দেশের ২২তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে বঙ্গভবনে যাচ্ছেন সাবেক দুদক কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন (চুপ্পু)। এক সময়ে জেলা জজের দায়িত্ব পালন করা সাহাবুদ্দিন ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ ও পরে যুবলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। সরকারি দায়িত্ব থেকে অবসর নেয়ার পর তিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদে ফেরেন। গতকাল তার পক্ষে নির্বাচন কমিশনে দুটি মনোনয়নপত্র জমা দেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ নেতারা। এ সময় সাহাবুদ্দিন চুপ্পু নিজেও উপস্থিত ছিলেন। মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষদিনে আর কোনো প্রার্থী না থাকায় বাছাই শেষে আজ তাকে নির্বাচিত ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন। ১৯৪৯ সালে পাবনা শহরের জুবিলি ট্যাঙ্কপাড়ায় জন্মগ্রহণ করা সাহাবুদ্দিনের ছেলেবেলা কেটেছে পাবনা শহরে। শহরের পূর্বতন গান্ধী বালিকা বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে রাধানগর মজুমদার একাডেমিতে ভর্তি হন চতুর্থ শ্রেণিতে। সেখান থেকে ১৯৬৬ সালে এসএসসি পাসের পর পাবনার এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হন। সেখানে জড়িয়ে পড়েন ছাত্রলীগে। এডওয়ার্ড কলেজ থেকে ১৯৬৮ সালে এইচএসসি ও ১৯৭১ সালে বিএসসি পাস করেন মো. সাহাবুদ্দিন।পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৪ সালে মনোবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর এবং পাবনা শহীদ এডভোকেট আমিনুদ্দিন আইন কলেজ থেকে ১৯৭৫ সালে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রলীগে যুক্ত হওয়ার পর এডওয়ার্ড কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক, অবিভক্ত পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি থেকে ৬ বছর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। ১৯৭১ সালে পাবনা জেলার স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের পদে থাকা সাহাবুদ্দিন চুপ্পু মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ছাত্রলীগের সক্রিয় কাজের ধারাবাহিকতায় ১৯৭৪ সালে পাবনা জেলা যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পান।
১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠিত হলে তিনি পাবনা জেলা কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মনোনীত হন। ১৫ই আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। কারামুক্তির পর পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পান তিনি। শুরুর দিকে পাবনা জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য ছিলেন সাহাবুদ্দিন। ১৯৮২ সালে বিসিএস (বিচার) পরীক্ষা দিয়ে বিচারক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৯৫ ও ১৯৯৬ সালে পরপর দুইবার বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস এসোসিয়েশনের মহাসচিব নির্বাচিত হন তিনি। বিচারালয়ে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন শেষে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে ২০০৬ সালে অবসরে যান মো. সাহাবুদ্দিন। এরমধ্যে শ্রম আদালতের চেয়ারম্যান পদেও তিনি ছিলেন। ২০০৮ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী থাকার মধ্যে সরকার তাকে দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার হিসাবে দায়িত্ব দেয়। ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি সেই দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে এক পুত্র সন্তানের পিতা এবং তার স্ত্রী প্রফেসর ড, রেবেকা সুলতানা সরকারের সাবেক যুগ্ম সচিব ছিলেন।
মনোনয়নপত্র জমা: ওদিকে গতকাল নির্বাচন কমিশনে চুপ্পুর পক্ষে দুটি মনোনয়নপত্র জমা দেন আওয়ামী লীগ নেতারা। এ সময় প্রার্থী নিজেও উপস্থিত ছিলেন। মনোনয়নপত্র জমার আনুষ্ঠানিকতা শেষে সাংবাদিকদের সামনে আসেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিনকে মনোনয়ন প্রদান করেছেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মাননীয় সভাপতি এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি পার্টির প্রধান বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় শেখ হাসিনা এই মনোনয়ন চূড়ান্ত করেছেন। এ সময় সাংবাদিকদের অনুরোধের মধ্যে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মো. সাহাবুদ্দিন সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় বলেন, সবই সর্বশক্তিমান আল্লাহর ইচ্ছা। নির্বাচন কমিশন সচিব জাহাঙ্গীর আলম সাংবাদিকদের বলেন, রাষ্ট্রপতি পদে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দুটি মনোনয়নপত্র জমা দেয়া হয়েছে একই ব্যক্তির নামে। দুটি মনোনয়পত্রেরই প্রস্তাবক ও সমর্থক একই ব্যক্তি, একই নামে। যার নামে দাখিল হয়েছে তিনি মো. সাহাবুদ্দিন। পিতা মরহুম শরফুদ্দিন আনসারী। বাসা হোল্ডিং ৮৮/১ গ্রাম রাস্তা শিবরামপুর পাবনা। পোস্ট কোড ৬৬০০ পাবনা। ইসি সচিব জানান, মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবকারীর নাম দেয়া আছে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নোয়াখালী-৫ আসনের সংসদ সদস্য ওবায়দুল কাদের এবং সমর্থনকারী হলেন চট্টগ্রাম-৭ আসনের সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ। সচিব জানান, এ দুটি আবেদন সোমবার দুপুর ১টায় বাছাই করা হবে। বাছাইয়ে মনোনয়নপত্র বৈধ হলে প্রধান নির্বাচনী কর্তা আপনাদের অবহিত করবেন। একক প্রার্থী হলে তার প্রক্রিয়া কী হবে জানতে চাইলে সচিব বলেন, বাছাইয়ের পরে বৈধ মনোনয়ন যেটা হবে, তার নাম ঘোষণা করা হবে। আইনানুগভাবে প্রত্যাহারের শেষ তারিখে আমরা চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করবো কে বাংলাদেশের পরবর্তী মহামান্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তবে যেহেতু একই ব্যক্তির দুটো আবেদন করেছেন এবং দুটিই যদি বাছাইয়ে টেকে, তাহলে কালকেই এটা চূড়ান্ত হয়ে যাবে। নিয়ম ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, একই ব্যক্তি তিনটি মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেন, যেখানে প্রস্তাবক ও সমর্থক ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। একই পদে একাধিক প্রার্থী থাকলে তখন এক ব্যক্তি দুজনের প্রস্তাবক হতে পারে না। মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান এমপি, জাহাঙ্গীর কবির নানক, প্রচার সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ এমপি, চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ড. সেলিম মাহমুদ এবং আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া।