আজ বৃহস্পতিবার, ১৫ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি
আজ বৃহস্পতিবার, ১৫ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

যে নেতার মিছিলের অপেক্ষায় থাকতেন খালেদা জিয়া, তিনি আজ স্মৃতির পাতায়!

রাজনীতি কেবল ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ, পদ-পদবি কিংবা স্লোগানের উচ্চকিত প্রতিধ্বনি নয়; রাজনীতি হলো মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ার এক কঠিন সাধনা। রাজপথের ধুলোবালি মেখে, কর্মীদের ভালোবাসা অর্জন করে এবং আন্দোলন-সংগ্রাম ও সাংগঠনিক দক্ষতার মধ্য দিয়ে কিছু মানুষ নিজেদের সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেন। ঢাকার রাজনীতিতে তেমনই এক পরিচিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক সালাহউদ্দিন আহমেদ। একসময় যাঁর মিছিল ঢাকার রাজপথে রাজনৈতিক শক্তির পরিচয় বহন করত, যাঁর নেতৃত্বে বিপুলসংখ্যক কর্মী-সমর্থক দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিতেন, সেই মানুষটি আজ চিরদিনের জন্য নীরব হয়ে গেছেন।

১৩ অক্টোবর, মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮০ বছর বয়সে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন সালাহউদ্দিন আহমেদ (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর এই মহাপ্রস্থান শুধু একটি পরিবারের স্নেহের ছায়া হারানো নয়; এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, রাজপথের অনুসারী ও অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষীর হৃদয়ে গভীর শূন্যতা তৈরি করেছে। অবিভক্ত ঢাকা মহানগর বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যাঁর নাম কয়েক দশক ধরে জড়িয়ে ছিল, তাঁর বিদায় অতীতের বহু আন্দোলন-সংগ্রাম ও রাজপথের স্মৃতিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

আমার কাছে সালাহউদ্দিন আহমেদের বিদায় শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার চলে যাওয়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক মাস আগের একটি ব্যক্তিগত সাক্ষাতের স্মৃতি—একটি সাধারণ মুহূর্ত, যা আজ অসাধারণ মূল্যবান ও বিষাদময় হয়ে উঠেছে।

পুরান ঢাকার জুরাইনে মাজার গেটের পাশে তাঁর সিএনজি পাম্পের কার্যালয়ে তাঁর মুখোমুখি বসে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। সঙ্গে ছিলেন দৈনিক দিনকালের যুগ্ম বার্তা সম্পাদক শ্রদ্ধেয় সেলিম ভাই। তাঁর বড় ছেলে রাসেল ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় ও দাপ্তরিক আলোচনার সূত্র ধরে বৃষ্টিভেজা দুপুরে সেই সাক্ষাৎ হয়েছিল।

সেলিম ভাইয়ের মুখে বহুবার শুনেছি সালাহউদ্দিন আহমেদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সাহসের কথা। কিন্তু সেদিন তাঁর সঙ্গে সরাসরি কথা বলে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের আড়ালে থাকা এক আন্তরিক ও স্নেহশীল মানুষকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। তিনি আমাদের অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আপন করে নিলেন। নিজ হাতে ছানা-মিষ্টি খেতে দিলেন, চা পান করালেন। পেশাগত অভিজ্ঞতা, দেশের সমসাময়িক রাজনীতি এবং পুরান ঢাকার সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা হলো। তাঁর আচরণে ছিল অতিথিকে আপন করে নেওয়ার সহজাত আন্তরিকতা, আর কথায় ফুটে উঠেছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা।

সেদিনের সাক্ষাৎটি আর দশটি সাধারণ সাক্ষাতের মতোই শেষ হয়েছিল। হাসিমুখে বিদায় নেওয়ার সময় মনে হয়েছিল, আবার দেখা হবে, আবার কোনো একদিন বসে দেশের রাজনীতি ও সাধারণ মানুষের কথা নিয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু কে জানত, কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই স্মৃতিই বুকের ভেতর হাহাকার হয়ে ফিরে আসবে! যাঁর সঙ্গে চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে কথা বলেছি, যিনি এত আন্তরিকতায় আপ্যায়ন করেছেন, আজ তাঁকে নিয়েই শোকের কলম ধরতে হবে—এ বাস্তবতা সত্যিই বেদনাদায়ক।

মানুষের জীবনের সবচেয়ে করুণ সত্য হলো, আমরা জানি সবাইকে একদিন চলে যেতে হবে; তবু পরিচিত কোনো মুখ চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আগে সেই সত্যের গভীরতা উপলব্ধি করতে পারি না। প্রতিদিনের ব্যস্ততা আর ভবিষ্যতের নানা পরিকল্পনার মধ্যে আমরা ভুলে যাই, সময় কাউকে আগাম বার্তা দেয় না। কখন একটি পরিচিত কণ্ঠস্বর নীরব হয়ে যাবে, কখন কোনো প্রিয় মুখ স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নেবে, তা কেউ জানে না।

ঢাকার রাজনীতিতে সালাহউদ্দিন আহমেদের অবস্থান গড়ে উঠেছিল তৃণমূলের কর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং কঠিন সময়েও রাজপথে সক্রিয় থাকার মধ্য দিয়ে। তিনি শুধু বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা ছিলেন না; অবিভক্ত ঢাকা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নগরভিত্তিক আন্দোলন-সংগ্রাম সংগঠিত রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

