আজ বুধবার, ২৬শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১৩ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি
আজ বুধবার, ২৬শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১৩ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

কক্সবাজারে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, হুমকির মুখে প্রকৃতি-জীববৈচিত্র্য

কক্সবাজারের উখিয়াতে পাহাড় কাটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বালি উত্তোলনের নামে বিলীন হয়েছে ৩০ টি পাহাড়। পাহাড়ের উপর মেশিনের সাহায্যে পাইপ বসিয়ে উত্তোলন করছে বালি ও মাটি । রাতের অন্ধকারে ও বসে নেই বালি খেকোরা। স্থানীয়রা বলছেন দিনের বেলায় অভিযান চললে রাতের আঁধারে কাটে পাহাড়। ফলে প্রাণ প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পাশাপাশি নিচিহ্ন হয়ে যাচ্ছে পাহাড়।ধ্বংস হচ্ছে বনাঞ্চল। পাহাড় খেকোদের থাবায়, খাদ্যের অভাবে মারা পড়ছে হাতিসহ নানা পশুপাখি। একটি বেসরকারি সংস্থার জরিপ রিপোর্টে বলা হয়েছে গত দুই বছরে বালু খেকোরা ৩০ টি পাহাড়ের অন্তত ১ হাজার তিনশ একর পাহাড়ী জমির শ্রেণী পরিবর্তন করেছেন । যা হাজার কোটি টাকার বন সম্পদের ক্ষতি সাধিত হয়েছে। যে ক্ষতির জন্য দায়ী খালের বালির বৈধ ইজারা বা লীজ গ্রহীতা অবৈধ ভাবে পাহাড় কর্তনকারী সিন্ডিকেট। যে ক্ষতি কোন ভাবে পূরণ হবার নয়।
উখিয়ার পালংখালী ও থাইংখালিতে ৫০ /৬০টি স্পটে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ৩০ টি পাহাড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে বালু খেকো সিন্ডিকেট। প্রতিবাদ করায় ইউপি চেয়ারম্যান এম, গফুর উদ্দীন চৌধুরী সহ ৭ জনের বিরুদ্ধে চাঁদা বাজি মামলা দায়ের করেছে শক্তিশালী বালু সিন্ডিকেট। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। এলাকায় চলছে, মানব বন্ধন, বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ। তারপর ও বেপরোয়া বালু খেকোরা। কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না পাহাড় কাটা। গত ৯ ডিসেম্বর পাহাড কেটে বালু উত্তোলন ১০ হাজার ফুট পাহাড়ী বালু জব্দ করেছেন বন বিভাগ। এক বছরে বন বিভাগ ৬১ টি বালু ও মাটি ভর্তি ট্রাক ডাম্পার,শতাধিক ড্রেজার মেশিন,দুই শতাধিক বেলচা,কোদালসহ মাটি বালি কাটার যন্ত্রপাতি জব্দ করেছে ।পাহাড় কেটে বালি ও মাটি পরিবহনের দায়ে ২১৮ টি মামলায় আসামী করা হয়েছে ৪৩৫ জনকে। সংঘবদ্ধ পাহাড় খেকোরা ওই এলাকায় সশস্ত্র পাহারা এবং সিসি ক্যামেরা বসিয়ে দীর্ঘদিন একের পর এক সরকারি পাহাড় কেটে বালু ও মাটি বিক্রির জন্য স্তুপ করছিল। ওই বালুগুলো সম্প্রতি জব্দ করে বন বিভাগ। বালু ইজারার নামে একের পর এক পাহাড় গিলে খাচ্ছে তারা।
সরে জমিনে গিয়ে দেখা যায়, খাল বা ছড়ায় ড্রেজারমেশিন বসিয়ে পাইপ দিয়ে পাহাড়ের উপর পানি তুলে মাটি আর পানি গুলিয়ে মেশিনের সাহায্যে বালি উত্তোলন করছে তারা। শক্তিশালী এই সিন্ডকেট কে মামলা জরিমানা মোবাইল কোর্ট বসিয়ে মালামাল জব্দ করে ও ঠেকানো যাচ্ছে না। জনৈক আলী আহমদের নেতৃত্বে চলছে পালংখালী ও টাইংখালীতে পাহাড় কাটার মহোৎসব। ইজারার সীৃমানার বাইরে গিয়ে পাহাড় কুড়ে বের করছে হাজার হাজার ফুট বালু ও মাটি। টাইংখালী ও পালংখালী বিট কর্মকর্তাদ্বয় এ প্রতিবেককে জানান, বালি খেকোরা খুবই হিংস্র। তারা সশস্ত্র অবস্থায় এসব অপরাধ করে যাচ্ছে।এমনকি তারা রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের পাহাড় কেটে বালু উত্তোলনে ব্যবহার করছে বলে জানিয়েছেন পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের ৬ জন সদস্য। শুধু তাই নয়, এসব বালু খেকোদের বিরুদ্ধে পাহাড় কাটা বন্ধের দাবীতে একাধিকবার মানব বন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে এলাকাবাসী।