বাংলাদেশ আজ এক গভীর ও বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি, যার অন্যতম প্রধান উৎস হলো মাদকের নীল বিষ। এই বিষাক্ত থাবা দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানী ঢাকা শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের পাড়া-মহল্লা পর্যন্ত মাদকের বিস্তার এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যে, কেবল ‘মাদকের ভয়াবহতা’ শব্দটি দিয়ে এর গভীরতা পরিমাপ করা অসম্ভব। এটি এখন আর কেবল কোনো একক অপরাধ বা সামাজিক অবক্ষয় নয়, বরং এটি সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার জন্য এক মারাত্মক হুমকি।
সম্প্রতি রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশন-সংলগ্ন দয়াগঞ্জের ঘুণ্টিঘর এলাকায় মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচি চলাকালে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন কর্তৃক লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনাটি দেশের রাজনীতি, আইন ও সামাজিক অঙ্গনে নতুন করে তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে পুলিশের ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) তদন্তের ঘোষণা, অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০১৬ সালের আগ্নেয়াস্ত্র নীতিমালা এবং আইনজ্ঞদের মতামত নিয়ে একটি তীব্র বিতর্ক দৃশ্যমান হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে,এই বিতর্কের পেছনের আসল বাস্তবতাকে আমরা কতটা গভীরভাবে বিচার করছি?
মাদকের মতো ভয়াবহ ও সুসংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে মাঠপর্যায়ের যে অরাজক ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষের বিতর্কের টেবিল থেকে অনুধাবন করা কঠিন। বাংলাদেশে মাদক কারবারি ও মাদকাসক্তরা আজ এতটাই দুঃসাহসী যে মাদকবিরোধী অভিযানের খবর পেলেই তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা স্থানীয় প্রতিরোধকারীদের ওপর পাল্টা আক্রমণ চালায়, গুলি ছোড়ে ও প্রাণঘাতী হামলা চালায়—এটা কোনো বানিয়ে বলা গল্প নয়, এটাই এ দেশের কঠিন বাস্তবতা। গেন্ডারিয়ার মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও জটিল এলাকায়, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে মাদকচক্র তাদের রাজত্ব গড়ে তুলেছে, সেখানে সাধারণ নাগরিক বা কোনো জনপ্রতিনিধি যখন মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, তখন নিরাপত্তাঝুঁকি শতগুণ বেড়ে যায়। উক্ত ঘটনার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন সেখানে কেবল একজন নির্বাহী প্রধান বা মন্ত্রী হিসেবেই যাননি; তিনি ওই এলাকার জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও জনপ্রতিনিধি। মাদক নির্মূলে একজন জনপ্রতিনিধির যেমন সাংবিধানিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে, তেমনি তাঁর এলাকাকে মাদকমুক্ত রাখার নাগরিক দায়িত্বও রয়েছে।
