গত ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাবার পর আশুলিয়ায় বিকালে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। এতে বেশ কয়েকজন নিহত হন। পরে সেসব নিথর দেহগুলো পুলিশ একটি ভ্যানে ওপর স্তূপাকারে রাখে।
গোপনে ধারণ করা ওই ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা দাবি করছেন, ভিডিওতে দেয়ালে থাকা পোস্টারে যাকে দেখা গেছে, তিনি আশুলিয়ার ধামসোনা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার পদপ্রার্থী আবুল হোসেন ভূঁইয়া।
সাব্বির আহমেদ নামে আশুলিয়ার একজন সাংবাদিক জানান, ভিডিওচিত্রটি আশুলিয়া থানার সামনে থেকে করা হয়েছে। গণহত্যাকাণ্ডের পারিপার্শ্বিক প্রমাণ মুছে ফেলতে রহস্যজনকভাবে রাতারাতি থানার পাশের সামনের দেয়ালের রং মুছে তা পরিবর্তন করা হয়েছে। পরে এসব মরদেহ একটি ভ্যানে তুলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
গণহত্যার নির্দেশ দেন ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম?
জুলাই বিপ্লবের সময় ঢাকা রেঞ্জে (ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ ১৩ জেলা) গণহত্যার নির্দেশদাতা পুলিশের কুখ্যাত ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম। লোমহর্ষক ভিডিওটির স্থান আশুলিয়া থানা তার আয়তাধীন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এএফ রহমান হলের প্রাক্তন ছাত্রলীগ সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সহ–পাঠাগার সম্পাদক সৈয়দ নুরুল ইসলাম ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতের কর্মসূচিতে গণহত্যায় নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য বিপিএম ও ২০১৮ সালের রাতের ইলেকশন বাস্তবায়নের জন্য সর্বোচ্চ পদক পিপিএম পদক লাভ করেন। (শাপলা চত্বরে নিজের ভূমিকা নিয়ে সৈয়দ নুরুল ইসলামের জবানবন্দি)
এর আগে এসপি থাকা অবস্থায় প্রকাশ্যেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ আওয়ামী লীগের একটি উপদল তৈরি ও নিয়ন্ত্রণ করায় এসপিলীগ বলে কুখ্যাতি পান। নির্বাচনের আগে (অক্টোবর‘২২) তাকে পুরস্কারস্বরূপ ডিআইজি পদোন্নতি দিয়ে ঢাকা রেঞ্জের (মেট্রোপলিটন বাদে ঢাকা বিভাগ) দায়িত্ব দেওয়া হয়।
৬ আগস্ট সরকার পতনের পর ডিআইজি নুরুল ইসলামকে বরখাস্ত করে সম্প্রতি আবার রাজশাহী পুলিশ একাডেমিতে ডিআইজি পদে সংযুক্ত করা হয়েছে।
নেতৃত্ব দেন এসপি কাফি
সেদিন কার নির্দেশে ডিবির টিম আশুলিয়ায় দায়িত্বে ছিল এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা উত্তর (ডিবি) পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ বিপ্লব বলেন, ‘ঢাকা জেলা পুলিশের এসপি পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত আব্দুল্লাহিল কাফি স্যারের নির্দেশে সেদিন আমরা আশুলিয়ায় ছিলাম।‘
উল্লেখ্য, মো. আব্দুল্লাহিল কাফি, পিপিএম (বার), বিপি–৮৫১১১৪২৫২১ আওয়ামী লীগে আমলে ২৯তম বিসিএসের মাধ্যমে পুলিশে যোগদান করেন।
ঢাবিতে পড়াকালীন ছাত্রলীগের হল পর্যায়ের নেতা ছিলেন কাফি। তিনি চলতেন শেখ হাসিনা সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নাম ভাঙিয়ে। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ছেলে শাফি মোদ্দাসের খান জ্যোতি ছিল কাফির বন্ধু। জ্যোতি প্রায়ই কাফির সঙ্গে আড্ডা দিতে সাভার আসতেন।
কাফিকে সহযোগিতা করেছেন ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) শাহিদুল ইসলাম। শাহিদুল ইসলাম এমআইএসটির মেধাবী শিক্ষার্থী শহীদ শাঈখ আসাবুল ইয়ামিনকে পৈশাচিক কায়দায় হত্যার নির্দেশে অভিযুক্ত।
গণহত্যা বাস্তবায়নকারী
ভাইরাল হওয়া ডিওতে নির্বিচার গুলিতে গণহত্যার পর ভ্যানে তোলা কয়েকটি মরদেহের স্তূপের পাশে পুলিশকে হাঁটাহাঁটি করতেও দেখা গেছে। তাদের একজনকে ইতোমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে। তিনি ঢাকা জেলা (উত্তর) গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক (তদন্ত) আরাফাত হোসেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরে আত্মগোপনে চলে গেছেন তিনিসহ ভিডিওচিত্রে থাকা পুলিশের সদস্যরা। (শনাক্ত হওয়া আরাফাত হোসেন)
অধস্তন কর্মকর্তার ছবির বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে ঢাকা উত্তর (ডিবি) পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ বিপ্লব ছবিটি আরাফাতের বলে নিশ্চিত করেন। আরাফাতের গ্ৰামের বাড়ি বরিশালে। প্রায় দুই বছর আগে তিনি ঢাকা জেলার গোয়েন্দা বিভাগে যোগ দেন।
রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ বিপ্লব বলেন, ‘এই ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার পর আরাফাত মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। হত্যাকাণ্ডে বা গণহত্যায় অংশ নিতে তাদের অন্তর কাঁপেনি, ভিডিও প্রকাশের পর তারা আত্মগোপনে চলে গেছেন।’
অবিলম্বে গণহত্যা পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা ও অংশগ্রহণকারীদেরকে আইনগত প্রক্রিয়ায় কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে হঠাৎ করে গতকাল শুক্রবার (৩০ আগস্ট) একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, একটি ভ্যানের ওপর অনেকগুলো লাশ। লাশগুলো ওয়ালক্লথ বা এইরকম কিছু একটি দিয়ে ঢেকে রাখা। তার ওপর আরও একটি লাশ পুলিশের পোশাক পরা এক ব্যক্তিসহ দুজনে ছুড়ে লাশের স্তূপের ওপর রাখেন। তার পাশেই পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্যকে হেলমেট ও অস্ত্রসহ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এটি নিয়ে তোলপাড় চলছে। মানুষ জানতে চাচ্ছে এই ঘটনা কোথায় ঘটেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুলিশের ভ্যানের লাশের স্তূপ করে রাখা মর্মান্তিক ঘটনাটি আশুলিয়া বাইপাইল এলাকার থানা রোডের গলিতে। গুলিবিদ্ধ ৭ শিক্ষার্থীর মরদেহ থানার পাশেই ইসলাম পলিমারস অ্যান্ড প্লাস্টিসাইজারস লিমিটেডের অফিসার ফ্যামিলি কোয়াটারের দেয়াল ঘেঁষে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে ছিল। পরে পুলিশ লাশগুলো একত্রিত করে ভ্যানের ওপর স্তূপ করে রাখেন। এরপরে ঘটে আরও মর্মান্তিক ঘটনা। যে ঘটনা বর্ণনা করাও কঠিন।
থানার সামনের বিল্ডিং থেকে পুরো ঘটনা স্বচক্ষে দেখা এক ব্যক্তি জানান, বিকেলে থানা ফটকের সামনে উত্তেজিত জনতার ওপর পুলিশ গুলি ছোড়ে। এতে থানার গেটের সামনেই ১০ থেকে ১২ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যান। কয়েক মিনিট ধরে ওখানে গোলাগুলি চলে। পরে জীবিত কয়েকজনকে নীচু হয়ে এসে ছাত্ররা টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যান। তারপরেও ৬ থেকে ৭ জন ওখানে পড়েছিল। তখন আশপাশের সব অলিগলি জনগণ ঘিরে ফেলে। রাস্তা থেকেও লোকজন থানার দিকে রওনা হয়। পরে থানা থেকে সব পুলিশ সশস্ত্র হয়ে একযোগে বেরিয়ে আসেন। তারা গুলি করতে করতে বেরিয়ে আসেন।
