কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনায় বিগত এক বছরে (১ জানুয়ারি-৩১ ডিসেম্বর ২০২২) সারা দেশে ৫৪৭টি কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনায় ৭১২ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। ২০২১ সালে সারা দেশে ৩৯৯টি কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনায় ৫৩৮ জন শ্রমিক নিহত হয়েছিলেন। জাতীয় এবং স্থানীয় মোট ২৬টি সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের ওপর ভিত্তি করে বেসরকারি সংস্থা সেইফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটি (এসআরএস) এই জরিপ পরিচালনা করেছে। যে সব শ্রমিক কর্মক্ষেত্রের বাইরে অথবা কর্মক্ষেত্র থেকে আসা-যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় অথবা অন্য কোনো কারণে মারা গেছেন তাদের এই জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
গতকাল শনিবার সংগঠনটির সেমিনার কক্ষে আয়োজিত ‘কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিক এবং বর্তমান শ্রম পরিস্থিতি’ বিষয়ক সংলাপে এ তথ্য জানানো হয়। জরিপে প্রাপ্ত কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি শ্রমিক নিহত হয়েছেন পরিবহন খাতে, যাদের সংখ্যা মোট ৩৩৩ জন। এর পরেই রয়েছে সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে (যেমন—ওয়ার্কশপ, গ্যাস, বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি) ১৭০ জন, নির্মাণ খাতে নিহত হয়েছেন ১০৪ জন, কৃষি খাতে ৬২ জন এবং কলকারখানা ও অন্যান্য উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানে এই সংখ্যা ৪৩ জন। অনিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থা, আইন প্রয়োগে বাধা, বেপোরোয়া যান চলাচল ও অদক্ষ চালক পরিবহন দুর্ঘটনার মূল কারণ।
মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৫৩ জন; বিস্ফোরণে ৮৪ জন; বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ৬৯ জন; বজ্রপাতে ৫৭ জন; মাচা বা ওপর থেকে পড়ে নিহত হয়েছে ৪৫ জন; শক্ত বা ভারী কোনো বস্তুর আঘাত বা তার নিচে চাপা পড়ে ৩৮ জন; পানিতে ডুবে ২৪ জন; আগুনে পুড়ে ১৪; রাসায়নিক দ্রব্য বা সেপটিক ট্যাংক বা পানির ট্যাংকের বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ১৪ জন; পাহাড় বা মাটি, ব্রিজ, ভবন বা ছাদ ও দেওয়াল ধসে ১৩ জন এবং অন্যান্য কারণে এক জন নিহত হয়েছে। জরিপ তথ্য প্রকাশকালে এসআরএসের নির্বাহী পরিচালক সেকেন্দার আলী মিনা বলেন, কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। প্রত্যেকটি সেক্টরে গুরুত্বের সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কেমিক্যাল সংরক্ষণ, পরিবহন ও ব্যবহারে আরো বেশি সতর্ক হতে হবে। বিভিন্ন ছোট-বড় বিস্ফোরণের ঘটনা বছর জুড়েই পরিলক্ষিত হয়েছে। কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি আরো বাড়াতে হবে। তা না হলে দুর্ঘটনা বাড়তেই থাকবে।
সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন বিস্ফোরণে নিহতের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে এসআরএস জানিয়েছে, কেমিক্যাল সংরক্ষণে অদক্ষতা ও অবহেলা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকা, কারখানার ভবনে জরুরি বহির্গমন পথ না থাকা, বহির্গমন পথ তালাবদ্ধ করে দেওয়া, কারখানা নির্মাণে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে অনুমতি না নেওয়া, নিরাপত্তা বিষয়ে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ না দেওয়া, নিয়মিত অগ্নিনির্বাপণ মহড়া না করা। কোনো রকম নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নিয়েই বৈদ্যুতিক লাইন সংযোগ দেওয়া, ভেজা হাতে মোটর চালু করা, মাথার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বিদ্যুতের লাইনের নিচে কাজ করা, ভবনের পাশে দিয়ে বয়ে যাওয়া বৈদ্যুতিক তারের পাশ দিয়ে লোহার রড উঠানোকে বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। তাছাড়া ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার না করার কারণেও কিছু দুর্ঘটনা ঘটছে।
বলা হয়,কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের জন্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম প্রদান এবং এ বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব মালিকের। মালিক কর্তৃক শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে কিনা তা পরিদর্শন করার দায়িত্ব সরকারি প্রতিষ্ঠানের। শ্রমিকের দায়িত্ব মালিকের নির্দেশনা মেনে কাজ করা। সরকার, মালিক, শ্রমিক সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব।