ব্রিকস-জি-২০ থেকে জাতিসংঘ অধিবেশন-এ তিনটি আন্তর্জাতিক ইভেন্ট ঘিরে মেঘ-সূর্যের মতো লুকোচুরি খেলায় বেশ সরগরম হয়ে ওঠেছিল দেশের রাজনীতি। এর রেশ এখনো চলছে এবং তা আরো কিছুদিন চলবে। সেলফীর কূট-রাজনীতি থেকে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বিস্ফোরক মন্তব্য। ২৭ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গোপন সাক্ষাত এবং ওবায়দুল কাদেরের তলে তলে সমঝোতার গল্প। সবখানেই আ.লীগ আত্মরক্ষা করার মরিয়া কৌশল বেছে নিলেও কার্যত তা ষোল আনাই ব্যর্থ হয়েছে। তাই সবার কণ্ঠে আবোল তাবোল। সব কিছু বন্ধ করে দেয়ার হুমকি। চলুন তবে দেখে নিই নেপথ্যের ঘটনা প্রবাহ:
১.প্রধানমন্ত্রীর একমাত্র ছেলে এবং আইটি বিষয়ক উপদেষ্টা সজিব ওয়াজেদ জয়ের আমেরিকায় বিপুল সম্পদ-বাড়ীঘর ও ব্যবসা বাণিজ্যের বিষয়টি এতদিন মিত-অমিতের মিশ্র চেহারায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত ছিল। যদিও বিদেশী কিছু গণমাধ্যমে এব্যাপারে টুকরো সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই ২২ সেপ্টেম্বর রাতে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে ছেলের সম্পদ-বাড়ীঘর ও ব্যবসা বাণিজ্যের বিষয়টি প্রকাশ করে বহুল চর্চিত জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটালেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমার ছেলেও যুক্তরাষ্ট্রে আছে। সে ব্যবসা-বাণিজ্য করছে, বিয়ে করেছে, তার মেয়ে আছে, সম্পত্তি আছে, বাড়িঘর আছে। যদি তার সম্পদ বাতিল করে, করবে। তাতে কিছু আসে যায় না।’(সূত্র: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ইত্তেফাক অনলাইন)।
জাতীয় নির্বাচন যখন অত্যাসন্ন তখন তিনি কেন এই বোমা ফাটালেন তা এখন বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। প্রকৃত পক্ষে কারো কোনো জিজ্ঞাসা ছাড়াই স্বপ্রণোদিত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর এমন সরল স্বীকারোক্তির পর থেকেই দলীয় নেতা-কর্মী, পুলিশ বাহিনী ও প্রশাসনের সর্বত্র দেখা দিয়েছে চরম অস্থাহীনতা-হতাশা। বেজে ওঠছে বিদায়ের সুর। সবাই বলাবলি করছে যে প্রধানমন্ত্রী নিজের ছেলেকেই রক্ষা করতে পারছেন না। তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ কী। সবাই বলছে, প্রধানমন্ত্রী নিজেই কেন সরকারের বিদায় ঘন্টা বাজালেন?
প্রশ্ন হচ্ছে, কলিজার টুকরা ছেলের সারা জীবনের অর্জিত সঞ্চয় আমেরিকান সরকার কেন বাজেয়াপ্ত করল? আমাদের প্রতাপশালী প্রধানমন্ত্রীই বা কেন বিনা বাক্যে ছেলের এত বড় ক্ষতি মেনে নিলেন? আমরা জানি যে পৃথিবীর অন্যতম আইনের শাসনের দেশ হচ্ছে আমেরিকা। আমাদের মতো কোনো ব্যক্তির ইচ্ছা অনিচ্ছার ওপর কিছুই নির্ভর করে না সেখানে। সম্পদ তো দূরের কথা আইনের বাইরে গিয়ে একজন গাড়ী চালক কিংবা মুদি দোকানদারের ১০ টাকা বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা বাইডেনের গোটা প্রশাসনের পক্ষেও সম্ভব নয়। কারণ সেখানে বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন। অন্যায় হলে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধেও যে কেউ মামলা করতে পারেন। তাহলে আমাদের প্রধানমন্ত্রী কিংবা তার বিজ্ঞানী ছেলে কেন আইনের আশ্রয় না নিয়ে বিপুল ধন-সম্পদ হাতছাড়া করছেন। এসব অর্থ-সম্পদ কি বৈধ নয়? এসবের পেছনে কি কোনো শ্রম-ঘাম ও কষ্ট নেই? নাকি আমেরিকা ছাড়া আর কোথাও নিরাপদ ভবিষ্যতের বন্দোবস্ত আছে?