যখন একটি মাদকবিরোধী কর্মসূচিতে গিয়ে সহসা মারমুখী জনতা বা সশস্ত্র মাদক কারবারিদের দ্বারা ঘেরাও হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, তখন আত্মরক্ষার স্বার্থে অস্ত্র প্রদর্শন করা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং বাস্তবসম্মত। প্রতিমন্ত্রীর প্রেরিত ব্যাখ্যায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, উপস্থিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়ে যখন অভিযানের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখন একদল দুর্বৃত্ত গাড়িবহরের দিকে মারমুখী ভঙ্গিতে এগিয়ে আসে। সেই জরুরি নিরাপত্তাঝুঁকির মুহূর্তে জনতা ও নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে অস্ত্র পুনরায় স্থানান্তরিত করা হয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, গেন্ডারিয়ার মতো স্পর্শকাতর এলাকায় অভিযান চালিয়ে যেখানে ছয়জন মাদক অপরাধীকে আটক করা হলো, বিপুল পরিমাণ মাদক ও দেশীয় অস্ত্র জব্দ করা হলো—তা গণমাধ্যমে ও রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রধান ইতিবাচক সংবাদ হওয়ার কথা ছিল। অথচ কয়েকটি গণমাধ্যম ও কায়েমী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী অভিযানের সার্বিক প্রেক্ষাপট, মাদক উদ্ধারের তথ্য ও নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টিকে আড়ালে রেখে কেবল কয়েক সেকেন্ডের ভিডিওর ভিত্তিতে ‘অস্ত্র প্রদর্শন’কে প্রধান মুখরোচক বিতর্কের বিষয় বানিয়ে ফেলল।
এই পুরো ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক এবং লজ্জাজনক অধ্যায়ের সূচনা হয় গতকাল রোববার। একদিকে যখন রোববার মধ্যরাতেও ইশরাক হোসেন সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন যে তাঁর পদত্যাগের বিষয়টি সম্পূর্ণ গুজব ও ভিত্তিহীন, ঠিক তখনই তাঁর আগে থেকেই অর্থাৎ সন্ধ্যা থেকে দেশের প্রধান প্রধান গণমাধ্যম সংবাদ প্রচার করতে শুরু করে যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন।
এখানে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হয় যে, সরকার একশ্রেণির তথাকথিত মিডিয়া মবের সরাসরি শিকারে পরিণত হয়েছে। সরকারের শুভাকাঙ্ক্ষী সেজে বসে থাকা যেসব মিডিয়া তিলকে তাল করে মাদকের মতো একটি ভয়াবহ জাতীয় সংকটকে পাশ কাটিয়ে কেবল অস্ত্র প্রদর্শনের ঠুনকো অজুহাত নিয়ে শোরগোল তুলেছে, তারাই দিনশেষে সরকারকে কোণঠাসা করে ফেলল। বাস্তবতা হলো, সরকার যদি শেষ পর্যন্ত মিডিয়া মবের চাপে পড়ে ইশরাককে পদত্যাগে বাধ্য করে, তবে এটি হবে সরকারের এক চরম নৈতিক পরাজয়।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো হল , এই সিদ্ধান্তের ফলে কার লাভ হলো? সরকারের এই দৃশ্যমান দুর্বলতা ও বোকামি দেখে সরকারবিরোধী শত্রুরা এবং সেই তথাকথিত মিডিয়াগুলো আজ খিলখিল করে হাসছে। কারণ তারা বুঝে গেছে যে, তারা মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে সরকারকে জিম্মি করে নিজেদের বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছে। এখানে আমার প্রশ্ন হচ্ছে—একটি নির্বাচিত সরকার যদি এভাবে প্রতিনিয়ত মিডিয়া মব ও কায়েমী স্বার্থের কাছে মাথা নত করে, তবে সেই সরকার দেশ চালাবে কেমন করে?
ইশরাক হোসেন নিজেই তো চরম অভিমানে প্রশ্ন তুলেছেন—যেসব মিডিয়ার সুশীল মানুষেরা মাদকের বিরুদ্ধে এই সাহসী অভিযানের বিরোধিতা করে আজ উল্লাস প্রকাশ করছে, তারা কি আগামী দিনে দেশে কোনো সংকট তৈরি হলে বা সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রয়োজন হলে জাতীয়তাবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বিদেশ থেকে দেশে এসে সেই আন্দোলনে যোগ দেবে?
আমাদের তথাকথিত মিডিয়ার এই লজ্জাজনক ও বিপজ্জনক ভূমিকা একটি জাতির জন্য কতটা ক্ষতিকর হতে পারে, তা বলে শেষ করা যাবে না। বাস্তবতা হলো, এসব মিডিয়া প্রতিনিয়ত মাদকের বিস্তারের জন্য সরকারের বিরুদ্ধে আঙুল তোলে। অথচ যখন সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য নিজে জীবন বাজি রেখে মাঠে নেমে মাদক কারবারিদের হাতেনাতে ধরলেন, তখন তাঁকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হলো যেন রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়ে গেছে।
আরেকটি গভীর সত্য এখানে উল্লেখ না করলেই নয়। আজ যেসব মিডিয়া সরকারের অতি ঘনিষ্ঠ ও শুভাকাঙ্ক্ষী সেজে বসে আছে, তাদের অতীত ইতিহাস যদি আমরা ঘাঁটি, তবে দেখতে পাব—এরাই একসময় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও জিয়া পরিবারের নির্মম চরিত্রহনন করেছে। জিয়া পরিবারের অনেক সদস্যকে তারা পরিকল্পিতভাবে চোর ও চাঁদাবাজ বানিয়ে শিরোনাম করেছে। আজ সেই একই গোষ্ঠী সরকারের পাশে থেকে নীতিনির্ধারণের ছক কষছে এবং সরকারকে ভুল পথে পরিচালিত করছে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে এই সরকার প্রতিষ্ঠার পর থেকে সরকারের ভালো কাজ ও গঠনমূলক উদ্যোগের পক্ষে সবচেয়ে বেশি কলম ধরেছি। কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় যখন নারী এমপি মিষ্টি ফৌজদারি অপরাধ করলেন, তখন আমি সরকারের সেই সাহসী সিদ্ধান্তের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছি। কারণ সেটি ছিল সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ।
কিন্তু ইশরাক হোসেন যা করেছেন, তার সঙ্গে রাড্ডার ঘটনার বিন্দুমাত্র তুলনা চলে না। মাদক আজ পুরো সমাজ, যুবসমাজ ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকে গিলে খাচ্ছে। আমি ভেবেছিলাম, সরকার এই ঘটনাটিকে একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ হিসেবে গ্রহণ করবে এবং সারা দেশের এমপিদের নির্দেশ দেবে, যাতে তাঁরা যার যার অবস্থান থেকে মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু তার পরিবর্তে মিডিয়া মবের চাপে সরকার যে ধোঁয়াশার জন্ম দিল, তা কেবল মাদক সিন্ডিকেটকেই উৎসাহিত করবে।
এই পুরো বিতর্কের মাঝখানে আরেকটি মৌলিক বিষয় সামনে চলে এসেছে, তা হলো আমাদের দেশের মান্ধাতা আমলের আইনি কাঠামো। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অপরাধের যে ভয়ংকর রূপ, সে অনুযায়ী বিদ্যমান আইনের আধুনিকায়ন ও সংশোধন অত্যন্ত জরুরি। মাদকের মতো একটি বিষাক্ত অপরাধ নির্মূলে যদি কোনো পুরোনো আইন বা নীতিমালা বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে বুঝতে হবে, সেই আইন জনস্বার্থ ও দেশের স্থিতিশীলতার পরিপন্থী। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের দেশের আইনপ্রণেতা বা সংসদ সদস্যরা তাঁদের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব ভুলে গেছেন। আইন প্রণয়ন ও সংশোধন নিয়ে সংসদে গভীর আলোচনা করার পরিবর্তে আমাদের এমপিদের একটি বড় অংশ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি,টেন্ডারবাজি এবং নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতেই বেশি ব্যস্ত থাকেন। অথচ তাঁদের প্রধান কাজ সময়ের প্রয়োজনে উপযুক্ত আইন প্রণয়ন করে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
পরিশেষে স্পষ্ট করেই বলতে চাই, মাদকবিরোধী লড়াইয়ে ইশরাক হোসেনের মতো একজন সাহসী নেতার পাশে থাকার পরিবর্তে যদি সরকার মিডিয়া মবের কাছে নতি স্বীকার করে তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করে, তবে তা হবে সরকারের আত্মঘাতী ও লজ্জাজনক অধ্যায়। ক্যানসারের মতো একটি মারাত্মক রোগ শরীরে রেখে বাইরে থেকে মেকআপ বা মলম লাগিয়ে যেমন রোগ সারানো যায় না, তেমনি শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেটকে টিকিয়ে রেখে বাহ্যিক চাপে ভালো কাজ থমকে দিলে রাষ্ট্র বাঁচানো যায় না। সরকারের নীতিনির্ধারকদের এখনো সময় আছে এই ভ্রান্ত ও আত্মঘাতী অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে সাহসিকতার সঙ্গে মাদক নির্মূলে ইস্পাতদৃঢ় অবস্থান নেওয়ার। অন্যথায় ইতিহাসের কাঠগড়ায় এই নৈতিক পরাজয়ের দায়ভার সরকারকেই নিতে হবে। মহান আল্লাহ সুবহানা তায়ালা আমাদের সহিহ বুঝ নসিব করুন।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com