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলার সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহ বলেন পাহাড় কাটার ভয়াবহতা বন্ধ করা না গেলে নিচিহ্ন হয়ে যেতে পারে অর্ধশতাধিক পাহাড়। এতে পরিবেশ বিপর্যয়সহ পাহাড় ধসের আশঙ্কা ও করছেন পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান হোছাইন সজীব জানান, বালু ইজারাদার ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি সংরক্ষিত পাহাড়ের মাটি কর্তন করছে। অভিযান চালিয়ে বালু ও মাটি ভর্তি ডাম্পার আটক করা হয় বারবার। তারা রাতের বেলায় মাটি ও বালি পরিবহন করে যা ইজারা বা লিজ আইনের পরিপন্থি। সিন্ডিকেট সদস্যরা ইজারা বা লিজ নেওয়ার কোন কাগজপত্র দেখাতে এ সময় ব্যর্থ হন। উখিয়ার পালংখালীর থাইনখালী ও মুছারখোলা বনবিট এলাকায় পাহাড় খেকোদের বিরুদ্ধে সর্বশেষ ১১ ডিসেম্বর অভিযান চালিয়েছে বন বিভাগ। এ সময় স্তুপকৃত বালু, মাটি ও একটি ডাম্পার গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। তবে পাহাড় কাটার সাথে জড়িত কেউ আটক হয়নি বলে জানা গেছে। আগামীতে বন বিভাগ উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ মিলে যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করা হবে। পাহাড়, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
জানাগেছে গত শনিবার বন বিভাগের এক অভিযানে ওই বিপুল পরিমাণ বালু ও মাটি জব্ধ করে উখিয়া বন বিভাগ।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, এই ভয়াবহ পাহাড় খেকোদের বিরুদ্ধে কেন পরিবেশ অধিদপ্তর মামলা করছে না, তা নিয়ে সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. সারোয়ার আলম বলেন, ‘অবৈধভাবে পাহাড় কাটা বন্ধে গত শনিবার ও াঅভিযান চালানো হয়েছে।তিনি জানান, এ অভিযান অব্যাহত থাকবে। এতে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া ও হচ্ছে। এর আগেও পাহাড় খেকোদের বিরুদ্ধে শত শত মামলা করেছে বন বিভাগ।
কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের উখিয়া বন কর্মকর্তা গাজি শফিউল আলম বলেন, পাহাড়কাটার পয়েন্টগুলোতে লাল পতাকা টাঙ্গিয়ে দেয়া হয়। এরকম ১০টি পয়েন্টে পাওয়া গেছে পাহাড় কাটা কয়েক কোটি টাকার মাটি ও বালু। কতটি পাহাড় কাটা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোন চিহ্ন না থাকায় সঠিকভাবে বলা মুশকিল। পাহাড়ের কাটা মাটিতে লবণ মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। লবণ মিশানো মাটি এবং বালু অন্যত্র ব্যবহার করা যায় না। একারণেই তা করা হয়েছে। পাহাড় কাটায় নিয়োজিত লোকজনের বিরুদ্ধে অতি সম্প্রতি ১৮টি মামলাও করা হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে তারা সবাই পাহাড় নিধনের ঘটনায় জড়িত স্থানীয় লোকজন। এদের সাথে রয়েছে সশস্ত্র ভাড়াটে রোহিঙ্গা ও।
বন কর্মকর্তা আরো বলেন, সংঘবদ্ধ এসব ব্যক্তিগণ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পাহারা বসিয়ে এবং সিসি ক্যামেরার সাহায্যে আইন প্রয়োগকারি সংস্থার লোকজনের গতিবিধি নজরে রেখে দীর্ঘদিন ধরে এমন অপকর্ম করে আসছে।’ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই পাহাড় খেকোদের পেছনে একটি শক্তিশালী চক্র জড়িত রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি পাহাড় খেকো সি-িকেটের বিরুদ্ধে জোরালো আইনী ব্যবস্থা নেয়া হোক।
কক্সবাজার জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শাহীনুল হক মার্শালের নাম ভাঙ্গিয়ে পাহাড় কেটে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। তবে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বলেন, খালের নির্ধারিত ইজারাকৃত বালু মহালের বালু উত্তোলনের বাইরে কেউ পাহাড় কাটলে এর দায়ভার আমি নিতে পারি না। আমি এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে পাহাড় কেটে বালি উত্তোলনে কেউ জড়িত থাকলে তা চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin