আজ সোমবার, ২৭শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৪ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১০ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
আজ সোমবার, ২৭শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৪ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১০ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

চরিত্র বদলেছে ডেঙ্গুর,রোগীর তথ্য নিয়ে লুকোচুরি

দেশে প্রতিদিন কত সংখ্যক মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে, কতভাগ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে-এ সম্পর্কিত পূর্ণাঙ্গ তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে নেই। সারা দেশের বিভাগ, জেলা-উপজেলার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে কত রোগী চিকিৎসা নেন সে তথ্যও নেই। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত, মৃত্যু, সাধারণ শয্যা ও আইসিইউতে ভর্তির সংখ্যা নিয়ে লুকোচুরি করছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এ লুকোচুরির ফলে দেশজুড়ে ডেঙ্গু সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র উঠে আসছে না বলে মন্তব্য করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ৬২৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে। এ নিয়ে দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ১৯ হাজার (১৯,৪৫৪) ছাড়িয়েছে। এ সময়ের মধ্যে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। আর চলতি মৌসুমে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা শতকের ঘরে পৌঁছে গেছে। জুলাইয়ের ১৫ দিনে ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে ১১ হাজার ৪৭৬ জন ভর্তি হয়েছে ও ৫৩ জন মারা গেছে। অর্থাৎ দৈনিক গড়ে ৭৬৫ রোগী ভর্তি ও তিনজনের বেশি রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী-২৪ ঘণ্টায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতলে ১ হাজার ১৬৮ জন ভর্তি ও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে ৪৫৫ জন ভর্তি ও তিনজন মারা গেছেন। কিন্তু স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের ৬৩৮টি সরকারি হাসপাতালে ৬৬ হাজার ৫৬০টি শয্যা রয়েছে।

একইভাবে সরকারি নিবন্ধনভুক্ত ৫ হাজার ৫৭৭টি বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে ৯৪ হাজার ৩৯৮টি শয্যা রয়েছে। এসব হাসপাতালে প্রায় প্রতিদিনই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসা নিতে যাচ্ছে। কিন্তু ডেঙ্গু রোগীর তথ্য মিলছে শুধু সরকারি-বেসরকারি ৬৩টি হাসপাতালের। এর মধ্যে বেসরকারি হাসপাতাল ৩৩টি, সবই ঢাকায়। ঢাকার বাইরের বেসরকারি কোনো হাসপাতাল এ তালিকায় নেই। বাড়িতে চিকিৎসা নেওয়া রোগীরাও থাকছেন হিসাবের বাইরে। সারা দেশে দৈনিক মোট আক্রান্তের যে তথ্য সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে, তার চেয়ে কয়েকগুণ রোগী প্রতিদিন ঢাকার বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় ভর্তি হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্যবিদর জানান, মূলত ডেঙ্গু ও এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ঢাকতে ও সমালোচনা এড়াতে তথ্য গোপনের চেষ্টা চলছে। এতে ডেঙ্গু সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র উঠে আসছে না, অন্যদিকে অধিক সংক্রমিত এলাকা চিহ্নিত হচ্ছে না। সরকারের দপ্তর থেকে পূর্ণাঙ্গ তথ্য না পেলে সংকট আরও বাড়বে। সাধারণ মানুষের কাছে ভুল বার্তা যাবে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া চ্যালেঞ্জ হবে। জনস্বাস্থ্যে হুমকির মুখে পড়বে। ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ এতটাই ভয়াবহ যে খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী সতর্ক করে বলেছেন, গত বছরের চেয়ে ইতোমধ্যে পাঁচগুণ বেশি ডেঙ্গু রোগী বেড়েছে। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ রোগটির উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভিড় করছেন। এরপরও বাড়ি ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সব রোগীর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।

সারা দেশে ডেঙ্গু রোগীদের তথ্য সংগ্রহকারী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস (ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম) শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহাদাত হোসেন  জানান, সরকারি হাসপাতালের ডেঙ্গুর তথ্য আমাদের হাতে আসে। ঢাকার বাইরে বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য আসছে না। এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কোভিডের সময় একটি সিস্টেমের মধ্যদিয়ে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা, বয়স, লিঙ্গ পরিচয়, চিকিৎসাধীন হাসপাতাল, বসবাসের স্থান জানানো হতো। সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলো অনলাইনে ডাটা এন্টি করত অর্থাৎ আপডেট তথ্য দিত। যেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অধিদপ্তরের ড্যাশবোর্ডে আপলোড হতো।

অধিদপ্তরের কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল তথা রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা (সিডিসি) ডেথ রিভিউ বা মৃত্যুর তথ্য পর্যালোচনা করত। কিন্তু ডেঙ্গু রোগীদের তথ্য ম্যানুয়ালি তথ্য সংগ্রহ ও অ্যানালাইসিস করতে হয়। তথ্য সংগ্রহ শেষে একটি সংক্ষিপ্তসার দেওয়া হয়। সিডিসি তথ্য অ্যানাইলাইসিস করে। তবে নিয়মিত করা হয় না। সার্বিক তথ্য জানানোর জন্য আমরা চেষ্টা করছি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. রাশেদা সুলতানা যুগান্তরকে বলেন, সরকারি হাসপাতালের তথ্য দেওয়া হচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য আনার চেষ্টা করছি। এজন্য হাসপাতালগুলোতে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এখন ৩৩টি বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য জানানো হচ্ছে। আশা করছি শিগগিরই পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানানো সম্ভব হবে।

রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, চলমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি অন্যসব বছরের তুলনায় ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। এবার মৌসুমের আগেই সংক্রমণ শুরু হয়েছে। দিন দিন প্রকোপ ভয়াবহ হচ্ছে। এখনই এটিকে জরুরি জাতীয় জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণা করে কোভিড মোকাবিলার মতো ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। প্রতিদিন ডেঙ্গুতে কত সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত, কোথায় ভর্তি ও মৃত্যু হলো। রোগের উপসর্গ কোন ধরনের ছিল। তাদের কি চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর কারণ, বয়স, লিঙ্গ পরিচয় ও পেশা সব জানাতে হবে। এতে করে সাধারণ মানুষ, গণমাধ্যম, স্বাস্থ্যকর্মী, নীতি-নির্ধারক, সিটি করপোরেশন, গবেষক ও সরকার বিস্তারিত তথ্য জানতে পারবে। ডেঙ্গু ও মশক ব্যবস্থাপনায় সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক হবে।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, শুধু স্বাস্থ্য বিভাগই নয়, ডেঙ্গুর বিস্তার, দৈনিক আক্রান্ত এবং মৃত্যুর ঘটনার পরও এ নিয়ে সিটি করপোরেশনের তেমন কোনো উদ্বেগ নেই। তারা বলেন, ডেঙ্গুর চরিত্র বদলেছে। ডেঙ্গুর বিভিন্ন ধরনে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। আগে যেখানে সাধারণত দিনে ডেঙ্গুর আক্রমণ ছিল, এখন রাতেও কামড়ায়। কিন্তু সিটি করপোরেশন আগের মতো কিছু কিছু এলাকায় একই ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিধনের যে চেষ্টা করছে তা এক ধরনের তামাশা।

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin