আজ সোমবার, ২৭শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৪ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১০ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
আজ সোমবার, ২৭শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৪ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১০ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

প্রসঙ্গঃ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-ড.ইউনূস,বহুমুখী সংকটে হাসিনা সরকার

রাস্ট্রীয় ক্ষমতা এমন এক সুরক্ষা চাদর যে সেটা গায়ে থাকলে সবাই নিজেকে সুপার হিরো মনে করেন। গভীর সংকটে দাঁড়িয়েও একদম নির্ভার থাকেন এটা ভেবে যে কোনো শক্তিই তাকে পরাজিত করতে পারবে না। বরঞ্চ যারা তার দিকে হাত বাড়াবে তাদের ধ্বংস অনিবার্য। এ কথা বললে অক্ত্যুক্তি হবে না যে গত প্রায় দেড় দশকে দেশের রাজনীতিতে এমনই একটা সুপার হিরোইক আবহ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন আ.লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। দলীয় কর্মী-সমর্থক,পুলিশ,সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক’দিন আগে পর্যন্ত এমন ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে শেখ হাসিনা যা চান তাই করতে পারেন বিনা দ্বিধা ও বাধায়। যে ভাবে ইচ্ছা সে ভাবে নির্বাচন করতে পারেন। যাকে ইচ্ছা তাকে এমপি, চেয়ারম্যান- মেয়র- মেম্বার বানাতে পারেন। তাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো কোনো শক্তি নেই। বিএনপি তো নয়ই্। তার সরকার ইচ্ছামত গণমাধ্যম ও বিরোধী দলণ্ডলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। যাকে ইচ্ছা বন্দি করতে পারেন,কঠিন শাস্তি দিতে পারেন। দয়া হলে খুনিকেও মুক্তি দিতে পারেন। বিরোধীদের রাজপথে পিটিয়ে রক্তাক্ত করতে পারেন আবার তারকা হোটেলের খাবার ও ফলমূল খাওয়াতে পারেন। শিক্ষা,সততা,নৈতিকতা,সৌজন্যতা ও পারিবারিক ঐতিহ্য সমৃদ্ধতার যে কোনো মানদন্ডে দেশের সমসাময়িক রজনীতির ইতিহাসের অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব মীর্জা ফখরুল ইসলাম অলমগীরকেও (নজিরবিহীনভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মুখেও যার প্রশংসা শোনা যায়) শতাধিক মামলা দিতে পারেন। চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ৫০ লাখ টাকা অনুদান নিয়েছেন বলে ণ্ডজব ছড়াতে পারেন।

কৃচ্ছতা সাধনের জন্য পেঁয়াজ বিহীন তরকারী, বেণ্ডনীর বদলে কুমড়ানী খেতে এবং ভাত কম খাওয়ার জন্য জাতিকে উৎসাহিত করতে পারেন। মাংসের বিকল্প হিসেবে কাঁচা কাঠাল ও ডিম সেদ্ধ করে ফ্রিজিং করে খেতে এবং কাঁচা মরিচ ও পেঁয়াজ শুকিয়ে ব্যবহার করার পরামর্শ দিতে পারেন। দেশকে শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতায় আনার আনন্দে শত কোটি টাকায় আলোক উৎসব করার দু’মাসের মাথায় বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণে জাতিকে কুপি বাতি জ্বালানোর অভ্যাস করার অহবান জানাতে পারেন। সরকারে ভাষায় বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল বাংলাদেশের জনগণকে দুর্ভিক্ষের জন্য প্রস্তুত থাকজার আহবান জানাতে পারেন। গণজাগরণ মঞ্চের নামে দেশের অতি ণ্ডরুত্বপূর্ণ দু’টি হাসপাতাল সংলগ্ন শাহবাগ চত্বর অনির্দিষ্টকাল বন্ধ করে রাখতে পারেন। অন্যদিকে জন দুর্ভোগের দোহায় দিয়ে বিরোধীদের আন্দোলন এবং শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করতে নির্বিচারে ণ্ডলি চালিয়ে তাদের বশে আনতে পারেন।

হেফাজতের আমীরকে ‘তেতুল হুজুর ’বলে উপহাস করেও কওমী জননী উপাদি লাভ করতে পারেন। নিয়মিত কোরআন শরীফ পাঠ এবং তাহাজ্জুত নামাজ আদায় করেও তিনি অসংখ্য আলেমকে জেলে বন্দি করে রাখতে পারেন। দেশপ্রেমিক ও অত্যন্ত মেধাবী ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে বিডিআর বিদ্রোহের নামে নৃশংষতম উপায়ে হত্যা করলেও সেখানে যথা সময়ে সেনা অভিযান চালাতে সেনাবাহিনীকে বিরত রাখতে পারেন। ১০ হাজার টাকার জায়গায় ৫শ’ টাকার মাশুল ফিতে ভারতকে ট্রানজিট দিয়ে দিতে পারেন। দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে কয়েকণ্ডণ বেশী মূল্যে বিদ্যুৎ কিনতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অত্যন্ত ঘণিষ্ট বলে পরিচিত আদানি গ্রুপের সঙ্গে ২৫ বছরের অসম (যা পৃথিবীতে নজিরবিহীন) চুক্তি করতে পারেন। ভারতে আমাদের মহানবীকে অবমাননা করা হলেও তিনি প্রতিবাদ না করে নীরব থাকতে পারেন। ভারত ও কাশ্মীরে মুলিম জনগোষ্ঠীর ওপর বর্বরোচিত হামলা-অত্যাচার এবং সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক নিয়মিত বাংলাদেশীদের হত্যা করা হলেও তিনি একদম চুপচাপ থাকতে পারেন। দীর্ঘকাল ধরে ভারতকে যা দিয়েছেন তা কখনো ভুলতে পারবে না বলে গর্ব করতে পারেন। লাখ লাখ ডলার খরচায় রোবট সোফিয়াকে আনতে পারেন কিন্ত ডলার সংকটের কথা বলে অত্যাবশ্যাকীয় পণ্য এমনকি জীবন রক্ষাকারি ওষুধ এবং সার্জিক্যাল পণ্য আমদানিও বন্ধ রাখতে পারেন। চিহ্নিত খুনী ও অর্থ পাচারকারিদের তার সফর সঙ্গি করতে পারেন। অন্যদিকে ব্যাংকের এক একাউন্ট থেকে অন্য একাউন্টে ২ কোটি টাকা স্থানান্তরের হাস্যকর আভিযোগে দেশের অপরাজেয় নন্দিত নেত্রী ৭৮ বছরের বৃদ্ধা-অসুস্থ বীরাঙ্গণা খালেদা জিয়াকে বন্দি করে রাখতে পারেন।
দেশের বৃহত্তম জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বিএনপির শীর্ষ জনপ্রিয় নেতা ও সন্তান সম তারেক রহমানকে এবং দেশের একমাত্র নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ ড.মোহাম্মদ ইউনূসকে কুলাঙ্গার-সুদকোর বলে গালি দিতে পারেন। সমালোচনাকারী দেশের সুশীল সমাজ ও সিনিয়র নাগরিকদের গাধা ও চক্ষু রোগী বলে সংসদে দাঁড়িয়ে গালি দিতে পারেন। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি তুলার কারণে আমেরিকা তথা পশ্চিমাদের মানবাধিকার-নিবার্চন নিয়ে প্রশ্ন তুলে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করতে পারেন।

মুখে সর্বদা চেতনার বুলি আওড়ান অন্যদিকে রাজাকারের পরিবারে মেয়েকে এবং ছেলেকে বিদেশিনীর সঙ্গে বিয়ে দিতে পারেন। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল-জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি,স্বাধীনতার ঘোষক এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানকে পাকিস্তানের চর, খুনি এবং ৪শ’ টাকার মেজর বলে উপহাস করতে পারেন। ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে চরম বিতর্কিত ও ভোটার বিহীন নির্বাচন করেও জনগণ বার বার তার দলকে বিপুল ম্যান্ডেট দিয়েছে বলে গর্ব করতে পারেন। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক বলে প্রচার করতে পারেন। ব্রিকসে যোগ দিচ্ছেন বলে গগনবিদারি আওয়াজ তুলে সদলবলে দক্ষিন আফ্রিকায় সন্মেলনে গিয়ে এতে অর্ন্তভুক্ত হতে ব্যর্থ হওয়ার পর ব্রিকস সদস্য হওয়ার চিন্তা মাথায় ছিল না বলে সংবাদ সন্মেলন করতে পারেন। অর্থাৎ আমাদের প্রধানমন্ত্রী কোনো প্রতিক্রিয়ার কথা চিন্তা না করেই উনার যা ইচ্ছা তাই বলতে ও করতে পারেন।

