গ্যাস আছে কি না—চুলায় চাবি দিয়ে চেক করেছিলেন সিদ্ধিরগঞ্জের গৃহবধূ আফরোজা। গ্যাস না থাকায় সঠিকভাবে বন্ধ করতে পারেননি। ভোর সাড়ে ৫টার দিকে রান্না করতে চুলায় দিয়াশলাই জ্বালাতেই বিস্ফোরণ। সেদিনই গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন স্বামীসহ দুই সন্তান। একইভাবে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে গত বছরের ডিসেম্বরে আড়াইহাজারে একটি বাড়িতে দুই শিশুসহ একই পরিবারের চার জন দগ্ধ হয়েছে। তাদের কারো মৃত্যু না হলেও দগ্ধ হয়েছিল শরীরের বিশাল অংশ।
শুধু সিদ্ধিরগঞ্জ আর আড়াইহাজার নয়, গত ১২ মাসে নারায়ণগঞ্জে পাঁচটি গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনায় ২৭ জন দগ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে পাঁচ জনের। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়েছে ফতুল্লায়। সেখানে ১৮ জন, সিদ্ধিরগঞ্জ ও আড়াইহাজারে চার জন করে আট জন দগ্ধ হয়েছে। এছাড়া রূপগঞ্জে দগ্ধ হয়েছে এক জন। এদের মধ্যে ফতুল্লায় মারা গেছে চার জন ও সিদ্ধিরগঞ্জে এক জন। ভুক্তভোগী এমনই এক পরিবারের সদস্য আমেনা বেগম বলেন, ‘দিনে বেশির ভাগ সময় গ্যাস থাকে না। তাই চেক করার জন্য চুলায় চাবি দেওয়া হলেও গ্যাস না থাকলে বন্ধ হয়েছে কি না বুঝার উপায় থাকে না। তাছাড়া গ্যাসের অবস্থান গন্ধের কারণে বোঝা যেত, এখন সেটাও পাওয়া যায় না। তাই এই ধরনের বিস্ফোরণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।’
সুজনের (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল বলেন, এই ধরনের দুর্ঘটনার প্রধানত অসাবধানতাবশত হয়। তিতাস কর্তৃপক্ষ পাইপ লিকেজের ব্যাপারে সচেতন হলে দুর্ঘটনা কমে আসবে। আরও কমবে সচেতনতামূলক প্রচারণা করলে। তল্লা মসজিদের ঘটনায় তারই একটি বড় অবহেলার একটা বড় উদাহরণ। সেখানে তিতাসের বড় একটা দায় লক্ষ্য করা যায়। পাশাপাশি আগে গ্যাসের গন্ধের উপস্থিতি নিশ্চিত হতো, এখন সেই গন্ধের প্রখরতা নেই।
নারায়ণগঞ্জ তিতাস গ্যাসের উপ-মহাপরিচালক মো. মামুনুর রশিদ জানান, ‘বিস্ফোরণের মতো দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ অসাবধানতা। তাই সচেতনতাতেই বেশি গুরুত্ব দিতে বলব সাধারণ মানুষকে। আমরা চাই মানুষকে সব সময় সতর্ক রাখতে। তাই গ্যাসের বিলের কাগজেও গ্যাস ব্যবহারের নিয়ম লিখে দেওয়া হয়। মানুষকে সচেতন করতে আমরা এখন থেকে মাইকিংও করব। পাশাপাশি কেমিক্যাল মিশ্রিত (গন্ধ যুক্ত) গ্যাস সরবরাহ করব। যাতে গন্ধ শুঁকে মানুষ গ্যাসের উপস্থিতি টের পেয়ে সচেতন হতে পারে।’ তবে, নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক ফখর উদ্দিন আহাম্মদ জানান, ‘প্রতিদিনই অগ্নিকাণ্ডসহ গ্যাস বিস্ফোরণের মতো দুর্ঘটনা থেকে মানুষকে বাঁচাতে সচেতন করি। মহড়ার পাশাপাশি মসজিদ, মন্দির আর বাসাবাড়িতে প্রচারণা চালানো হয়। তবে বেশির ভাগ মানুষ ব্যস্ততার কারণে শুনতে চায় না। তাছাড়া কেউ যদি কারো এলাকায় ক্যাম্পেইন করানোর জন্য ডাকে, আমরা প্রস্তুত আছি।’ তিনি বলেন, সাতটি উপায়ে রান্নাঘরে গ্যাস বিস্ফোরণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। প্রথমত রান্না করার পর চুলা এবং এলপিজি সিলিন্ডারের রেগুলেটরের সুইচ বন্ধ করে রাখা। রান্না ঘরের ওপরে ও নিচে ভ্যান্টিলেটরের ব্যবস্থা করা, ঘরের মধ্যে গ্যাসের গন্ধ পেলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দরজা জানালা খুলে দেওয়া এবং সিলিন্ডারের রেগুলেটর বন্ধ করে দেওয়া। রান্না করার সময় অন্তত আধা ঘণ্টা আগে রান্নাঘরের দরজা জানালা খুলে রাখা। এতে করে আটকে থাকা গ্যাস থাকলে সেটা বের হয়ে যাবে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে যাবে। এলপিজি সিলিন্ডার চুলা থেকে দূরে রাখা এবং সিলিন্ডারটি দরজা জানালার কাছে বা বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় রাখা। রান্নাঘরে গ্যাসের গন্ধ পেলে কোনোভাবেই লাইটার জ্বালানোর চেষ্টা না করা ও মোবাইল ফোন বা ইলেক্ট্রিক্যাল সুইস অফ বা অন না করা। পাশাপাশি গ্যাসের চুলা এলপিজি চুলার নিচে রাখা।