আজ মঙ্গলবার, ৩রা নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৮ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৩শে জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি
আজ মঙ্গলবার, ৩রা নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৮ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৩শে জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

যুক্তরাষ্ট্র-চীন-ভারতের ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ে প্রবেশ করলো রাশিয়ার নৌবাহিনী: নিউজউইকের প্রতিবেদন

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক বলিষ্ঠ করতে চাইছে মস্কো। এমন সময় ভারত মহাসাগরে পৌঁছেছে রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার গণতন্ত্রবিরোধী পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে। এখানে নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুযোগ দেখছে ক্রেমলিন। রাশিয়ার প্যাসিফিক ফ্লিটের সাবমেরিন-বিরোধী দুটি যুদ্ধজাহাজ এডমিরাল ট্রিবিউটস, এডমিরাল পান্টেলেয়েভ এবং ট্যাংকার পেচেঙ্গা এই সপ্তাহান্তে নোঙর করেছে বঙ্গোপসাগরের চট্টগ্রাম বন্দরে। এর কয়েকদিন আগে পার্শ্ববর্তী আন্দামান সাগরে রাশিয়া ও মিয়ানমার যৌথভাবে নৌ-মহড়ায় অংশ নিয়েছে এসব জাহাজ। এই দুটি ইভেন্ট মিলে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভবিষ্যতের উচ্চাকাঙ্ক্ষার ইঙ্গিত দিচ্ছে মস্কো। এটা হতে পারে একটি কৌশলগত সম্পর্ক, এর মাধ্যমে লোভনীয় বাণিজ্যিক রুট পরিচালিত হয়। বিশেষ করে চীনের আমদানি করা তেলের বেশির ভাগই যায় এখান দিয়ে। এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে বেইজিং, ওয়াশিংটন এবং নয়াদিল্লি। একে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহে ‘বৃহৎ শক্তির বিরোধিতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নিউজইউকের সাংবাদিক ডেভিড ব্রেনানের লেখা এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।

তিনি আরও লিখেছেন, গত সপ্তাহে আন্দামান সাগরে যৌথ মহড়ার প্রশংসা করে মস্কো একে ‘আধুনিক ইতিহাসে প্রথম রাশিয়া-মিয়ানমার নৌ-মহড়া’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এই নৌ-যুদ্ধ মহড়া ক্রেমলিন এবং মিয়ানমারের কর্তৃত্ববাদী সামরিক জান্তার মধ্যে দীর্ঘদিনের সামরিক সম্পর্ককে জোরালোভাবে ফুটিয়ে তোলে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে অনেক বিদ্রোহী গ্রুপের বিরুদ্ধে তীব্র গৃহযুদ্ধে লিপ্ত আছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। এমন অবস্থায় চট্টগ্রাম বন্দরে রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ পৌঁছায় প্রশংসা করেছে ঢাকায় অবস্থিত রাশিয়ান দূতাবাস। তারা একে বর্ণনা করেছে, রাশিয়া-বাংলাদেশের সম্পর্কের মধ্যে বিরাট একটি মাইলফলক হিসেবে। বলেছে, ৫০ বছরের মধ্যে এটাই তাদের যুদ্ধজাহাজের এমন সফর।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মস্কোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে ঢাকা। প্রাথমিকভাবে এর কারণ পশ্চিমা, প্রথমত যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণে। তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অবনতির কারণে বাংলাদেশকে এই চাপ দিচ্ছে। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ই-মেইলে যোগাযোগ করে নিউজউইক।

ইউক্রেনের বিরুদ্ধে বিপর্যয়কারী যুদ্ধের মধ্যেই ‘গ্লোবাল সাউথে’র সঙ্গে শক্তিশালী ঐতিহাসিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে রাশিয়া। তারা পশ্চিমা লোভনীয় বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পুরোটা না হলেও গুরুত্বপূর্ণ ভোক্তা, প্রযুক্তি এবং শিল্প বিষয়ক আমদানি স্থবির অবস্থায় আছে। এমন অবস্থায় নতুন নতুন সম্ভাবনা, বিশেষ করে গণতন্ত্রবিরোধী দেশগুলোতে সম্ভাবনা খুঁজছে মস্কো। থিংক ট্যাংক ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র রাশিয়া বিষয়ক বিশ্লেষক ওলেগ ইগনাটোভ নিউজউইককে বলেছেন, প্রথমত পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে এ অঞ্চলে রাশিয়ার আগ্রহ বা স্বার্থ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের পণ্যের জন্য নতুন সব চাহিদা, নতুন সব বাজার প্রয়োজন। পশ্চিমারা ও ইউরোপিয়ানরা যখন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তখন রাশিয়া তার বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলছে (নতুন নতুন দেশের সঙ্গে)। তারা এশিয়ার বিভিন্ন দেশ, তুরস্ক এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে নতুন বাণিজ্যিক রুট ও সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। নিষেধাজ্ঞা দেয়ার ফলে রাশিয়ার বাণিজ্য ব্যাপকভাবে পরিবর্তন হয়েছে।

ইগনাটোভ বলেন, এমন অর্থনৈতিক প্রণোদনা হতে পারে বাংলাদেশের সঙ্গে মস্কোর সম্পর্ক। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলার ১২৬৫ কোটি ডলারের প্রকল্পে এরই মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগ অর্থায়ন করেছে রাশিয়া। এই স্থাপনায় ব্যবহারের জন্য অক্টোবরে রাশিয়ান ইউরেনিয়াম জ্বালানির প্রথম চালান পেয়েছে বাংলাদেশ।

ইগনাটোভ ব্যাখ্যা করেন, অন্যদিকে মিয়ানমারের সঙ্গে মস্কোর সম্পর্ক প্রথমত সামরিক। সামরিক প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ভিত্তিতে সেই সম্পর্ক। দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার অস্ত্রের একটি প্রধান ক্রেতা ন্যাপিডর শাসক সামরিক জান্তা। তীব্র গণতন্ত্রপন্থি বিদ্রোহ থাকা সত্ত্বেও এই কর্তৃত্ববাদী সরকারকে ক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করছে ক্রেমলিন। মিয়ানমার বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে চায় না। এ জন্য তাদের প্রয়োজন রাশিয়াকে। একই সঙ্গে এ অঞ্চলে তাদের প্রয়োজন চীনের একটি বিকল্প।

মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাউন্সেলর ডেরেক চোলেট অভিযোগ করেন যে, সামরিক জান্তার জন্য অব্যাহত সামরিক সমর্থন অগ্রহণযোগ্য। অস্থিতিশীলতা অগ্রহণযোগ্য। এটা শুধু মিয়ানমারের সমস্যা নয়। একই সঙ্গে এই অঞ্চলের সমস্যা।

ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে রাশিয়ার। কিন্তু তারা অদূর ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা ভারতের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পেরে উঠবে না। আঞ্চলিক কোনো সামরিক ঘাঁটি নেই রাশিয়ার। এমনকি গত বছর মস্কো সফরকালে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা মিন অং হ্লাইং বলেছেন, তাদের হিসাবে রাশিয়ার নৌঘাঁটি নেই। এর প্রেক্ষিতে ইগনাটোভ বলেন, এই প্রতিযোগিতা রাশিয়ার জন্য সম্ভব নয়। কারণ, তাদের সেই রকম রিসোর্স নেই। এই অঞ্চলের চেয়ে ভূমধ্যসাগরে তাদের অধিক স্বার্থ রয়েছে।

এমনকি যদি মস্কোর সক্ষমতা থাকতোও এবং তারা ভারত মহাসাগরে তাদের উপস্থিতি বিস্তৃত করতে সক্ষম হতো, তাহলে তাতে ভবিষ্যতের দুটি সুপার পাওয়ার চীন ও ভারতকে বড় রকম হতাশ করার ঝুঁকি থাকতো। ইগনাটোভ বলেন, এই অঞ্চলে চীনের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখেছে রাশিয়া। তারা এটা অনুধাবন করতে পারে যে, এটা সেই অঞ্চল, যেখানে চীনের নিজস্ব স্বার্থ আছে। তারা চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে চায় না। তবে আরও বড় করে বললে বলা যায়, নিজস্ব সীমান্তের কাছে জাপানে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতির বিষয়ে মস্কো বেশি উদ্বিগ্ন।
এই অঞ্চলে ভারত ও মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করতে চাইবে চীন। বিশেষ করে যখন সামরিক সহযোগিতার একটি নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লি। এর মধ্যে এ বছরে ভারতীয় বন্দর ব্যবহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জাহাজকে অনুমতি দেয়ার একটি চুক্তি অন্তর্ভুক্ত।

 

 

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin