একটি ভিডিও ফুটেজ। দুই মিনিট তেইশ সেকেন্ডের এই ভিডিও ফুটেজ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এ নিয়ে এখন নানা প্রশ্ন সর্বত্র। আসলে সেদিন কী ঘটেছিল জেসমিনের সঙ্গে। দুই মাস আগের ঘটনা। নওগাঁয় ভূমি অফিসের কর্মচারী সুলতানা জেসমিনকে আটক, নির্যাতনের অভিযোগ ও মৃত্যু নিয়ে দেশজুড়ে শুরু হয় নানা আলোচনা। জেসমিনের পরিবার থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল র্যাব হেফাজতে নির্যাতনে তার মৃত্যু হয়েছে। সম্প্রতি বেসরকারি একটি টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে র্যাব কার্যালয় থেকে সাদা মাইক্রোবাসে করে গুরুতর অসুস্থ জেসমিনকে হাসপাতালে নেয়া হয়। র্যাব সদস্যরা টেনে হাসপাতালের ভেতরে জেসমিনকে নিয়ে যায় এবং দীর্ঘক্ষণ অসুস্থ অবস্থায় জেসমিনকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। সিসিটিভির এই ভিডিও ফুটেজ প্রচার হওয়ার পর ফের আলোচনায় আসে জেসমিনের মৃত্যুর বিষয়টি।
গত ২২শে মার্চ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নওগাঁ শহরের মুক্তির মোড় থেকে নওগাঁর একটি ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ের অফিস সহকারী সুলতানা জেসমিনকে আটক করে র্যাব।
২৪শে মার্চ সকালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, কালো গ্লাসযুক্ত একটি সাদা মাইক্রোবাস এসে হাসপাতালের সামনে থামে। মাইক্রোবাসের দরজা খোলার পর এক নারী র্যাব সদস্য গাড়ি থেকে প্রথমে নামেন। তার সঙ্গে হলুদ গেঞ্জি, আকাশি এবং অ্যাশ রঙের পোশাক পরা তিন ব্যক্তি গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ান। এরপর নেভি ব্লু শার্ট পরা আরেক ব্যক্তি নামেন। নারী র্যাব সদস্য মাইক্রোবাসের ভেতর থেকে জেসমিনের বাম হাত ধরে বাইরে বের করে নিয়ে আসেন। তখন জেসমিনের পরনে হলুদ প্রিন্টের একটি থ্রিপিস ও কাঁঠালি রঙের সোয়েটার ছিল।
এ সময় জেসমিন বাম পাশে থাকা নারী র্যাব সদস্যের গায়ে ঢলে পড়েন। দুই নারী র্যাব সদস্য অনেকটা টেনে তাকে হাসপাতালের ভেতরে নিয়ে যান। এ সময় জেসমিন ঠিকভাবে হাঁটতে পারছিলেন না। তার পায়ের জুতা ছেঁচড়ে হাঁটার চেষ্টা করেন। হাসপাতালের ভেতরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি স্টিলের চেয়ারে ঢলে পড়ে যান জেসমিন। র্যাব-এর দুই নারী সদস্য এবং হলুদ, আকাশি রঙের শার্ট পরা দুই ব্যক্তি জেসমিনের সঙ্গে ছিলেন। পুরোটা সময় জেসমিনকে অচেতন অবস্থায় চেয়ারে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। মাঝে জেসমিনকে বাম হাত তুলে একবার তার কপালে হাত রাখতে দেখা গেছে। এভাবে অনেকক্ষণ থাকার পর নীল, হলুদ, কালো এবং লাল গেঞ্জি ও শার্ট পরা ৫ জন ব্যক্তি একটি ট্রলি নিয়ে উপস্থিত হন। এ সময়ও জেসমিনের বাম হাত ধরে টেনে তুলছিলেন র্যাবের দুই নারী সদস্য। জেসমিন ট্রলিতে উঠতে গিয়ে দাঁড়াতে না পেরে ট্রলিতে ঢলে পড়েন। র্যাবের দুই নারী সদস্য তাকে পুনরায় টেনে দাঁড় করিয়ে ট্রলিতে শুইয়ে হাসপাতালের ভেতরে নিয়ে যান। ট্রলির সঙ্গে পুলিশ, র্যাবের পোশাক পরা তিন সদস্য ও নারী-শিশুসহ প্রায় ১১ জন ছিলেন। এদিকে সেদিন জেসমিনকে আটকের পর প্রায় দেড় ঘণ্টা র্যাব সদস্যরা তার মোবাইল ফোন থেকে টাকা আদায়ের প্রমাণ ও এ সংক্রান্ত নথি সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত ছিলেন বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন মানবজমিনকে বলেন, এটা অনেক পুরনো এবং দীর্ঘ একটি ভিডিও। তদন্তের জন্য ভিডিও ফুটেজটি আমরা হাসপাতাল থেকে তখনই সংগ্রহ করি। সম্প্রতি একটি টেলিভিশন চ্যানেলে ভিডিওটি টেনেটুনে খুবই সংক্ষিপ্ত করে দেখানো হয়েছে। ভিডিওটি আমাদের কাছে কোনোভাবে অস্বাভাবিক মনে হয়নি। ভিডিওতে দেখা গেছে জেসমিন স্বাভাবিকভাবে নিজেই হেঁটে হাসপাতালে প্রবেশ করেছেন। র্যাবের নারী সদস্যরা জেসমিনকে কাঁধ থেকে মাথা সরানো এবং টেনেহিঁচড়ে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছেন এটা কতোটা মানবিক জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, এটা একেকজনের দেখার দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে।
এটা একটি নরমাল ভিডিও ফুটেজ। সম্পূর্ণ ভিডিওটা না দেখিয়ে টেনে দেখানো হয়েছে। জেসমিনের সঙ্গে র্যাবের নারী সদস্যরা ছিলেন। ডাক্তার দেখানোর পর সময়টা ছিল বিকাল ৪-৫টা। তিনি বলেন, জেসমিন ভয় পেয়ে হোক আর যেভাবেই হোক তিনি কিছুটা অসুস্থ ছিলেন বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের চিকিৎসক। বমি করেছিলেন। তিনি যদি ততটাই অসুস্থ বা সিরিয়াস অবস্থায় থাকতেন তাহলে চিকিৎসকরা ভর্তি রাখতেন। জেসমিনের মৃত্যুর বিষয়টি উচ্চ আদালতে তদন্তাধীন। একজন সচিব এটার তদন্ত করছেন। তদন্তাধীন বিষয় নিয়ে মন্তব্য করার সুযোগ নেই। আল মঈন বলেন, ভিডিও ফুটেজ এটাই প্রমাণ করে, জেসমিন নিজে হেঁটে হাসপাতালে গেছেন। আমাদের নারী সদস্যরা তাকে স্বাভাবিকভাবে ধরে নিয়ে হাসপাতালে গেছে। ব্যক্তিগতভাবে ভিডিওতে অমানবিক কিছুই দেখছি না বলে জানিয়েছেন এই র্যাব কর্মকর্তা।