আজ রবিবার, ৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১০ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি
আজ রবিবার, ৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১০ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি

লক্ষ্য চীনের প্রভাব ঠেকানো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বন্ধু বাড়াতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র

চীনের আঙিনা হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। এই অঞ্চলে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের কঠোর বৈদেশিক নীতির প্রভাব যতটা পড়েছে, তা আর কোথাও পড়েনি। বেইজিংয়ের ক্ষমতা এ অঞ্চলে যেমন বেড়েছে, তেমনি অস্বস্তি বেড়েছে ওয়াশিংটনের। এজন্য বছরের পর বছর ধরে দূরে সরে থাকার পর যুক্তরাষ্ট্র আবারও এ অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। গত ১০ থেকে ১৩ নভেম্বর কম্বোডিয়ায় অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ ইস্ট এশিয়ান নেশনস বা আসিয়ানের বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সম্মেলনে যোগ দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ২০১৭ সালের পর তিনিই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট আসিয়ানের শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিলেন। মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই এ সম্মেলনে যোগদান করেছেন তিনি।

বিবিসির এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, এখন অতীতের চেয়ে আরো বেশি প্রতিকূল কূটনৈতিক পরিবেশে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র। এক সময় এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কূটনীতির জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচিত হতো আসিয়ান। কিন্তু বর্তমানে একটি ক্রমবর্ধমান মেরুকৃত বিশ্বে কার্যকর থাকতে এটি হিমশিম খাচ্ছে। সংস্থাটি নিজেকে শান্তি ও নিরপেক্ষতার একটি অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলেছে। এর ১০টি সদস্য রাষ্ট্র রয়েছে যারা ঐকমত্য চায়, একে-অন্যকে সমালোচনা এড়ায় এবং বিভিন্ন শক্তিকে জড়িত করতে দ্বিধা করে না। সংস্থাটি সবচেয়ে ভালো কাজ করেছিল যখন সেটি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক নীতিতে ঐকমত্য ছিল এবং সেটি বাণিজ্য ও প্রবৃদ্ধিকে বাড়িয়েছিল।

কিন্তু বিশ্ববাজারে চীনের আগমন এবং ২০০০ সালের গোড়ার দিকে চীনের প্রভাব যখন বাড়তে শুরু করে, তখন একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ কমতে থাকে। কারণ ঐ সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে নজর সরিয়ে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। এই অঞ্চলে চীন দেশটির সাবেক নেতা দেং জিয়াওপিংয়ের একটি মন্ত্র মাথায় নিয়ে এগোতে শুরু করে। আর তা হচ্ছে, নিজের শক্তি লুকাও, নিজের সময় কাটাও। কিন্তু টানা ১০ বছর ধরে শি জিনপিং ক্ষমতায় থাকার কারণে চীনের শক্তি আসলে আর লুকানো যায়নি।

গত দশকে দক্ষিণ চীন সাগরে রিফ দ্বীপপুঞ্জে চীনের দখলদারিত্ব এবং সামরিক উন্নয়ন ঐ অঞ্চলে অন্যান্য দাবিদার বিশেষ করে ভিয়েতনাম এবং ফিলিপাইনের সঙ্গে চীনের বৈরিতা প্রকাশ্যে এসেছে। চীনকে বিতর্কিত এলাকায় একটি ‘আচরণবিধি’ মেনে নেওয়ার জন্য আসিয়ানের প্রচেষ্টা আলোর মুখ দেখেনি। আর চীন অর্থনৈতিকভাবে এত গুরুত্বপূর্ণ এবং সামরিকভাবে এত শক্তিশালী যে এই অঞ্চলের কেউই প্রকাশ্যে এর মোকাবিলা করার সাহস করে না।

অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ওয়াশিংটনের প্রতি অসন্তোষ বেড়ে চলেছে। ১৯৯৭ সালে এশিয়ায় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলটিকে ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয় এবং কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য করে। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে দেখে না এবং মনে করে তারা মানবাধিকার এবং গণতন্ত্র ইস্যুতে অতি ব্যস্ত থাকে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় প্রায় সম্পূর্ণভাবে অঞ্চলটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এশিয়ার প্রতি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তা আরো প্রকট করে তোলে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র জাপান, ভারত এবং অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে যে কোয়াড জোটের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে, সেটিও আসিয়ানকে দুর্বল করেছে। পাশাপাশি এই জোটভুক্ত দেশগুলোকে যেন দুটি শক্তিশালী পক্ষের মধ্যে আটকে ফেলেছে। এশিয়ায় চীনকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ওয়াশিংটনের যে ইচ্ছা, সেটিও তাদের ভয়ের কারণ। পরাশক্তির দ্বন্দ্ব থেকে তাদের অনেক কিছু হারানোর ভয় রয়েছে।

সিএনএনের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট বাইডেন আসিয়ানের সম্মেলনে বলেন, আমার প্রশাসনের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে আসিয়ান। সেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্র-আসিয়ান ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারিত্বের সূচনা সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি নীতিভিত্তিক শৃঙ্খলা ব্যবস্থা, আইনের শাসনের বিরুদ্ধে হুমকি মোকাবিলা এবং একটি মুক্ত, স্থিতিশীল এবং নিরাপদ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য ৮৫ কোটি ডলারের সহায়তা দেওয়ার কথা জানান।

বাইডেন বলেন, এটি আমার তৃতীয় সফর, আমার তৃতীয় শীর্ষ সম্মেলন যেখানে আমি সশরীরে উপস্থিত হয়েছি। আসিয়ানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কতটা গুরুত্ব দেয় এটি তারই প্রমাণ।

বর্তমান অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটা স্বস্তির হতে পারে যে, যুক্তরাষ্ট্র জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ায় যেভাবে সামরিক মিত্রতা গড়ে তুলেছে, চীনের এখানে সেভাবে ঘনিষ্ঠ সামরিক মিত্র হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে কম-বেশি সব আসিয়ান দেশগুলো এখন স্বীকার করে যে, চীন এই অঞ্চলে প্রভাবশালী শক্তি হবে এবং যেখানে তার নিজস্ব স্বার্থ ঝুঁকিতে রয়েছে সেখানে ছাড় দিতে নারাজ তারা। তাই বাইডেনের জন্য প্রশ্ন হচ্ছে—চীনের দোরগোড়ায় বন্ধুত্ব বাড়াতে কি যুক্তরাষ্ট্র বিলম্ব করে ফেলেছে?

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin