অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেছেন, দেশে পরিকল্পিতভাবে একটা অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। বিগত সরকার নানাভাবে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। এক দিনে এত ঘটনা কাকতালীয় হতে পারে না। এই ইন্ধনের পেছনে কারা জড়িত তদন্ত করা হচ্ছে।
আর ইন্ধন রয়েছে কি না তা তদন্ত করে তথ্য প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তথ্য উপদেষ্টা বলেন, কোনো পত্রিকা অফিসে ভাঙচুর বা পত্রিকা বন্ধে চাপ দেওয়া সহ্য করা হবে না।
গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানী ঢাকার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে তারা এসব কথা বলেন। ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব শফিকুল আলম ও উপপ্রেসসচিব জাহাঙ্গীর আলম অপূর্ব উপস্থিত ছিলেন।
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘প্রথম আলো নিয়ে একটি উত্তেজনা দেখতে পাচ্ছি কয়েক দিন ধরে। গতকালও (রবিবার) এ রকম উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল অফিসের সামনে। আজকে রাজশাহীতে তাদের অফিসে ভাঙচুর হয়েছে; চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ হয়েছে। আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, কোনো গণমাধ্যম বা পত্রিকার বিরুদ্ধে যদি জনগণের কোনো অংশের অভিযোগ-ক্ষোভ থাকে, তারা সেটি প্রকাশ করতে পারে, তবে সেটি শান্তিপূর্ণভাবে হতে হবে।
’
তিনি বলেন, ‘কোনো পত্রিকা অফিসে ভাঙচুর করা, পত্রিকা বন্ধের জন্য চাপ দেওয়া আমরা সমর্থন করি না। এ ধরনের ঘটনা পরে ঘটলে সহ্য করা হবে না। ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘মানুষের সভা-সমাবেশের অধিকার আছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে সেটার জন্য আইনগত পদক্ষেপ নিতে পারে।
আমরা আহ্বান জানাব, যেন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বা নৈরাজ্যকর বিষয়ে জনগণ অংশ না নেয়।’
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, সোমবার অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে দেখা গেছে, ভোররাত থেকে ঢাকায় বাস, মাইক্রোবাসে করে কিছু সাধারণ মানুষকে নিয়ে আসা হয়েছে ঋণ দেওয়ার নাম করে। অহিংস গণ-অভ্যুত্থান নামের একটি প্ল্যাটফরম মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে মানুষকে নিয়ে এসেছে। ওই প্ল্যাটফরমের আহ্বায়ককে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, গতকাল দুপুরে রাজশাহী নগরীর বোয়ালিয়া থানার মোড়ে প্রথম আলোর আঞ্চলিক অফিসের সামনে থেকে সাইনবোর্ড খুলে নিয়েছে আন্দোলনকারীরা। এই ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে সন্ধ্যায় ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব শফিকুল আলম। পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘রাজশাহীতে প্রথম আলো কার্যালয়ে হামলার তীব্র নিন্দা জানাই আমি। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার বা অন্য কোনো গণমাধ্যমের সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আইনি প্রতিকারের জন্য আদালতে যেতে পারেন। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদও করতে পারেন। তবে সাংবাদিকদের হুমকি ও ভয় দেখানো বা গণমাধ্যমে হামলা সহ্য করা হবে না।’
গত রবিবার ঢাকায় প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ের সামনে আন্দোলনরতদের ওপর ‘হামলার’ প্রতিবাদে এ বিক্ষাভ করেছে আন্দোলনকারীরা। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারকে ভারতীয় আধিপত্যবাদ প্রসারের হোতা দাবি করে তারা বিক্ষোভ করে। গতকালও রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়েছিল বিক্ষোভকারীরা। সেখানে সতর্ক অবস্থান নেন পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা।
এ বিষয়ে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রুহুল কবীর খান গণমাধ্যমকে বলেন, সোমবারও বিক্ষোভকারীরা প্রথম আলো অফিসের সামনে অবস্থান নিয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের অনেক সদস্য প্রথম আলো অফিসের সামনে মোতায়েন রয়েছে।
কবি নজরুল কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ মোকাবেলায় পুলিশের দুর্বলতা ছিল বলে স্বীকার করেছেন তথ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পুলিশের দুর্বলতা ছিল বলেই এমন ঘটনা ঘটেছে। পুলিশকে সক্রিয় করতে পুলিশে রদবদল চলছে।’
সংবাদ ব্রিফিংয়ে উপদেষ্টা সজীব ভূঁইয়া বলেন, কলেজের সংঘর্ষের ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সকাল থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর চেষ্টার ফলেও সংঘর্ষ এড়ানো যায়নি। যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে৷ ভবিষ্যতে আর এ ধরনের ঘটনা সহ্য করা হবে না।
তিনি বলেন, ‘সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গা থেকে আমরা দেখেছি, তিনজন নিহত হওয়ার একটি খবর রটেছিল। তবে এখন পর্যন্ত কারো নিহত হওয়ার সংবাদ আমরা পাইনি।’ তিনি বলেন, অনেকেই আহত হয়েছে, হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
উপদেষ্টা সজীব ভূঁইয়া বলেন, সংঘর্ষ এড়াতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। কোনোভাবেই যেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ না হয় এবং নিজেদের মধ্যে যাতে সংঘর্ষ না হয়। সে জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ চেষ্টা করে যাচ্ছিল। কিন্তু সংঘর্ষ এড়ানো যায়নি। সংঘর্ষ এড়াতে পুলিশ রাবার বুলেট ব্যবহার করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, পুলিশ যখন আক্রান্ত হয় তখন তারা রাবার বুলেট ব্যবহার করেছে। পুলিশ, সেনাবাহিনী শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে করেছে। কেন এ ঘটনা ঘটল, তা তদন্তের আগে বলা যাবে না। তিনি আরো বলেন, ‘পুলিশে নতুন নিয়োগে কাজ চলছে। পরিবর্তন আনতে সময় প্রয়োজন।’
ইসকন নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাস আটকের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব বলেন, ‘চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের আটকের ব্যাপারে ডিএমপি আপনাদের জানাবে। আমরা জেনেছি, তার নামে কোতোয়ালি থানায় মামলা আছে।’ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এসব ঘটনার পেছনে অন্য কোনো মোটিভেশন আছে কি না, আমরা নিশ্চিত নই।’