে এমন কোনো ব্যবস্থার অনুমোদন দেবে, যার বৈধতা দেশের সংবিধান, প্রচলিত আইন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে? একটি গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক রাষ্ট্রে সরকার কোনো বেআইনি হত্যাকাণ্ডের দাপ্তরিক অনুমতি দিতে পারে না। সুতরাং আইজিপির বক্তব্য আইনের শাসনের মৌলিক চেতনা সম্পর্কে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তাঁর এই মন্তব্যে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে পতিত ও পলাতক স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের আমলের সেই অন্ধকার অধ্যায়ের স্মৃতি আবারও তাজা হয়ে উঠেছে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা, বিরোধী কণ্ঠ স্তব্ধ করা এবং অপরাধ দমনের নামে ক্রসফায়ারকে যেভাবে একসময় বিতর্কিত ও কুখ্যাত ব্যবস্থায় পরিণত করা হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতা এখনো মানুষের মন থেকে মুছে যায়নি।
তৎকালীন সময়ে বহু বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পর গণমাধ্যমে প্রায় একই ধরনের বয়ান সামনে আসত। বলা হতো, আসামিকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারে কোনো নির্জন স্থানে অভিযানে গেলে ওত পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা পুলিশ বা র্যাবের ওপর গুলি চালায়। আত্মরক্ষার্থে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও পাল্টা গুলি চালায়। একপর্যায়ে আসামি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে দুই পক্ষের গোলাগুলির মধ্যে পড়ে তার মৃত্যু হয়। এই বয়ান এতবার প্রচারিত হয়েছে যে সাধারণ মানুষের স্মৃতিতে তা আজও অম্লান, একই সঙ্গে গভীর অবিশ্বাস ও ক্ষোভের উৎস হয়ে আছে। ক্রসফায়ারের নামে কীভাবে মানুষ হত্যার অভিযোগ উঠেছে, কীভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ সামনে এসেছে, তা দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থার বিভিন্ন প্রতিবেদনেও আলোচিত হয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ও ভয়ের সংস্কৃতি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছিল। আজ যখন দেশ সেই কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের পথে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তখন পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তার কণ্ঠে ক্রসফায়ারের অনুমোদনের কথা শোনা কেবল দুঃখজনক নয়, অত্যন্ত উদ্বেগজনকও বটে।
বর্তমানে দেশে সংবেদনশীল রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও পরিবর্তনশীল বাস্তবতা বিরাজ করছে। নতুন সরকার যখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা এবং আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই আইজিপির এই অনভিপ্রেত বক্তব্য বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলোর হাতে সমালোচনার একটি শক্তিশালী উপাদান তুলে দিয়েছে।
আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির কি স্বেচ্ছায় এই বক্তব্য দিয়েছেন, নাকি এর পেছনে কোনো অদৃশ্য এজেন্ডা কাজ করেছে? জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। এমন বাস্তবতায় পুলিশের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা যখন প্রকাশ্যে সরকারের অনুমোদনে ক্রসফায়ারের কথা বলেন, তখন আন্তর্জাতিক মহলে বর্তমান সরকারের নীতিগত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়। বক্তব্যটি এমন ধারণাও তৈরি করতে পারে যে বর্তমান সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করতে পারে। এর ফলে সরকারকে আন্তর্জাতিক পরিসরে মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো,এই বক্তব্যের মাধ্যমে সরকারবিরোধী পক্ষগুলো তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ফোরামে প্রশ্ন তুলতে পারে, নতুন সরকারও কি অতীতের সেই বিতর্কিত পথেই হাঁটতে যাচ্ছে? পুলিশকে দিয়ে বেআইনি হত্যাকাণ্ড চালানোর কোনো পরিকল্পনা কি রয়েছে? প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বারবার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং সুশাসনভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। সেখানে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা কীভাবে এমন একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য দিয়ে সরকারের প্রশাসনিক সদিচ্ছাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ তৈরি করেন?
