বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক শাসন এবং সেনাবাহিনীর প্রভাব একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত পাঁচটি সেনা অভ্যুত্থান ও হস্তক্ষেপের ঘটনাই এর বড় প্রমাণ। বাংলাদেশের মোট শাসনকালের অর্ধেকেরও বেশী সময় অর্থাৎ প্রায় ২৭ বছর কেটেছে সামরিক শাসন এবং সেনাবাহিনীর প্রভাব বলয়ে। এর মধ্যে সাবেক সেনাপ্রধান শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও তার প্রতিষ্ঠিত দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ১৬ বছর দেশ শাসন করেছে। আরেক সেনাপ্রধান ও প্রেসিডেন্ট স্বৈরাচার হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ ও তার দল জাতীয় পার্টি প্রায় ৯ বছর এবং ১/১১ সরকার খ্যাত সাবেক সেনাপ্রধান মঈন উদ্দিন-ফখরুদ্দিন সরকারের শাসনকাল ছিল ২ বছর।
প্রশ্ন হচ্ছে, ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে সামরিক শাসক ও তাদের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল কেমন করে এত শক্ত অবস্থান তৈরি করল? এর দায় কার? প্রধানত রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতাই এর জন্য দায়ী বলে আমি মনে করি। দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে জনপ্রত্যাশাকে পাশ কাটিয়ে নিজের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় মড়িয়া ভূমিকার জন্যই নিয়মিত বিরতিতে সামরিক শাসনের কবলে পড়েছে আমাদের প্রিয় এই মাতৃভূমি।
দুঃখজনকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই প্রথম সেনা শাসনের পথ সুগম করেন তার অকল্পনীয় ও জনআকাঙ্খা বিরোধী মারাত্মক কিছু ভুল সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। একদিকে নিত্যপণ্যের সীমাহীন উর্ধ্বগতি ও আইন শৃংখলা পরিস্থিতির চরম অবনতিতে সরকারের প্রতি মানুষের অসন্তুষ্টি। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা গণতন্ত্রের কবর রচনা করে সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধকরণ ও বাকশাল গঠন এবং অনুগত ৪টি পত্রিকা ব্যতিত সব পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া। তখন ¯েøাগান ওঠেছিল, ‘এক নেতার এক দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’। তার শাসনামলে বিভিন্ন নির্বাচনে ভোট ডাকাতি-জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রক্কালে পাকসেনা কর্তৃক শেখ মুজিবের গ্রেপ্তার নিয়েও বিতর্ক আছে। অনেক মুক্তিযোদ্ধা মনে করেন যে, তার পরিবারকে পুনর্বাসনের শর্তে তিনি নিজেই ধরা দিয়েছিলেন। এজন্য তিনি আগেই ব্যাগ-ট্যাগ গুছিয়ে রেখেছিলেন। যা হোক, মুল প্রসঙ্গে ফিরা যাক।
বহুবিধ কারণে বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক থেকে কার্যত খলনায়কে পরিণত হন। তার সরকারের জনপ্রিয়তা প্রায় শুন্যের কোঠায় নেমে আসে। এমন পরিস্থিতিতে সেনা অভ্যুত্থানে নির্মমভাবে তাকে হত্যা করা হয়। এর পরের প্রেক্ষাপট কম বেশী সবারই জানা আছে। তাই এখানে বিস্তারিত বলছি না। কিন্তু এটুকু বলতেই হবে যে, পরাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর কথায় যেখানে সাড়ে সাত কোটি মানুষ আগুনে ঝাঁপ দিতেও প্রস্তুত ছিল। সেখানে স্বাধীন দেশে মাত্র তিন বছরের শাসনামলে তাকে সপরিবারে হত্যা করা হলেও কেউ জোড়ালো কোনো প্রতিবাদ করে নি।
এখানে খুবই প্রাসঙ্গিকভাবে আরো একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। আর তা হল, বঙ্গবন্ধু যদি নিত্যপণ্যের দাম ও আইন-শৃংখলা স্বাভাবিক রাখতেন। গণতন্ত্র অবরুদ্ধ করে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ও বাকশাল গঠন থেকে বিরত থাকতেন এবং সব পত্রিকা বন্ধ না করতেন। তাহলেও কি এমন নির্মম ঘটনা ঘটত? সেনা অভ্যুত্থান হতো?