মহানগরের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি কথা বহুল প্রচলিত রয়েছে যে, বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে সালাহউদ্দিন আহমেদের সুসংগঠিত বিশাল মিছিলের জন্য অপেক্ষা করতেন। প্রচলিত এই কথাটি তাঁর সাংগঠনিক প্রভাব, জনপ্রিয়তা ও কর্মী-সমর্থকদের সংগঠিত করার সক্ষমতার পরিচায়ক হিসেবে আলোচিত হয়।

রাজনীতিতে একটি বড় মিছিল কেবল মানুষের সমাবেশ নয়; এর পেছনে থাকে হাজারো কর্মীর শ্রম, নেতার প্রতি আস্থা এবং দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক প্রচেষ্টা। বিচিত্র পেশা ও অভিজ্ঞতার মানুষকে একটি রাজনৈতিক লক্ষ্যকে সামনে রেখে একত্র করা নেতৃত্বের অন্যতম বড় পরীক্ষা। সালাহউদ্দিন আহমেদের রাজনৈতিক পরিচিতি ও প্রভাবের আলোচনায় তাঁর মিছিল এবং কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি তাই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

ঢাকার শ্যামপুর, কদমতলী ও ডেমরা অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ১৯৯১, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে ঢাকা-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। সংসদীয় রাজনীতির পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং এলাকার সমস্যা ও উন্নয়নের প্রশ্নে ভূমিকা রাখার মধ্য দিয়ে তিনি নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচিতি গড়ে তোলেন। নির্বাচনে জয়-পরাজয় রাজনীতির স্বাভাবিক বাস্তবতা; কিন্তু মানুষের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্কই একজন নেতার স্মৃতিকে দীর্ঘস্থায়ী করে।

কেন্দ্রীয় বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির নানা পরিবর্তন, আন্দোলন-সংগ্রাম ও উত্থান-পতনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন। তাঁর প্রয়াণ তাই শুধু একজন প্রবীণ নেতাকে হারানো নয়, বরং একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান।

১৩ অক্টোবর রাতে এভারকেয়ার হাসপাতালে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন তাঁর ছেলে ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তানভীর আহমেদ রবিন। জনপরিসরে সালাহউদ্দিন আহমেদ ছিলেন একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব; কিন্তু পরিবারের কাছে তিনি ছিলেন স্নেহময় পিতা, অভিজ্ঞতার আশ্রয় এবং নির্ভরতার প্রতীক। একজন মানুষের বিদায়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শূন্যতা তৈরি হয়, কিন্তু পরিবারের কাছে সেই শূন্যতা আরও গভীর ও ব্যক্তিগত। প্রিয়জনের অনুপস্থিতি কোনো আনুষ্ঠানিক শোকবার্তায় পূরণ করা যায় না।

পবিত্র কুরআনের চিরন্তন বাণী আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। পৃথিবীর সব ব্যস্ততা, পদ-পদবি ও অর্জন পেছনে ফেলে একদিন সবাইকে মহান আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু মানুষের কর্ম, ব্যবহার ও ভালোবাসার স্মৃতি থেকে যায় অন্য মানুষের হৃদয়ে। কখনো বড় কোনো রাজনৈতিক অর্জন, কখনো কঠিন সময়ে সাহসী ভূমিকা, আবার কখনো একটি আন্তরিক ব্যবহারই মানুষকে স্মরণীয় করে রাখে।

রাজপথের মিছিল একদিন থেমে যায়, কার্যালয়ের পরিচিত কোলাহল স্তব্ধ হয়, লাউডস্পিকারের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর নীরব হয়ে আসে। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে আন্তরিকতা দিয়ে লেখা নাম সহজে মুছে যায় না। সালাহউদ্দিন আহমেদের বিদায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবন ক্ষণস্থায়ী, অথচ মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ও সদাচরণের মূল্য অনেক গভীর।

মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন মরহুম সালাহউদ্দিন আহমেদকে ক্ষমা করে জান্নাতুল ফেরদাউসের উচ্চ মাকাম দান করেন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার, স্বজন ও রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের এই শোক সহ্য করার শক্তি দেন।

বিদায়, সালাহউদ্দিন আহমেদ! ঢাকার উত্তাল রাজপথে আপনার দীর্ঘ পথচলা ও রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতি মানুষের মনে বেঁচে থাকবে। আর জুরাইনের সেই বৃষ্টিভেজা দুপুরে আপনার আন্তরিক আপ্যায়ন, এক কাপ চা, ছানা-মিষ্টি আর প্রাণবন্ত কথোপকথনের স্মৃতি আমার হৃদয়ে চিরদিন অমলিন হয়ে থাকবে। আবার দেখা হবে—এমন একটি সাধারণ প্রত্যাশা যে একদিন এত গভীর বেদনার স্মৃতি হয়ে উঠবে, তা কে জানত! আজ রয়ে গেছে শুধু স্মৃতি, শ্রদ্ধা ও আপনার আত্মার মাগফিরাতের প্রার্থনা।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, দৈনিক আমার দিন।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin