আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের বিপরীতে শর্ত পূরণে পিছিয়ে আছে রাজস্ব আহরণ ও নিট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। এ দুই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাটি।সামষ্টিক অর্থনীতির বেশকিছু ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আগামী মুদ্রানীতিতে সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেয়া হবে। এসব সূচকের অগ্রগতি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) প্রতিনিধিদলকে অবহিত করা হয়েছে। গতকাল সফররত আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে এসব কথা বলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র নির্বাহী পরিচালক মেজবাউল হক। দিনব্যাপী বৈঠকে ঋণের নানা শর্ত পরিপালনের অগ্রগতি আইএমএফকে জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকাল পর্যন্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন আইএমএফ প্রতিনিধিরা। বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার, ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জামাল, আবু ফরহা মো. নাছের ও বিভিন্ন বিভাগের নির্বাহী পরিচালক, পরিচালক এবং টিম সদস্যরা অংশ নেন। বৈঠকে আর্থিক খাতের নীতি ও কাঠামো সংস্কারের যেসব উদ্যোগ গত জুলাই থেকে নেয়া হচ্ছে তার বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও ফলাফল তুলে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিশেষ করে ব্যাংকের পরিদর্শন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে ঝুঁকিভিত্তিক মূল্যায়ণ পদ্ধতি চালু করা, ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা আনা ইত্যাদি। উল্লেখ্য, আইএমএফের ঋণের প্রথম কিস্তি পাওয়ার পর বেশকিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ ও কিছু প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জ্বালানি তেল থেকে ভর্তুকি তুলে দিয়ে মূল্য বৃদ্ধি করা। ২য় দফায় জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়ে সে বিষয়ে পৃথকভাবে জানতে চেয়েছে আইএমএফ প্রতিনিধিদল। এবারের সফরের আলোচিত বিষয়ে মেজবাউল হক সাংবাদিকদের বলেন, ‘সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোর মধ্যে মুদ্রানীতিতে নেয়া বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা, জিডিপি প্রবৃদ্ধি, রাজস্ব আদায়, বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিময় হার কেমন, মূল্যস্ফীতি কেমন; তার পর্যালোচনা ও অ্যাচিভমেন্ট (অর্জন) নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অর্থনীতিতে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখা যাচ্ছে ও এটিকে অ্যাড্রেস (সমাধানে) করতে কি পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে তার ধারণা নিয়েছেন আইএমএফ প্রতিনিধিদল। তবে ঋণের সঙ্গে এই বৈঠকের কোনো সম্পর্ক নেই। সদস্য দেশগুলোর বিভিন্ন সূচকের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নিয়মিত ফলোআপের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সফরে এসেছে আইএমএফ প্রতিনিধিদল। তিনি জানান, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের একক রেট নির্ধারণে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে অনেকখানি অগ্রগতি হয়েছে। মুদ্রানীতিতে বাজারভিত্তিক সুদহারের বিষয়ে ঘোষণা থাকবে। সূত্র মতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপের মুখে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে আইএমএফের ঋণের আবেদন করে বাংলাদেশ গত বছর। ফেব্রুয়ারিতে ৪.৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের মধ্যে প্রথম কিস্তিতে ৪৭ কোটি ৬২ লাখ ডলার পাওয়ার আগে ও পরে বাংলাদেশ পরামর্শ অনুযায়ী বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি কমানোসহ আর্থিক খাতের কাঠামো ও নীতি সংস্কারে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে। সংস্থাটির কাছ থেকে ঋণ নিতে চুক্তির সময় বাংলাদেশ এসব বিষয়ে সংস্কারের বিষয়ে সম্মতি দিয়েছিল।
আগামী অক্টোবর মাসে দ্বিতীয় কিস্তি ছাড় ও অগ্রগতি মূল্যায়ণের জন্য আইএমএফ মিশন আসবে ঢাকায়। তার আগে নিয়মিত সফরের অংশ হিসেবে স্টাফ ভিজিটে এসেছে সংস্থার প্রতিনিধিদল। ১ম কিস্তির ঋণের অর্থের ব্যবহার ও ২য় ঋণের প্রাপ্তি নিয়ে এবারের সফরের সম্পর্ক বিষয়ে মেজবাউল হক বলেন, ‘তারা সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের অগ্রগতি নিয়ে খোঁজ–খবর নিয়েছে। রিজার্ভ, জিডিপি, মূল্যস্ফীতি, বিনিময় হার, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা নিয়ে সার্বিক আলোচনা হচ্ছে। শুধু ঋণকে আলাদা করে কোনো আলোচনা হয়নি। আমরা সামষ্ঠিক অর্থনীতির সব সূচক নিয়েই আলোচনা করছি। যার মধ্যে সবকিছু আছে; এর অগ্রগতি আমরা সবসময় আপনাদের সামনে তুলে ধরছি বলে জানান তিনি। পরবর্তী কিস্তি পেতে আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাবের ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেন, আমাদের নিজস্ব প্রয়োজনে কিছু রিফর্ম (সংস্কার) নিয়ে কাজ করছি। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার একাধিক রেট একটিতে নিয়ে আসা, সুদহার বাজারমুখী করা ও রিজার্ভ হিসাব আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে করার বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছি।
রিজার্ভ হিসাবে আমাদের গ্রস হিসাবটিও থাকবে। যেসব সিদ্ধান্তের কথা আমরা জানিয়েছি তার বিস্তারিত বর্ণনা ও বাস্তবায়ন কভীাবে হবে– তা জুলাই মাসের আগামী মুদ্রানীতিতে ঘোষণা থাকবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আইনে সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত থাকার কথাও জানান মেজবাউল হক। আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ হিসাব করলে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ঝুঁকি দেখছে না জানিয়ে মেজবাউল হক বলেন, এখনো আমরা রিজার্ভ নিয়ে কোনো ঝুঁকিতে নেই। সামনে বিশ্ব্যাংক, জাইকাসহ কয়েকটি সংস্থার ঋণ নিয়ে আলোচনা পাইপলাইনে রয়েছে। আকু পেমেন্ট ছাড়া আগামী জুনের মধ্যে আমাদের বড় কোনো দায় নেই। তাই এখনো কোনো সমস্যা দেখছি না। চাপে থাকা রিজার্ভ স্বস্তিদায়কে ফেরাতে আমদানিতে যে কড়াকড়ি করা হয়েছে– তা আগামীতেও অব্যাহত রাখা হবে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে মেজবাউল হক বলেন, আমরা আমদানিতে মার্জিন বাড়িয়েছি অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে। কোনো পণ্য আমদানিতে নিরুৎসাহিত করতে মার্জিন বাড়ানো হয়। আবার কমানো হয়। সবই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার অংশ। যখন যেটা প্রয়োজন হয় বাংলাদেশ ব্যাংক নিচ্ছে। এবারো সংস্থাটির বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, মন্ত্রী, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব অধিদপ্তর (এনবিআর) ও নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করবে আইএমএফ প্রতিনিধিদল।