অনেকে বলতে পারেন। এটা ষড়যন্ত্র ছিল। দেখুন, ক্ষমতা ও ষড়যন্ত্র পাশাপাশি বাস করে। এটা পৃথিবী জুড়েই আছে। দুনিয়া সৃষ্টির শুরু থেকেই এটা চলছে। দেশপ্রেমিক ও যোগ্য শাসকেরা এই ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করেই জনগণের ভালবাসায় টিকে থাকে। আমরত্ব লাভ করে। আর ব্যর্থ-অযোগ্য শাসক ও তাদের দোসররা নিজেদের অক্ষমতা আড়াল করতে ষড়যন্ত্রতত্তে¡র সস্তা ধোঁয়া উড়িয়ে জনগনকে বিভ্রান্ত করার অপপ্রয়াস চালায়।
এ ক্ষেত্রে একজন দেশপ্রেমিক জিয়াউর রহমান এবং ক্ষমতালোভী স্বৈরাচার হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ’র সামরিক শাসক থেকে রাজনৈতিক দলের নেতা হয়ে ওঠার দু’টি প্রেক্ষাপট প্রণিধানযোগ্য বলে মনে করছি।
১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর সিপাহী-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত ও সফল অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে দেশের চরম বিশৃংখল পরিস্থিতিতে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অটুট রাখতে জাতির বিশেষ প্রয়োজনে সামরিক শাসনের দিকে পা বাড়ান স্বাধীনতার ঘোষক, রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান।
উল্লেখ্য আমাদের সেনাবাহিনীর প্রাথমিক দায়িত্ব হচ্ছে ভূখণ্ডের অখণ্ডতা ও বহিঃশত্রæর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করা। পাশাপাশি যে কোন জরুরি প্রয়েজনে বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় এগিয়ে আসতে তারা সাংবিধানিকভাবে প্রতিশ্র“তিবদ্ধ।
তাই সামরিক শাসন নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সাবেক সেনাপ্রধান শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অমরত্ব লাভ করেছেন সে সময়ে জাতির কল্যাণে তার বীরোচিত ভূমিকার জন্য। অনুকরণীয় সততা এবং অকৃত্রিম দেশপ্রেমের কারণে আজো তিনি কোটি মানুষের হৃদয়ের রাজা। প্রথম দফায় (২৫ আগস্ট ১৯৭৫ থেকে ৩ নভেম্বর ১৯৭৫) ৭০ দিন এবং দ্বিতীয় দফায় (৭ নভেম্বর ১৯৭৫ থেকে ২৮ এপ্রিল ১৯৭৮) ২ বছর ১৭২ দিন সেনাপ্রধান হিসেবে ক্ষমতায় ছিলেন। পরে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করেন। বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন দেন। সে নির্বাচনে তিনি বিপুল বিজয় অর্জন করেন। কিন্তু তিনি মাত্র চার বছরেরও কম সময় বাংলাদেশ শাসন করার সুযোগ পেয়ে ছিলেন। কারন তিনি ১৯৮১ সালের ৩০শে মে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে চট্টগ্রামে নির্মমভাবে নিহত হন। জিয়ার মৃত্যুতে দেশের মানুষ কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তার জানাযায় অংশ নেয় লাখো মানুষ।
অন্যদিকে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘকাল (২৯ এপ্রিল ১৯৭৮ থেকে ৩০ আগস্ট ১৯৮৬) ৮ বছর ১২৩ দিন সেনাপ্রধান হিসেবে থেকেও আরেক প্রেসিডেন্ট হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদকে স্বৈরাচার ও বিশ্ব বেহায়া তকমা নিয়ে মরতে হয়েছে। তার প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টি এখন নাম সর্বস্ব এবং কার্যত একটি আঞ্চলিক দলে পরিণত হয়েছে।
এর কারণ,দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে নন্দিত-জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর স্বৈরাচার এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ বিএনপি তথা আব্দুস সাত্তারের নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন।
পরে ১৯৮৬ সালে তিনি জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করে লোক দেখানো নির্বচনের মাধ্যমে দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ওই সাজানো নির্বাচনে বাংলাদেশ আ.লীগ ও জামায়াত অংশ নিলেও বিএনপি তা বয়কট করে। উল্লেখ্য পতিত স্বৈরাচার হাসিনা ১৯৮৬ সালের নির্বাচন নিয়ে এক জনসভায় ঘোষণা করেছিলেন যে,‘যারা বা যিনি এই নির্বাচনে অংশ নেবে, তিনি বা তারা জাতীয় বেঈমান হবে। কিন্ত এই ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে হাসিনা সবাইকে অবাক করে দিয়ে এরশাদের সঙ্গে গোপন আঁতাতের মাধ্যমে নির্বাচনে অংশ নেয়ার কথা জানান দেন। এজন্য বিরোধীরা তাকে স্বঘোষিত জাতীয় বেঈমান বলে আখ্যায়িত করেন।
আ.লীগ ও জামায়াত এর মদদপুষ্ট এরশাদের স্বৈরশাসন চলে প্রায় ৯ বছর। কিন্তু ১৯৯০ সালে তার বিরূদ্ধে জনতার সম্মিলিত আন্দোলনের মুখে সেনা সমর্থন হারালে ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতাচ্যুত করে তাকে বন্দি করা হয়।
এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে একটি অবাধ নির্বাচনের পর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনরায় চালু হয়। এরপর নিরপেক্ষ ও অবাধে বাংলাদেশে আরো তিনটি (১৯৯৬-২০০১-২০০৮) জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে।
সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত¡াবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করার পর অনেকে ভেবেছিলেন যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ হয়তো আর থাকবে না। কিন্তু না। বেশি সময় গড়ায়নি।
২০০৪ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় সংবিধান সংশোধন করে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়স সীমা বাড়িয়ে দেয়া হয়। তখন আ.লীগ অভিযোগ তুলে যে নিজেদের পছন্দের ব্যক্তি বিচারপতি কেএম হাসানকে তত্ত¡াবধায়ক সরকার প্রধান হিসেবে পাবার জন্য এই সংশোধনী করা হয়েছিল। এ নিয়ে শুরু হয় রাজনৈতিক সংকট। প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মুখে এক তরফা একটি নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে তৎকালীন বিএনপি সরকার। এতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা ।
এক পর্যায়ে ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে সেনাবাহিনী। প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে সড়িয়ে দেয়া হয়। জারী করা হয় জরুরী অবস্থা। স্থগিত করা হয় বিএনপির সরকারের আয়োজন করা সে নির্বাচন। তবে সেনাবাহিনীর এই হস্তক্ষেপ ছিল বেশ অভিনব। সেনাবাহিনী সরাসরি ক্ষমতা দখল না করেও তাদের পছন্দসই বেসামরিক ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠন করা হয় একটি তত্ত¡াবধায়ক সরকার। কিন্তু নেপথ্যে সবই করতেন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমদ।
মঈন উদ্দিন-ফখরুদ্দিনের নেতৃত্বে দুই বছর পর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে আ.লীগ আবারো ক্ষমতায় আসে। ২০১১ সালে একক সিদ্ধান্তে সংবিধান থেকে নির্দলীয় তত্ত¡াবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়ে পুনরায় রাজনৈতিক সংকটের সূচনা করে হাসিনা সরকার। কর্তৃত্বপরায়ন হাসিনা পর পর ৩ বার ভোটারবিহীন নির্বাচন করে দেশকে কার্যত একনায়কতন্ত্রে পরিণত করেন।
হাসিনা দেশের ইতিহাসে নিষ্ঠুরতম শাসকের ভুমিকায় অবতীর্ণ হন। কারণ দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় হাসিনা খুব সচেতনতার সঙ্গে এটা বুঝতে পেরেছিল যে জনগণের ভোটে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার সম্ভাবনা একদমই ক্ষীণ। আর তাই তিনি স্বনির্বাচিত হওয়ার জন্য সমস্ত নীতি-আদর্শকে ব্র্যাকেট বন্দি করে যা কিছু করা দরকার তা-ই করেছেন দু’চোখ বন্ধ করে। বিরোধীমত বিশেষত বিএনপিকে দমনে হাসিনা রাষ্ট্রীয় যন্ত্রকে ব্যবহার করেছেন উন্মাদের মতো। বিরোধীদের হত্যা-গুম, মিথ্যা-গায়েবী মামলার উৎসবের মধ্যেই সীমিত ছিল না সে উন্মদনা। বরঞ্চ এই উন্মাদনার সব থেকে বেশী নির্মম-নিষ্ঠুর শিকার হয়েছে রাষ্ট্র নিজেই। দলীয়করণের সহিংস থাবায় গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে রাষ্ট্র হয়ে ওঠেছিল হাসিনাময়। যে কোনো মূল্যে ক্ষমতা ধরে রাখার উদগ্র বাসনায় হাসিনা রক্ত পিয়াসী হিং¯্র-বন্য প্রাণীর মতো হয়ে ওঠেন। কিন্তু তারপরও ছাত্র-জনতার প্রবল প্রতিরোধের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে ৫ আগস্ট তাকে ভারতে পালাতে হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এত বহুধা ও সুদূর বিস্তৃত সংকট আর কখনো দেখা যায়নি। শুধু তাই নয়। নিকট ভবিষ্যতে এমনটি আর দেখা যাবে বলেও আমি মনে করি না।
কিন্তু এমন সর্বগ্রাসী সংকটের মুহূর্তেও রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন আমাদের সেনাপ্রধান একজন ওয়াকার-উজ-জামান। কারণ উদ্ভুত পরিস্থিতিতে ক্ষমতারোহণের এমন মোক্ষম সুযোগ পেয়েও তিনি তার পূর্বসূরিদের অনুসরণ করেন নি। শুধু তাই নয়। হাসিনার জরুরী অবস্থা জারির দাবিও নাকচ করে দেন সেনাপ্রধান। হাসিনা রেজিমের গড়ে তোলা সুসজ্জিত-শক্তিধর ও ভয়ংকর জেনারেলদের বলয় ভেঙ্গে ছাত্র-জনতার পক্ষে একাকী বীরের বেশে দাঁড়িয়েছেন। বলতে দ্বিধা নেই। তিনিই আমাদের সত্যিকারের মহানায়ক। তার অসাধারণ নৈতিক ভিত্তি ও নায়কোচিত ভূমিকার জন্যই সেদিন হাসিনার পালিত জেনারেলরা পাল্টা অভ্যুত্থানের সাহস করেনি।
আমি দৃঢ় চিত্তে বিশ্বাস করি যে,আমাদের সমাজে নৈতিকতার দুর্ভিক্ষকালে একজন ওয়াকার-উজ-জামান যে নজির বিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি আমাদের মুক্তির দূত। জাতির অমূল্য সম্পদ।
আমি এও বিশ্বাস করি যে, একজন ওয়াকার-উজ-জামানকে সেনাপ্রধান হিসেবে যেদিন নিয়োগ দেয়া হয়। সেদিনই হাসিনার ভাগ্য লেখা হয়ে যায়। কারণ সেনাপ্রধানের নিকটাত্মীয় এবং আমার পরিচিত একাধিক জেনারেল এর সঙ্গে কথা বলে তার সম্পর্কে সামান্যই জানতে পেরেছি। ৫৭ বসন্তের এই মানুষটিকে কোনো ধরনের অনৈতিকতা কখনো তাকে স্পর্শ করতে পারে নি। তার সততা ও নৈতিকতার কাছে ক্ষমতা-নারী-মদ,অর্থ-সবই তুচ্ছ। এটা তার আজন্ম বৈশিষ্ট্য। বোধ করি, এ শক্তির বলেই তিনি আত্মীয় হওয়া সত্তে¦ও হাসিনাকে বলতে পেরেছিলেন,‘আপনি পদত্যাগ করুন। সেনাবাহিনী ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালাবে না’।
সূত্রমতে, চূড়ান্ত আন্দোলন চলাকালে তিনি সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। জনাকীর্ণ সে বৈঠকে তিনি কোনো সিনিয়র কর্মকর্তাদের নয় বরঞ্চ সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট থেকে মেজর পদ মর্যাদার ৮৪ জন জুনিয়র কর্মকর্তার বক্তব্য শুনেন। এর মধ্যে মাত্র দু’জন কর্মকর্তা হাসিনার পক্ষাবলম্বন করেন। অন্যরা বক্তব্যে ছাত্র-জনতার ওপর চালানো হাসিনার বর্বরতা তুলে ধরে তা বন্ধে দ্রæত পদক্ষেপ নেয়ার আহবান জানান। এ সময় অনেকে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। কেউ কেউ কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। কেউ একজন পবিত্র কোরআনের বাণী উদ্ধৃত করে বলেন,‘ জালেমকে সমর্থন করা মানে জালেমের অন্তর্ভুক্ত হওয়া। আর আল্লাহ সোবহানাতা’আলা দু’জনকেই সমান শাস্তি দেবেন। হে মহান আল্লাহ আপনি আমাদের রক্ষা করুন’। এ কথা শুনে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান আবেগপ্রবণ হয়ে বলে ওঠেন-আমীন। এ ঘটনা আমাদেরকে এ বার্তাই দেয় যে সৃষ্টিকর্তার রহমত থাকলে সবকিছুই সহজ হয়ে যায়।
ধর্মপরায়ন, ন্যায়বান ও সুদৃঢ় ব্যক্তিত্বের জন্যই তিনি সেনাবাহিনীতে তুমুল জনপ্রিয়। বলা হচ্ছে, সাবেক সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের পর একজন ওয়াকার-উজ-জামানই একমাত্র ব্যক্তি যিনি সেনাবাহিনীতে দল-মত নির্বিশেষে সকলের কাছে প্রিয় মানুষ হয়ে ওঠেছেন। মৃদুভাষী ও যে কোনো সিদ্ধান্তে অটল বৈশিষ্ট্যের জন্যও তার সুখ্যাতি রয়েছে।
এাছাড়াও তার ডিএনএ জুড়েই রয়েছে আদর্শ নেতৃত্বের গুণাবলী। ময়মনসিংহ বিভাগের শেরপুরে জেলার বিখ্যাত খান বাহাদুর জমিদার পরিবারে ১৯৬৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর জন্ম লাভ করেন ওয়াকার-উজ-জামান। তার পিতা আসাদ-উজ-জামান ছিলেন স্বনামধন্য জেলা জজ। তার দাদা খান বাহাদুর ফজলুর রহমান এবং নানা খান বাহাদুর সাকি খান। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চাচা খান বাহাদুর শেখ মোশাররফ হোসেন খান সাহেবের নাতনীর জামাতা তিনি। দেশের আর্থ-সামাজিক ও শিক্ষার উন্নয়নে অসমান্য অবদানের জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার খান বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করেন।
পাঠক,সেনাপ্রধান সম্পর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উল্লেখ করতে চাই। ২০০৯ সালে ফেব্রæয়ারী মাসের ২৫ তারিখে বিডিআর বিদ্রোহের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা দমনে তিনি পিলখানা সদর দপ্তরের দিকে ছুটে যান। তখন তিনি ১৭ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট’র অধিনায়কের দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু অভিযান পরিচালনার অনুমতি না পাওয়ায় তিনি মনোকষ্ট নিয়ে ফিরে আসেন। ফিরে আসার পূর্বে তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি লাভের প্রাণপন চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। অভিযানের অনুমতি পেলে হয়ত ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা বেঁছে যেতেন।
একজন ওয়াকার-উজ-জামান সম্পর্কে যতই জানছি, ততই মূগ্ধ হচ্ছি। গর্বিত বোধ করছি নাগরিক হিসেবে।
আমার মনে এমন প্রশ্নও উঁকি দিচ্ছে, অপরিসীম দেশপ্রেমিক-তেজোদ্দীপ্ত এই মানুষটি কি অদূর ভবিষ্যতে আমাদের গুণে ধরা রাজনীতির মাঠে পা রাখবেন? স্বার্থান্ধ রাজনীতির অচলায়তন ভেঙ্গে দিয়ে তিনি কি অবহেলিত-বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়াবেন? পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে কি একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করবেন?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অন্তর্র্বর্তী সরকারের গত দু’মাসের আমলনামাটা একটু দেখে নেয়া যাক। সরকার ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বড় ধরণের নাশকতা ও সন্ত্রাসী হামলার আশংকা দেখা দিয়েছে। ব্যাপক পরিসরে বোমা হামলা হলেও অবাক হবো না। রাস্তা-ঘাট,কল-কারখানা,হাট-বাজারে অচলাবস্তা কাটেনি এখনো। চারদিক কেমন যেন এলোমোলো লাগছে।
সরকার এখনো জনমনে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করতে না পারলেও অফিসে বোতলজাত পানির বদলে জগ-গøাস এর ব্যবহার ও বাজারে পলিথিন বন্ধে বেশ তৎপরতা দেখিয়েছেন।
বাজার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য,দখল-চাঁদাবাজি,সীমান্ত হত্যা ও কক্সবাজার সীমান্তে মিয়ানমারের উস্কানি বন্ধ করতে পারেনি। ছাত্র-জনতার ওপর গুলি বর্ষণকারী সন্ত্রাসী ও ইন্ধনদাতা মন্ত্রী-এমপি ও কুখ্যাত পুলিশদের ধরতে পারে নি। তবে শীর্ষ সন্ত্রাসী-ডাকাত ও বিতর্কিতদের মুক্তি দিয়ে উদারতার স্বাক্ষর রেখেছে সরকার। এই উদারতার পুরস্কার হিসেবে একজন মেধাবী সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম ছারোয়ার নির্জনকে নির্মম খুনের শিকার হতে হল। কার্যকলাপ দেখে মনে হচ্ছে, সরকার হাসিনা-মোদির বয়ানকেই সত্যি করে তুলছে।
স্মরণ করা যেতে পারে যে, গত দেড় দশক ধরে হাসিনা-মোদি জুটি সর্বদা পশ্চিমাদের এই অভিন্ন বার্তা দিয়েছে যে ‘হাসিনা ক্ষমতায় না থাকলে বাংলাদেশ ইসলামী চরমপন্থী ও সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে। দক্ষিন এশিয়ার শান্তি-সম্প্রীতি বিনষ্ট হবে। এর ফলে তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তোমরা ভাল করে চোখ মেলে তাকাও। দেখো, আমার হাসিনা ইসলামিষ্ট-জঙ্গিদের কত সফলভাবে দমন করছে। কত উন্নয়ন করছে’। এমন বয়ানের জোরেই দীর্ঘকাল ধরে টিকে ছিল হাসিনার ফ্যাসিবাদ। হাসিনা ¯েøাগান তুলেছিল, ‘হাসিনার মূলমন্ত্র-উন্নয়নের গণতন্ত্র’।
আমেরিকার প্রভাবশালী পত্রিকা বøুমবার্গ সম্প্রতি ‘বাংলাদেশে বিশৃঙ্খলা ইসলামপন্থী চরমপন্থীদের জন্য দরজা খুলে দিয়েছে’ শিরোনামে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে যে, ‘সরকারে অস্থির পরিবর্তনের পর জঙ্গিরা শক্তিশালী হচ্ছে, এশিয়া জুড়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করছে’। পাঠক কী বুঝলেন?
সরকার অবশ্য এর প্রতিবাদ জানিয়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, তরুণ শিক্ষার্থী ও কিছু ইসলামী রাজনৈতিক দলের কর্মীদের হাতে আইএস-আলকায়েদার মতো কালেমা খচিত কালো পতাকা দেখা যাচ্ছে কেন? এসব যে উইনুস সরকারের বিরুদ্ধে পতিত হাসিনা ও তার দোসরদের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র এতে আমার বিন্দু মাত্র সন্দেহ নেই। কিন্তু সরকার শুরু থেকেইে সজাগ থাকলে এমন হতোনা। সরকারকে বলব, বোতল-পানি আর পলিথিন থেকে চোখ সড়িয়ে দেশ ও মানষের সংকট নিরসনে মনোযোগ দিন। ভুলে যাবেন না যে,বাংলাদেশ একটি রাষ্ট্র। এটি কোনো এনজিও নয়। সময় থাকতে জনদুর্ভোগ লাঘবে সচেষ্ট হোন।
দখল-টেন্ডার ও চাঁদাবাজি বন্ধে বিএনপির শীর্ষ মহল বার বার আহবান জানালেও এ ক্ষেত্রে সরকারের নীরব ভূমিকা রহস্যজনক বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু স্বার্থান্বেষী কোনো আন্তর্জাতিক মহলের ইন্ধনে ইসলামিষ্টদের ওপর ভর করে নতুন কোনো শক্তিকে ক্ষমতায় আনার নীল নকশা বাস্তবায়ন এতো সহজ হবে না। কারণ, আমি মনে করি, যে কোনো সময়ের তুলনায় বিএনপি এখন সবচেয়ে শক্তিশালী-সংগঠিত এবং পরীক্ষিত রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। তারা ঘুরে দাঁড়ালে এই সরকার ২৪ ঘন্টাও টিকতে পারবে কি-না সন্দেহ আছে।