২.জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৮তম অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন আমেরিকায় তখন ভিসানীতি প্রয়োগের ঘোষণার বিষয়টি দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য ণ্ডরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ভয়েস অব আমেরিকার সঙ্গে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমেরিকা আরও স্যাংশন দিতে পারে, এটা তাদের ইচ্ছা’। শেখ হাসিনা আরো বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি বাংলাদেশের বাইরে থেকে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করে, সে ক্ষেত্রে এই দেশের জনগণ ওই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে স্যাংশন (নিষেধাজ্ঞা) দেবে’। কে নিষেধাজ্ঞা দিল আর কে দিল না, তাতে কিছু যায় আসে না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তাদের নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন আছে। ভিসানীতির মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে টার্গেট করলে কিছু বলার নেই। কারও শক্তিতে বিশ্বাস করে ক্ষমতায় আসিনি। জনগণের ওপর নির্ভর করে ক্ষমতায় এসেছি এবং আছি।’ পাঠক কী বুঝলেন?
৩. প্রধানমন্ত্রী ও তার সহযোগীদের গত কয়েক দিনের আমলনামা দেখে মনে হচ্ছে আগামী কিছু দিনের মধ্যে হাসিনা সরকারের দিকে প্রবল বেগে ধেয়ে আসছে এক বিপজ্জনক ঘূর্ণিঝড় । দুর্নীতি এবং অর্থ পাচার সংক্রান্ত অভিযোগে কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলেই কুটনৈতিক সূত্রের খবর। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো না হলেও অন্যভাবে বাংলাদেশের ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবে লন্ডনে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসী সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এ কথা জানান তিনি। এছাড়াও বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বাধাদানকারীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার ১৫ এমপি। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ক্ষুণ্ন করার জন্য দায়ী ব্যক্তিরা যাতে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশ করতে না পারে তা নিশ্চিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবেনিজকে চিঠি লিখেছেন দেশটির এমপিরা। এতে তারা বাংলাদেশে চলমান মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। চিঠিতে বলা হয়, ‘আমরা বিশ্বাস করি যে- নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং অংশগ্রহণমূলক হওয়া অত্যন্ত ণ্ডরুত্বপূর্ণ। এমন অবস্থায় বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচন আয়োজনের প্রচেষ্টাকে সমর্থন দিতে যুক্তরাষ্ট্র একটি বিশেষ ভিসা নীতি ঘোষণা করেছে। এমন অবস্থায়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ক্ষুণ্ন করার জন্য দায়ী ব্যক্তিরা যাতে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশ করতে না পারে তা নিশ্চিত করার জন্য ম্যাগনিটস্কি নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে হোক বা অন্য কোনো উপায়ে হোক, যুক্তরাষ্ট্রের মতো আমাদেরও অনুরূপ নীতি প্রণয়ন করা অত্যাবশ্যক’।
৪.মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আলোচিত বৈঠকটি কেন সফল হয়নি? এ নিয়ে মানবজমিন আজ ওই বৈঠকের কিছু ণ্ডরুত্বপূর্ণ খবর প্রকাশ করেছে। এত বলা হয়েছে যে, গত ২৭শে সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে এ ণ্ডরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। জ্যাক সুলিভান একা নন, এফবিআই কর্মকর্তাসহ আরও তিন জন ছিলেন বৈঠকে। বৈঠকটি প্রথমে গোপন রাখা হয়। সাত দিন বাদে হোয়াইট হাউসের তরফে তা খোলাসা করে দেয়া হয়। নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কৌশলগত যোগাযোগ বিষয়ক সমন্বয়কারী জন কিরবি এ ধরনের একটা বৈঠকের কথা স্বীকার করেন। বলেন, বৈঠকে অনেক বিষয়েই আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে নির্বাচন অন্যতম। যদিও তিনি বিস্তারিত বলেননি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও শুক্রবার অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে বৈঠকের কথা স্বীকার করেন। বলেন, নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তলে তলে সমঝোতা হয়ে গেছে বলে মিডিয়ায় শোরগোল তোলেন। মানবজমিন আরো বলছে,বৈঠকের শুরুটা ছিল খুবই আন্তরিক। মাঝখানে একটি বিষয় নিয়ে আলোচনায় ছন্দপতন ঘটে। যাইহোক, চারটি বিষয় নিয়ে মূলত আলোচনা হয়েছে। এক. বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিরোধীরা বলছে, তারা নির্বাচনকালীন সরকার ছাড়া অংশ নেবে না। পরিস্থিতি ক্রমেই ঘোলাটে হচ্ছে। জ্যাক সুলিভান তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মনোভাব জানতে চান। তখন বলা হয়, নির্বাচনকালীন সরকার গঠনে তার সায় নেই। নির্বাচন হতে হবে সংবিধান অনুযায়ী। সংবিধানের বাইরে গিয়ে তার পক্ষে কিছুই করা সম্ভব নয়। দুই. কারারুদ্ধ বিরোধীনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবস্থা সংকটাপন্ন। তার দলসহ বিভিন্ন মহল থেকে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর দাবি তোলা হয়েছে। এ নিয়ে সরকারের অভিমত কি? এ ব্যাপারে জানানো হয়, তাকে নিয়ম ভেঙে উন্নত চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে উন্নতমানের হাসপাতালে সার্বক্ষণিক সেবা দেয়া হচ্ছে। সাধারণত কোনো সাজাপ্রাপ্ত বন্দিকে এ ধরনের সেবা দেয়া হয় না। তাকে বিদেশে পাঠানোর ব্যাপারে সরকারের অবস্থান আগেই জানিয়ে দেয়া হয়েছে। আলোচনার এক পর্যায়ে বলা হয়, যেহেতু বিষয়টি আবারো আলোচনায় এসেছে সেজন্য তিনি এটা ভেবে দেখবেন।
তিন. নোবেলজয়ী প্রফেসর ইউনূসের প্রসঙ্গ নিয়ে বেশকিছু সময় আলোচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের তরফে বলা হয়, তার বিরুদ্ধে এত মামলা- মোকদ্দমা কেন। তাকে কেন নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। বিশ্ব নেতারা তার পাশে দাঁড়িয়েছেন। এ ব্যাপারে এখনো তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। জ্যাক সুলিভান এতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তখন জানানো হয়, আইনের বাইরে তাকে কিছুই করা হচ্ছে না। নির্যাতন বা হয়রানির প্রশ্ন উঠছে কেন। জ্যাক সুলিভান যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। বলেন, প্রফেসর ইউনূস যাতে খালি খালি দমন-পীড়নের শিকার না হন সেটা নিশ্চিত দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। চার নম্বর বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। নানা কারণে আলোচনা অন্যদিকে মোড় নেয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র দাবি করেছে, আলোচনার সময় হঠাৎ করেই দরকষাকষি শব্দটি বেশ ণ্ডরুত্ব পায়। মার্কিন কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেই বলেন, তাদের পক্ষে এ নিয়ে কিছু করা সম্ভব নয়। আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে। এখানেই আলোচনা থেমে যায়। পাঠক বুঝলেনতো প্রধানমন্ত্রী ও তার সহযোগিরা কোন করণে আবোল তাবোল বকছে? লেখক: সাংবাদিক,ঢাকা।