তবে ভ্যানে লাশের স্তূপ করা জায়গাটি পলিমারস এন্ড প্লাস্টিসাইজারস লিমিটেডের অফিসার ফ্যামিলি কোয়াটারের গেটে। ওই গেটের অপরপাশে সাদিয়া রাজশাহী কনফেকশনারি অ্যান্ড মিষ্টান্ন ভান্ডারের মালিক ফাহিমা আক্তার বলেন, ঘটনাটি আমার দোকানের সামনেই ঘটেছে। ৫ আগস্ট বিকেলে সাড়ে ৪টা হবে। সেদিন গুলি খেয়ে থানার সামনে পড়ে থাকা মরদেহগুলো ভ্যানে তুলছিলেন পুলিশ। আমাদের চোখের সামনেই তুলেছে। প্রথমে লাশগুলো তুলে ব্যানার দিয়ে ঢেকে থানার সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। সেই ঘটনা এখনো চোখের সামনে ভাসে।
ওইদিন ঘটনাস্থলে থানা রকি আহমেদ নামের এক পোশাক শ্রমিক বলেন, পুলিশ প্রথমে গেটে এসেই ইসলাম পলিমারস অ্যান্ড প্লাস্টিসাইজারস লিমিটেডের অফিসার ফ্যামিলি কোয়াটারের সামনে পড়ে থাকা গুলিবিদ্ধ ৭ জনকে একটি প্যাডেল ভ্যানে তুলেন। পরে তাদের থানার সামনে আনেন। পরে লাশগুলো থানার পার্কিংয়ে থাকা পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানে তুলে আগুন দেওয়া হয়। ৭ জনের লাশ আগুনে পুড়িয়ে থানা থেকে সব পুলিশ বেরিয়ে থানা গলি দিয়ে হাঁটতে শুরু করেন। আর গুলি ছুড়তে থাকেন। আগুনে পুড়ে যাওয়া একজনের হাতে তখনো হাতকড়া ছিল।
লাশের স্তূপ করা জায়গাটি হাত দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে আসলাম হোসেন বলেন, ভালো করে দেখেন। ভিডিওতে যে পোস্টারটি দেখা যাচ্ছে। সেটা এখনো দেয়ালে অক্ষত আছে। কিছু বালুর বস্তা ছিল সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সেদিন পুরো থানা রোডেই লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। পুলিশ ভ্যান নিয়ে সব লাশ এক জায়গায় জড়ো করে। আম টোকানোর মত করে পুলিশ গলি দিয়ে লাশ টুকিয়েছে। পরে লাশগুলো থানার সামনে এনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনা দেখেনি আশপাশে এমন কোনো মানুষ ছিল না। এ এক ভয়ানক ঘটনা। মনে পড়লে এখনো গা শিউরে উঠে।
বাইপাইল বাসস্ট্যান্ডের অটোরিকশা চালক বলেন, পুলিশ থানা থেকে মেইন রোডে এসে ডান বাম দু’পাশেই গুলি চালায়। রাস্তার দু’পাশে গুলি চালাতে চালাতে তারা নবীনগরের দিকে আগাতে থাকেন। তখন মানুষ জীবন বাঁচাতে যে যার মতো দৌড়ে পালিয়েছে। এক মিনিটের জন্যও পুলিশ গুলি বন্ধ করেনি। যতক্ষণ হেঁটেছে ততক্ষণই তারা গুলি ছুড়েছে। রাস্তার দু’পাশে পথচারী, বাসাবাড়ি ও দোকানপাটের শত শত মানুষ ওইদিন গুলিবিদ্ধ হয়। এমন দিন কখনো দেখেনি বাইপাইলবাসী।
সেদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন পথচারী বলেন, পুলিশ থানা রোড থেকে গুলি করতে করতে সোহেল হাসপাতাল পর্যন্ত যায়। তখন গুলির শব্দ ছাড়া কিছুই শোনা যায়নি। চারদিকে মানুষের চিৎকার। বাঁচাও বাঁচাও। মনে হয়েছে যুদ্ধ লেগেছে। তখন মানুষ বাসাবাড়ি ছেড়ে পালাতে শুরু করেন। রাত তখন ৯টার বেশি বাজে। পুলিশ সামনের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন। আর গুলি ছুড়ছিলেন। এভাবে তারা পল্লী বিদ্যুৎ পর্যন্ত চলে যায়। এই সময়ে শত শত মানুষকে গুলি খেয়ে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেছি।
সূত্র: মানবজমিন