তাহলে এবার চলুন আমাদের প্রধানমন্ত্রী কী পারেন না এর কিছু নমুনা আলোচনা করা যাক। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে থাকার কথা আমাদের প্রধানমন্ত্রী কল্পনাও করতে পারেন না। সম্প্রতি আ.লীগের বর্ধিত সভায় তিনি বলেছেন ‘ক্ষমতায় না থাকলে আ.লীগের করো পিঠের চামড়া থাকবে না’। সরকার পতনে বিরোধী দল ণ্ডলোর স্বতস্ফুর্ত আন্দোলনের মুখে সরকারী আমলাদের মনের আকাশে ভয়ের যে কালো মেঘ জমেছে তা কিছুতেই সরাতে পারছেন না আমাদের সর্ব পটিয়সী প্রধানমন্ত্রী। সম্প্রতি জনপ্রশাসন পদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ‘পদক পেয়েও আপনাদের মুখে হাসি নেই কেন। আমি কালো মুখ দেখতে চাই না। একটু আন্দোলন-সংগ্রাম দেখেই কেউ ভয় পাবেন না’। দেশের জনগণের প্রকৃত রায়ের প্রতিফলন ঘটতে পারে এমন একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের সাহস করতে পারছেন না আমাদের দুর্দান্ত সাহসী প্রধানমন্ত্রী। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে দক্ষিণ আফ্রিকা সফর সম্পর্কে অবহিত করতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন,‘বিগত কয়েকটি নির্বাচনে জনগণ ভালো পরিবেশে ভোট দিয়েছে, আগামীতেও ভালোভাবে ভোট দিতে পারবে’। ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের চরম বিতর্কিত নির্বাচনে প্রতিবেশী ভারতের অব্যাহত নগ্ন সমর্থন আসন্ন নির্বাচন পর্যন্ত ধরে রাখতে না পারাটা হাসিনা সরকারে জন্য সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। কারণ ভারত এবার পশ্চিমাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে প্রকাশ্যে অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলছে। ভারতের বর্তমান অবস্থান সত্বেও তাদের গোয়েন্দা সংস্থা হাসিনা সরকারকে টিকিয়ে রাখতে সর্বশক্তি দিয়ে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে বলে উচ্চ পর্যায়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। যদিও তাদের এ তৎপরতা বেশী দূর অগ্রসর হওয়ার মতো অবস্থা দেশে আর নেই।তবে মনে মনে তারা (ভারত) হাসিনা তথা আ.লীগকেই ক্ষমতায় দেখতে চাইবে এতে কোনো সন্দেহ থাকার কারণ নেই । কথিত আছে যে ভারতে যতদিন ভারত বিরোধী একটা সরকার প্রতিষ্ঠিত না হবে ততদিন পর্যন্ত তারা বিএনপিকে সমর্থন করবে না। কারণ খালেদার নেতৃত্বাধীন দু’বারের বিএনপি সরকারামলে ভারতের জন্য স্বাস্তিদায়ক কিছু করেছে এমন একটি উদাহারণও ভারতের সামনে নেই।

পক্ষান্তরে হাসিনা সরকার উদার হস্তে ভারতকে সবকিছু উজার করে দিচ্ছেন। এখানে স্মরণ করা যেতে পারে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বহুল আলোচিত সেই বক্তব্য। গত বছরের ১৯ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরের জে এম সেন হলে জন্মাষ্টমীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভারত সফরের প্রসঙ্গ টেনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘শেখ হাসিনা সরকারকে টিকিয়ে রাখতে ভারতকে অনুরোধ করেছি। শেখ হাসিনা আছেন বলে ভারতের যথেষ্ট মঙ্গল হচ্ছে। বর্ডারে অতিরিক্ত খরচ করতে হয় না। ২৮ লাখ লোক আমাদের দেশ থেকে প্রতি বছর ভারতে বেড়াতে যায়। ভারতের কয়েক লাখ লোক আমাদের দেশে কাজ করে’। তিনি আরো বলেন,‘আমাদের প্রতিবেশী দেশে কিছু মসজিদ পুড়েছে। আমরা কোনোভাবে সেটা প্রচার করতে দেইনি। এর কারণ হচ্ছে কিছু দুষ্টু লোক আছে, কিছু জঙ্গি আছে, যারা এটার বাহানায় আরো অপকর্ম করবে। আমরা এটা নিয়ন্ত্রণ করেছি। অনেকে আমাকে ভারতের দালাল বলে, কারণ অনেক কিছুই হয়, আমি স্ট্রং কোনো স্টেটমেন্ট দেই না’। (১৯ আগষ্ট ২০২২,দৈনিক ইত্তেফাক অনলাইন)

সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রী ড.রাজ্জাকের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের আ.লীগ প্রতিনিধি দলও ভারত সফরে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথারই প্রতিধ্বণি করেছেন বলে মনে হচ্ছে। পার্থক্য শুধু এটুকুই যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী যা প্রকাশ করেছেন আ.লীগ প্রতিনিধি দল তা করেন নি। কিন্তু লক্ষনীয় ব্যাপার হচ্ছে যে উদ্ভূত বিশ্ব পরিস্থিতিতে ভারত তার বর্তমান অবস্থান পরিবর্তন করেনি। এর বড় প্রমান হচ্ছে সম্প্রতি কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকাসহ কিছু গণমাধ্যমে বাংলাদেশ নিয়ে ওয়াশিংটনকে দিল্লীর কূটনৈতিক বার্তা সংক্রান্ত যে সংবাদ প্রচার করা হয়েছিল ভারতের পররাষ্ট্র সচিব তা স্রেফ ণ্ডজব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। যা হাসিনা সরকারের জন্য সম্পূর্ণরুপে অপ্রত্যাশিত একটি আঘাত।

অপরদিকে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মামলায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে লেখা ১শ’ ৬০ জন বিশ্বনেতার খোলা চিঠিটি হাসিনা সরকারের জন্য একটি আগ্রাসী টর্নেডোর মতো হাজির হয়েছে। যা সরকারের দেড় দশকের সাজানো বাগান তচনচ করে দিতে পারে। ১শ’ নোবেল পুরস্কার বিজয়ীসহ বিশ্বনেতারা বলেছেন যে, ‘সম্প্রতি বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতি যে হুমকি দেখেছি তাতে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আমরা বিশ্বাস করি যে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়া এবং নির্বাচনে প্রশাসন দেশের সব বড় দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়াটা অত্যন্ত ণ্ডরুত্বপূর্ণ। আগের দুটি জাতীয় নির্বাচনে বৈধতার অভাব ছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে মানবাধিকারের প্রতি যে হুমকি আমাদের উদ্বিগ্ন করে তা হলো- নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মামলা। আমরা উদ্বিগ্ন যে, সম্প্রতি তাকে টার্গেট করা হয়েছে। এটা ক্রমাগত বিচারিক হয়রানি বলেই আমাদের বিশ্বাস। আপনি অবিলম্বে অধ্যাপক ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে বর্তমান বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত করুন। আপনি জানেন যে, ‘কীভাবে সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য নেট কার্বন নিঃসরণ আন্তর্জাতিক অগ্রগতির জন্য একটি শক্তি হতে পারে’-এ নিয়ে প্রফেসর ড. ইউনূসের কাজ আমাদের সকলের জন্য অনুপ্রেরণামূলক’। চিঠির সমাপ্তি টানা হয়েছে এভাবে ‘আমরা আশা করি, আপনি এই আইনি সমস্যাণ্ডলোর সমাধান একটি সমীচীন, নিরপেক্ষ এবং ন্যায়সংগত পদ্ধতিতে নিশ্চিত করবেন। পাশাপাশি আসছে দিনে একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচন এবং সব ধরনের মানবাধিকারের প্রতি সম্মান (প্রদর্শন) নিশ্চিত করবেন। সামনের দিনণ্ডলোতে কীভাবে এই বিষয়ণ্ডলোর সমাধান করা হয় তা ঘনিষ্ঠভাবে নজরে রাখার জন্য আমরা বিশ্বের লাখ লাখ উদ্বিগ্ন নাগরিকদের শিবিরে যোগ দেবো’। উল্লেখ্য চিঠিতে ‘আগের দুটি জাতীয় নির্বাচনে বৈধতার অভাব ছিল’ বলে বিশ্বনেতারা কার্যত হাসিনা সরকারকে অবৈধ বলে তিরষ্কার করেছেন। অন্যদিকে,‘আমরা উদ্বিগ্ন যে, সম্প্রতি তাকে (ড. ইউনূসকে) টার্গেট করা হয়েছে। এটা ক্রমাগত বিচারিক হয়রানি বলেই আমাদের বিশ্বাস। আপনি অবিলম্বে অধ্যাপক ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে বর্তমান বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত করুন’। এ কথার মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে তারা হাসিনা সরকারের বিচার ব্যবস্থার প্রতি সরাসরি অনাস্থা জ্ঞাপন করেছেন। মানবাধিকার প্রশ্নে বিশ্বময় স্বীকৃত সকল মানবাধিকার সংগঠন,জাতিসঙ্গ, পশ্চিমা বিশ্ব দীর্ঘ সময় ধরে সরকারকে বারবার তাগিদ দিয়ে আসছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বনেতাদের এই চিঠির ভাষা এবং বিষয় বস্তু সরকারের জন্য দুর্দমনীয় আঘাত। এই আঘাত সামলে ওঠা হাসিনা সরকারের জন্য মোটেও সহজ হবে না।

উপরন্তু বিশ্বনেতাদের খোলা চিঠির আগ্রাসী টর্নেডোর পাশাপাশি হাসিনা সরকারের দিকে ধেয়ে আসছে আরেক সুপার সাইক্লোন। গণমাধ্যমে (ইংরেজী দৈনিক নিউএইজ,১৬আগষ্ট,২০২৩) প্রকাশিত খবরানুযায়ী আন্তর্জাতিক অপরাধ ও মানবাধিকার আইনজীবীদের লন্ডন-ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ গ্রুপ, দ্য ণ্ডয়ের্নিকা ৩৭, এক বিবৃতিতে বলেছে যে, তারা নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রসিকিউটরের কাছে প্রমাণ সংগ্রহ ও উপস্থাপনের জন্য বাংলাদেশে ণ্ডরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বেসামরিক জনগণকে লক্ষ্যবস্তুতে রাষ্ট্রের জড়িত থাকার বিষয়ে একটি ‘সমন্বিত উদ্যোগ’ শুরু করেছে। গত বারো মাস ধরে, ণ্ডয়ের্নিকা ৩৭, বাংলাদেশের সুশীল সমাজ এবং প্রবাসী সম্প্রদায়ের সাথে ডকুমেন্ট করার জন্য কাজ করছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ণ্ডরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে। এটি ২০১৪ সালে আইসিসির প্রসিকিউটরের কাছে জমা দেওয়া পূর্ববর্তী যোগাযোগের ভিত্তিতে তৈরি। ‘আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর থেকে সরকারি বিশেষ বাহিনী সম্পূর্ণ দায়মুক্তির মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ করে আসছে। উল্লেখ্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের একটি সদস্য রাষ্ট্র। ২০১০ সালের ২৩ মার্চ রোম চুক্তি স্বাক্ষর করে হাসিনা সরকার।

শেষ কথাঃতীব্র ডলার সংকট,দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির ফলে সরকারের প্রতি বেজায় ক্ষুব্ধ দেশের মানুষ ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘকাল ভোট দিতে না পারার ক্ষোভ। পাশাপাশি বিরোধী দলণ্ডলোর সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে ফুঁসে উঠছে সারা দেশ। একদিকে পশ্চিমা বিশ্ব ও সমস্ত মানবাধিকার সংগঠন অন্যদিকে ১৬০ বিশ্ব নেতা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত আর অবাধ ও সুষ্টু নির্বাচনের পক্ষে ভারতের স্পষ্ট অবস্থান। এ সকল ঘটনা কার্যত হাসিনা সরকারকে গভীর সংকটে ফেলে দিয়েছে। সরকার প্রধান এবং তার মন্ত্রীদের সাম্প্রতিক অসংলগ্ন-অকূটনৈতিক কথাবার্তা ও আচরণ  হাসিনা সরকারের বহুমুখী সংকটকে একদম খোলাসা করে দিয়েছে সকলের কাছে।

 

 

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin