দীর্ঘ রাজনৈতিক-আইনী বিতর্ক আর মামলার জটিলতা কাটিয়ে শীঘ্রই রাজনীতির মাঠে দেখা মিলতে পারে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার। সেতু মন্ত্রী ও আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং আইন মন্ত্রী আনিসুল হকের কথায় এমনই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। রোববার ঢাকায় জুডিশিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (জেএটিআই) আয়োজিত নবনিযুক্ত সহকারী জজদের ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের আইনমন্ত্রী বলেন,“বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া রাজনীতি করতে পারবেন না_তাঁর মুক্তির সময় এমন কোনো শর্ত ছিল না, তিনি মুক্ত-স্বাধীন। তিনি রাজনীতি করবেন কী করবেন না, এটা সম্পুর্ণ তার ব্যক্তিগত ব্যাপার।” অন্যদিকে রাজনীতিতে সম্প্রীতির সেতু নির্মাণ আবশ্যক হয়ে ওঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন সেতু মন্ত্রী ও আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। শনিবার সকালে গাজীপুরের কালীগঞ্জে ‘বাংলাদেশ অভিনয় শিল্পী সংঘ’ আয়োজিত সাধারণ সভা সম্মিলন অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আমরা (পদ্মাসেতু নির্মাণ) করেছি। কিন্তু রাজনীতি… পলিটিঙ্ ইজ সো ডিভাইডেড, সো পোলারাইজড। রাজনীতিতে সেতু নির্মাণ অনেক চ্যালেঞ্জিং। কবে যে হবে, তা আমি জানি না। এখানে ব্রিজ নির্মাণ করতে পারছি না, শুধু দেয়াল উঠছে। আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কের যে দেয়াল উঁচু থেকে উঁচুতে যাচ্ছে। সেতু আমরা নির্মাণ করতে পারছি না। এ দেয়াল ভেঙে সম্প্রীতির সেতু তৈরি করতে হবে।’ এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আমেরিকা তথা বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী ও দাতাদের চাপের মুখে পড়ে সরকার দেখাতে চাইছে যে সকলের অংশগ্রহণে আগামী জাতীয় নির্বাচন করার ব্যাপারে হাসিনা সরকার খুবই আন্তরিক। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে আসুক সরকার এটাই চায়। তবে এটাকে বহির্শক্তির চাপ হ্রাসে সরকারের একটি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেও দেখছেন অনেকে।
সম্প্রতি পশ্চিমা কূটনীতিকদের নানামুখী তৎপরতা এবং কয়েক দফায় আমেরিকার উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তরা বাংলাদেশ সফরের পরপরই দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে খানিকটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের কাউন্সেলর ডেরেক শোলের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে আগামী নির্বাচন অবাধ,নিরপেক্ষ,অংশগ্রহণমুলক এবং মানবাধিকার, আইনের শাসন ও নাগরিক সমাজের বাক স্বাধীনতার ওপর ণ্ডরুত্বারোপ করা হয়। পরে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা আরো বলা হয় যে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র দুর্বল হলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সীমিত হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এন্থনি জে ব্লিঙ্কেনের উপদেষ্টা ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের কাউন্সিলর ডেরেক এইচ শোলে। ঢাকা সফর করে যাওয়া মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত শোলে খোলাসা করেই বলেন, কোথাও গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়লে, যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। এর মানে এই নয় যে আমরা সহযোগিতা করবো না, আমাদের সম্পর্ক অর্থবহ হবে না। কিন্তু ব্যবসায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এটি সীমিত হওয়ার কারণ হবে! গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার আগাম অঙ্গীকার তথা রূপরেখা না দেয়ায় প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের গণতন্ত্র সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো সম্ভব হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, তবে ওই সম্মেলনে যোগদানের পূর্ব শর্ত হিসেবে নির্দিষ্ট ফরমেটে আগামীর গণতন্ত্র চর্চা বিষয়ক পরিকল্পনা জমা দিলে তাতে বাংলাদেশ অংশ নিতে পারবে।
এছাড়া বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের নামিদামি ব্র্যান্ডের নকল তৈরি পোশাক পাঠানোর অভিযোগ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এতে বাংলাদেশের একক বৃহত্তম বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রের মার্কেটে নজরদারিতে পড়েছে বাংলাদেশের পোশাক পণ্য। যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক বাণিজ্য কর্তৃপক্ষ ইউনাইটেড স্টেটস ট্রেড রিপ্রেজেনটেটিভ (ইউএসটিআর) ১০ই ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের দূতাবাসের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দেশটিতে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের নামে নকল তৈরি পোশাক রপ্তানির অভিযোগ করেছে। চিঠিতে ১৩ই ফেব্রুয়ারির মধ্যে অভিযোগের জবাব দিতে বলা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে নেয়া উদ্যোগের বিষয়ে ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য সময় চাওয়া হয়েছে ইউএসটিআরের কাছে। চলতি মাসের মধ্যে অভিযোগের জবাব দেবে বলে যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করেছে বাংলাদেশ। এই নকলের দায়ে শাস্তির খড়গ নেমে আসতে পারে, এমন আশঙ্কা করছেন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক উদ্যোক্তারা। এ ঘটনায় রপ্তানিকারকদের পাশাপাশি অর্থনীতিবিদরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। দূতাবাসের মাধ্যমে পাঠানো চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নকল পণ্য সরবরাহের অভিযোগ করেছে আমেরিকান অ্যাপারেল অ্যান্ড ফুটওয়্যার এসোসিয়েশন (এএএফএ) এবং প্যারিসভিত্তিক ইউনিয়ন ডেস ফেব্রিকস (ইউনিফ্যাব)। অভিযোগে এএএফএ বলেছে, তৈরি পোশাক সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশ ণ্ডরুত্বপূর্ণ উৎস হওয়ার পরও মেধাস্বত্ব রক্ষায় প্রতিষ্ঠিত নীতিমালার অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
এ ছাড়া উচ্চ পর্যায়ে চরম দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশ থেকে অব্যাহত হারে নকল পণ্যের বৈশ্বিক বিস্তার ও উৎপাদন বাড়ছে। চিঠিতে উল্লেখ্য করা হয়েছে, তাদের দেশের ক্রেতাদের দেয়া ক্রয়াদেশে তৈরি বিভিন্ন ডিজাইনের পোশাক হুবহু নকল করে ভিন্ন দেশ ও ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেছেন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা, যা মেধাস্বত্ব আইনের পরিপন্থি। গত বছরের জানুয়ারিতে ওই অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরে (ইউএসটিআর) জমা দেয় সংগঠন দুটি। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পর্যালোচনা শুরুর বিষয়টি বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছে ইউএসটিআর। এএএফএ-এর অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে বাংলাদেশে প্রস্তুত করা ৫৬টি নকল পণ্যের চালান জব্দ করা হয়েছে, ২০২১ সালের চেয়ে যা ৫০ শতাংশ বেশি। উল্লেখ্য যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি থেকে প্রতি মাসে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করছে বাংলাদেশ। যা আইএমএফ থেকে প্রাপ্ত ঋণের সমান। এখন যদি পোশাকে নিষেধাঙ্গা আসে তবে মহা বিপর্যয় নেমে আসবে দেশের অর্থনীতি ও পোশাক খাতে। অপরদিকে বাংলাদেশে গণমাধ্যম কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে, তা মনিটর করবে ঢাকাস্থ বন্ধু এবং উন্নয়ন সহযোগী ৯ দেশ। যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, কানাডা, ডেনমার্ক, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, সুইডেন, সুইজারল্যান্ডের সিনিয়র কূটনীতিকরা এ নিয়ে নিয়মিত পর্যালোচনা বৈঠক করবেন। বৃহস্পতিবার ওই দেশের প্রতিনিধিদের এক সমন্বয় সভা থেকে এ ঘোষণা আসে। মার্কিন দূতাবাসের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মিডিয়া ফ্রিডম কোয়ালিশন (এমএফসি) নামের বৈশ্বিক জোটের সদস্য ওই ৯ দেশের কূটনীতিকরা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনায় বসেছিলেন বৃহস্পতিবার। মার্কিন দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অফ মিশন হেলেন লা-ফেইভ ঢাকায় এমএফসির কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক উদ্যোগ চালু করার জন্য এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সমর্থনের জন্য উপস্থিত প্রতিনিধিদের ধন্যবাদ জানান। সুশীল সমাজের সদস্য ও সাংবাদিকরা ঢাকার উদ্বোধনী বৈঠকে উপস্থিত হয়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সম্পর্কিত তাদের কাজের বর্ণনা দেন। উপস্থিত প্রতিনিধিরা মিডিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি, অনলাইন নিউজ পোর্টালের সেন্সরিং এবং সাংবাদিকদের হয়রানি ও ভয় দেখানোর সাম্প্রতিক ঘটনাসহ বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সম্পর্কিত উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করেন। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এমএফসি বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সমর্থন করার জন্য মিডিয়া, সুশীল সমাজ, সরকার এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে এখন থেকে বিষয়ণ্ডলো নিয়ে নিয়মিত আলোচনায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বৃহস্পতিবার ওবায়দুল কাদের রাজধানীর ণ্ডলশানে ইইউভুক্ত ৭ দেশের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেখতে চায়। তারা চায় আগামী নির্বাচনে বিএনপিসহ সব দল অংশগ্রহণ করবে।’
এসব ঘটনা প্রবাহ রাজনৈতিক দৃশ্যপট পরিবর্তনের পূর্বাভাস বলেই মনে করা হচ্ছে। স্মরণ করা যেতে পারে যে, ১/১১ এর পূর্বে বিএনপি সরকারামলেও কূটনীতিকদের লক্ষনীয় তৎপরতা ছিল। তবে তা এখনকার মতো এতটা তীব্র ও বহুমুখী ছিল না।