আর বিএনপিকে যারা এখন ফ্যাসিবাদ আ.লীগের সঙ্গে তুলনা করছে। মনে হচ্ছে,তারা তাদের অতীত ভুলে গিয়ে ক্ষমতার স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে। অশুভ শক্তির ইন্ধনে আনুপাতিক আসন আর সংস্কারের দোহাই দিয়ে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করছে। সম্ভাবনাময় বাংলাদেশকে তারা সত্যিই জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের উর্বর ভূমি বানাতে চাইছে।
কচ্ছপ গতির অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান দেখে কটকা লাগছে মনে। নিয়োগ, পাদায়ন ও বদলী বাণিজ্যের কারণে পুলিশ-জনপ্রশাসনে চলছে অস্থিরতা। আজ নিয়োগ দিয়ে কালই প্রত্যাহার অথবা বাতিল। এমন ঘটনা নিয়মিতই ঘটছে। গত মাসে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে ড.উইনুস প্রথমে ৭ সদস্যের টীম ঘোষণা করলেন। সবাই এর প্রশংসা করলাম। পরে দেখা গেল তিনি ৫৭ জনকে নিয়ে উড়াল দিলেন। এর কোনো ব্যাখ্যা পেলাম না। গণভবনের আন্ডার গ্রাউন্ডে হাসিনার গোপন ভল্টে রক্ষিত হাজার কোটি টাকা ও ডলারের কি পরিণতি হল। তাও জানতে পারলাম না। এগুলো কিসের আলামত?
বাজারে ১ কেজি বা তার একটু বেশী ওজনের ইলিশ ১৮০০-২০০০ টাকার নিচে না মিললেও ভারতে ১২০০ টাকায় রপ্তানী করছে আমাদের অ-নেক স্বাদের সরকার। নিত্যপণ্যের উর্ধ্বগতির ফলে চরম অস্বস্তিতে দেশের সাধারণ মানুষ। ডিমের দাম হাসিনার আমলকেও হার মানিয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আহতদের চিকিৎসার খরচ যোগাতে সরকারকে বেশ হিসেবী মনে হলেও কতিপয় উপদেষ্টার চলাফেরায় গাড়ীর বহর দেখে মনে হয় ইউনুস সরকারের কোষাগারে টাকার কমতি নেই মোটেও। আর মাশাল্লাহ, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের স্বাস্থ্য-চেহারার উন্নতির কথা না-ই বা বললাম।
উত্তর বঙ্গ ও ময়মনসিংহে বন্যায় মানুষ মরছে। আকস্মিক এ বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে ফসল ও বসত-ভীটার। ত্রাণ ও খাবারের অভাবে হাহাকার চলছে। কিন্তু দেখার কেউ নেই। আমাদের কথিত মিডিয়াতেও এর কোনো ফোকাস নেই।
সম্প্রতি রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সেনাপ্রধান ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচন হওয়া উচিৎ মলে মন্তব্য করেছেন। পক্ষান্তরে ড. ইউনুস মার্কিন গণমাধ্যম এনপিআরকে বলেছেন, ‘সরকার নির্বাচনের যে তারিখ ঘোষণা করবে, সেটিই হবে চূড়ান্ত তারিখ’। সেনাপ্রধানের বক্তব্যকে দল-মত নির্বিশেষে দেশের সকল মানুষ স্বগত জানিয়েছেন। কিন্তু এ নিয়ে সরকার প্রধানের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে, তারা আরো বেশী সময় নিতে চান। যা মানুষের চলমান উদ্বেগ আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সংস্কার প্রসঙ্গে বলতে চাই, স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বহু কিছিমের সংস্কার জাতি প্রত্যক্ষ করেছে। সংস্কারের নামে অর্থ ও সময়ের অপচয় ছাড়া কোনো অর্জন কি আমাদের সামনে আছে? সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এই কাগুজে সংস্কার দিয়ে আমরা কি করব? যদি নেতা-নেত্রীদের চিন্তা-চরিত্রের সংস্কার না হয়। তার চেয়ে ভাল, আসুন আমরা মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি। হে দয়াময়, আপনি আমাদের মন ও মগজের সংস্কার দান করুন।
বাজারে গিয়ে স্ত্রীর দেয়া তালিকার অর্ধেক পণ্য কিনতেই পকেট খালি হয়ে যাচ্ছে। বাজারে গেলেই মাথা গরম আর বাসায় এসে বউ’র ধমকে মেজাজ গরম হচ্ছে মানুষের। ‘সুতরাং সংস্কার লইয়া আমরা কী করিব’?
প্রিয় পাঠক, আপনাদের স্মৃতিকে একটু নাড়া দেয়ার জন্য একটি ঘটনার উল্লেখ করে শেষ করব নিবন্ধটি। বাংলাদেশের সঙ্গে আকসা-জিসমিয়া ও আইপিএস চুক্তি করতে আমেরিকার তৎপরতার কথা নিশ্চয় আমাদের মনে আছে। ২০২৩ সালে মার্কিন প্রশাসনের যত শীর্ষ কর্মকর্তা বাংলাদেশে এসছেন। গত ৫০ বছরের ইতিহাসে তা দেখা য়ায়নি।
অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড লজিস্টিক এগ্রিমেন্ট (আকসা)। জেনারেল সিকিউরিটি অফ মিলিটারি ইনফরমেশন এগ্রিমেন্ট (জিসমিয়া) এবং আইপিএস বা ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি। নির্বচনকে টার্গেট করে এসব চুক্তি সইয়ে হাসিনার ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করে তারা। কিন্তু ভারতের সায় না থাকায় সময় ক্ষেপনের কৌশল নেয় হাসিনা। এজন্য নির্বচনের আগে গণতন্ত্র-মানবাধিকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে ভিসা নীতি প্রণয়নের আড়ালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মূলত সরকারকে বাধ্য করে চুক্তিগুলো সম্পন্ন করার প্রয়াস নিয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত হাসিনা নির্বাচনের পর চুক্তিসমূহ সই করারর প্রতিশ্রæতি দেন। এতে আশ্বস্ত হয় বাইডেন প্রশাসন। এর ফলে আমেরিকা নির্বাচন প্রশ্নে কার্যত দৃশ্যের অন্তরালে চলে যায়। ২৮ অক্টোবর বিএনপির ওপর চালানো হয় ইতিহাসের নৃশংসতম ক্র্যাকডাউন। হাসিনার পুত্র জয় হঠাৎ করেই ৬ দিনের জন্য বাংলাদেশে আসার সুযোগ পান।
বস্তুত পক্ষে বহুল আলোচিত চুক্তিসমূহে যেসব শর্তাদি রয়েছে, এতে করে আমেরিকার সুদূর প্রসারী ও বহুমুখী স্বার্থ থাকলেও বাংলাদেশের জন্য তা খুব দরকারি বলে মনে করি না। তাই আমি হাসিনাকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই চুক্তিসমূহের জন্য মার্কিনীরা যে অর্থ-সময় ইতোমধ্যে বিনিয়োগ করেছে। তার সুফল ঘরে না তুলে তারা বাংলাদেশের পিছু ছাড়বে বলে মনে হয় না। এজন্য তারা সম্ভাব্য সবকিছুই করবে। মনে হচ্ছে, এজেন্ডা বাস্তবায়নে তারা জনপ্রিয় বড় কোনো দলের ওপর অস্থা রেখে আর ঝুঁকি নিতে চায় না। ফলে আগামী নির্বাচনে বিকল্প কোনো শক্তিকে ক্ষমতায় আনতে এরইমধ্যে ভিন্ন কৌশলে সূক্ষ জাল বুনতে শুরু করেছে মার্কিনীরা।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ড.ইউনুস সরকার ঝুঁকিপূর্ণ এই খেলার অংশ হয়ে দেশকে আরেকটা বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবেন কী-না? তা সময়ই বলে দেবে। সুতরাং তখন আমাদের হেফাজতের জন্য কান্ডারীরুপে কে এগিয়ে আসতে পারেন? তা উপরের বর্ণনা থেকে বুঝে নিন। তবেই সার্থক আমার এ লেখার শিরোনাম।-লেখক: সাংবাদিক,ঢাকা।
ahabibhme@gmail.com