প্রকৃতপক্ষে, আইজিপির এই বক্তব্য সরকারের ঘোষিত নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে প্রতীয়মান হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। তিনি যেন রাজনৈতিক বিরোধীদের কোর্টে অনায়াসে বল ঠেলে দিয়েছেন। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই বক্তব্য সরকারের জন্য অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করেছে এবং এর পেছনে কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।
এখানে তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাও স্বীকার করতে হবে। পতিত সরকারের বিদায়ের পর থেকে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে শিথিলতা ও অবক্ষয়ের অভিযোগ উঠেছে। চুরি, ডাকাতি, খুন খারাবি, দখলবাজি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে অপরাধীদের দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করার আকাঙ্ক্ষা থেকে সাধারণ মানুষের একটি অংশ সাময়িকভাবে ক্রসফায়ার কিংবা কঠোরতম ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিতে পারে। বিচারহীনতা ও নিরাপত্তাহীনতার অভিজ্ঞতা থেকে এমন মনোভাব তৈরি হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু রাষ্ট্রের নীতি কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কৌশল কখনো জনআবেগের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হতে পারে না। অপরাধ দমন করতে হলে প্রয়োজন দক্ষ তদন্ত, পেশাগত কৌশল, কার্যকর গোয়েন্দা তৎপরতা, দ্রুত বিচার এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে কিংবা বিশেষ অভিযানের প্রয়োজনে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, তা অবশ্যই পেশাগত ও কৌশলগত দক্ষতা, আইনগত কাঠামো ও বাস্তব পরিস্থিতির ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে হবে। কিন্তু ক্রসফায়ারকে সরকারের অনুমোদনসাপেক্ষ ব্যবস্থা হিসেবে প্রকাশ্যে তুলে ধরা কোনোভাবেই দায়িত্বশীল বক্তব্যের পরিচায়ক নয়। আইজিপি কেন এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়কে এভাবে প্রকাশ্যে গণমাধ্যমের সামনে নিয়ে এলেন? তিনি একদিকে বলেছেন, পুলিশ লাঠিপেটা করলে তাকে ফ্যাসিস্ট পুলিশ বলা হয়, আবার নীরব থাকলে দুর্বল পুলিশ বলা হয়। অন্যদিকে তিনি বলেছেন, তাঁকে কাজ করার পরিবেশ দিতে হবে এবং ক্ষমতায়িত করতে হবে। পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি অবশ্যই যৌক্তিক। কিন্তু ক্ষমতায়ন বলতে কি তিনি বেআইনিভাবে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের স্বাধীনতা বোঝাতে চেয়েছেন? পেশাদারত্ব, প্রজ্ঞা, আধুনিক তদন্তপদ্ধতি ও দক্ষতার মাধ্যমে অপরাধ দমন করাই একটি কার্যকর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়। সরকারের অনুমোদনের প্রসঙ্গ টেনে ক্রসফায়ারের কথা বলা কোনো দায়িত্বশীল পুলিশপ্রধানের কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয়।
আইজিপির এই বক্তব্য বিচারব্যবস্থা ও আইনের শাসনের প্রতিও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। অপরাধের অভিযোগে কাউকে গ্রেপ্তার করে আদালতে উপস্থাপন, তদন্ত এবং বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণের পরিবর্তে যদি তাকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করার ধারণা সামনে আসে, তাহলে দেশের বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হবে। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে আদালত, বিচারক, আইন মন্ত্রণালয় ও বিচারব্যবস্থার যে বিশাল কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে, তার উদ্দেশ্যই তো আইনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। অপরাধ দমনের নামে বিচারপ্রক্রিয়াকে পাশ কাটানোর মানসিকতা প্রতিষ্ঠিত হলে সেই কাঠামোর ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে।
এ ধরনের বক্তব্য সচেতন নাগরিক সমাজ, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়লে আন্তর্জাতিক পরিসরেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের এমন মন্তব্যের ফলে এই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অংশ এখনো অতীতের কর্তৃত্ববাদী মনস্তত্ত্ব ও অগণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি। অন্তত আইজিপির বক্তব্য সেই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে।
আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকিরের এই দায়িত্বজ্ঞানহীন ও ক্ষতিকর বক্তব্যের পর দেশের সচেতন মহল ও সরকারের সামনে দুটি মৌলিক প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছে। যে পুলিশ কর্মকর্তা আইন, সংবিধানের সীমা এবং কৌশলগত দূরদর্শিতা বজায় রেখে বক্তব্য দিতে পারেন না, তিনি কীভাবে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নেতৃত্ব দেবেন? এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন কর্মকর্তাদের দিয়ে কি সত্যিকার অর্থে নতুন বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও টেকসই শান্তি নিশ্চিত করা সম্ভব? সরকারপ্রধান ও নীতিনির্ধারকদের বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। কারণ, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা একজন কর্মকর্তার দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য সরকারের অর্জন, নীতিগত অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাকে মুহূর্তের মধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
পরিশেষে বলতে চাই,আইজিপি নিজের অদক্ষতা আড়াল করতে কিংবা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক মহলকে সুবিধা দিতে এই বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন কি না, সেই প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাঁর বক্তব্য বর্তমান সরকারের জন্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অস্বস্তি তৈরি করেছে। প্রকারান্তরে, এটি সরকারের নিজের পায়ে কুড়াল মারার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। সরকার যদি সত্যিই একটি নৈর্ব্যক্তিক ও সুদৃঢ় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে এ ধরনের অনভিপ্রেত বক্তব্যের বিষয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান নেওয়া জরুরি। পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে নয়, বরং পেশাদারত্ব, মেধা এবং সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের ভিত্তিতে ক্ষমতায়িত করতে হবে—বেআইনি ক্রসফায়ারের অনুমোদনের ধারণা দিয়ে নয়। অন্যথায়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার যে ঐতিহাসিক সুযোগ আজ বাংলাদেশের সামনে এসেছে, তা একজন কর্মকর্তার দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্যের কারণে সৃষ্ট বিতর্কের চাপে হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন এবং সহীহ বুঝ নসিব করুন।
লেখক:সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল:ahabibhme@gmail.com