ভোটের পর এক বা একাধিক কেন্দ্রের ফল বাতিল করা গেলেও পুরো আসনের ফল বাতিল করতে পারবে না নির্বাচন কমিশন। জাতীয় সংসদ নির্বাচন সংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের খসড়ায় এই বিধান রাখা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার খসড়াটি অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এমন সিদ্ধান্তের পর নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচন কমিশনের পুরো নির্বাচন বাতিলের ক্ষমতা আগে থেকেই ছিল। নতুন করে কেন এ বিষয়টি সামনে এনেছে তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ক্ষমতাসীন দলের ইচ্ছায়ই করা হয়ে থাকতে পারে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে কিছু সংশোধনী প্রস্তাব গত বছর আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। গত ২৮শে মার্চ মন্ত্রিসভার বৈঠকে আরপিও’র সংশোধনের বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। তখন সিদ্ধান্ত হয়েছিল, খসড়ায় আরও কিছু সংশোধন, মতামতসহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আবারো মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। পরে খসড়া আবারো কিছুটা সংশোধন করে বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়।
জাতীয় নির্বাচন সংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯১(এ) ধারায় বলা আছে, নির্বাচন কমিশন যদি সন্তুষ্ট হয় যে, নির্বাচনে বলপ্রয়োগ, ভীতি প্রদর্শন এবং চাপ সৃষ্টিসহ বিভিন্ন বিরাজমান অপকর্মের কারণে যুক্তিযুক্ত, ন্যায়সঙ্গত এবং আইনানুগভাবে নির্বাচন পরিচালনা নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে না, তাহলে যেকোনো ভোটকেন্দ্র বা ক্ষেত্রমতো সম্পূর্ণ নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচনের যেকোনো পর্যায়ে ভোট গ্রহণসহ নির্বাচনী কার্যক্রম বন্ধ করতে পারবে।
তবে রিটার্নিং কর্মকর্তা ফলাফল ঘোষণা করার পর ইসি ওই ফলাফল স্থগিত বা বাতিল করতে পারে কিনা, তা নিয়ে মতদ্বৈধতা আছে। ইসি সূত্র জানায়, বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য এই বিধানের সঙ্গে আরেকটি উপধারা যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছিল ইসি। তারা প্রস্তাবে বলেছিল, কোনো অনিয়ম, ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ এলে নির্বাচন কমিশন কোনো ভোটকেন্দ্র বা পুরো আসনের ভোটের ফলাফল স্থগিত করতে পারবে। এরপর অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে কোনো কেন্দ্র বা পুরো আসনের ভোট বাতিল করে নতুন করে নির্বাচন করতে পারবে।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, নির্বাচনে কোনো অনিয়ম, ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ এলে পুরো আসনের ফল বাতিলের ক্ষমতা ইসির আগে থেকেই ছিল। তারা আগ বাড়িয়ে এই ক্ষমতা কেনো চাইতে গেল আমি বুঝলাম না। ইসির পুরো নির্বাচন বাতিলের ক্ষমতা ছিল বলেই তো গাইবান্ধা নির্বাচন বন্ধ করতে পেরেছিল। আগের আইনই যথেষ্ট ছিল। ইসির যতটুকু ক্ষমতা ছিল এখন সেটিও বন্ধ হয়ে গেল। যেই আইন আগে থেকেই ছিল সেটি নতুন করে চাইতে গিয়ে ইসিকে সীমাবদ্ধতার মধ্যে ফেলে দিলো।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, মন্ত্রিসভায় তারা যে প্রস্তাব করেছে তা সঙ্গত হয়নি। কারণ, নির্বাচন কমিশনের এই ক্ষমতা ইতিমধ্যেই আছে। এটা তারা জানে না। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, নতুন করে ক্ষমতা চেয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষমতা খর্ব করার প্রচেষ্টা হতে পারে। আদালতের রায় আছে, নির্বাচনের সময় অনিয়ম, কারচুপি হলে বা নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে নির্বাচন কমিশন সত্যতা নিরূপণ করে নির্বাচন বাতিল করতে পারবে এবং পুনরায় নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে পারবে। এখানে কোনো সেন্টার বা কেন্দ্রের বিষয়ে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়নি। ফলে যেখানে প্রয়োজন মনে করবে সেখানেই সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে। এ ছাড়া সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশন আইনের বিধিবিধানও সংযোজন করতে পারে উচ্চ আদালতের রায় আছে বলেও জানান তিনি।
আরপিও সংশোধনের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার বেগম রাশেদা সুলতানা বলেন, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত আমরা কিছু জানতে পারিনি। পত্র-পত্রিকায় বিষয়টি দেখেছি। তিনি বলেন, আমরা যে সংশোধন চেয়েছিলাম সেটি হচ্ছে, নির্বাচনের সময় রিটার্নিং কর্মকর্তা ফলাফল ঘোষণা করার পর এবং গেজেট নটিফিকেশনের আগে অনিয়মের কারণে ইসি ওই ফলাফল স্থগিত বা বাতিল করতে পারে কিনা সেই বিষয়টি আরপিওতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। আমরা এই জায়গাটিতে স্পষ্ট হতে চেয়েছিলাম। আমরা পুরো আসন বন্ধ করার বিষয়ে আরপিও সংশোধন প্রস্তাবে কিছুই উল্লেখ করিনি। তিনি বলেন, অনেক সময় রিটার্নিং কর্মকর্তা ফলাফল ঘোষণা করার পর এবং গেজেট প্রকাশের আগ মুহূর্তে ইসির কাছে অনিয়মের অভিযোগ আসে। কিন্তু এই সময়ে অনিয়ম হলেও ইসি কিছু করতে পারতো না। এটা তাহলে কেমন হয়ে গেল না? এজন্য আমরা চেয়েছিলাম গেজেট নটিফিকেশনের আগে নির্বাচনে অনিয়মের কোনো অভিযোগ যদি আসে তাহলে সেটি তদন্ত করে দেখতে। তদন্তে অনিয়ম ধরা পড়লে সেই কেন্দ্রের নির্বাচন বাতিল করে নতুন নির্বাচনের ক্ষমতা চেয়েছিল নির্বাচন কমিশন। গাইবান্ধা নির্বাচন চলাকালীন সময়ে পুরো নির্বাচন বন্ধ করা হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, এটি অন্য জিনিস। ৯১ আমরা একটা নতুন সংযোজন চাচ্ছিলাম।