আজ সোমবার, ৩রা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ১৮ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৭ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি
আজ সোমবার, ৩রা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ১৮ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৭ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি
ফারইস্ট ইসলামী লাইফের অর্থ আত্মসাত

অবশেষে ধরা পড়ে নজরুল রিমান্ডে, খালেক জেলে, ধরা ছোঁয়ার বাইরে খালেদ

হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার ও আত্মসাত করে দীর্ককাল সর্বত্র দাপিয়ে বেড়িয়েছেন তারা। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে খালেক এবং আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী নেতা ও সরকারের ঘণিষ্ট রাজনৈতিক মিত্রদের নাম ব্যবহার করে খালেদ-নজরুল গং দাপট দেখিয়েছেন সবখানে। আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী এক কেন্দ্রীয় নেতার অতি ঘণিষ্ট নজরুল দীর্ঘ দিন আমেরিকায় পালিয়ে থাকার পর সম্প্রতি দেশে ফিরে বিদেশ যাত্রায় উচ্চ আদালতের নিষেধাঙ্গায় পড়েন। অবশেষে সোমবার গভীর রাতে গুলশানের বাড়ী থেকে নজরুল এবং খালেক ও তার ছেলেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তবে রহস্যজনক কারণে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সাবেক পরিচালক এবং এম এ খালেকের সবচেয়ে ঘণিষ্ট সহযোগী বলে পরিচিত ইঞ্জিনিয়ার কে.এম খালেদ ধরা ছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছেন। বিএনপি-জামাতের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ও বহুল আলোচিত গ্যাটকোর চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার কে.এম খালেদ আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরীক একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতার প্রশ্রয়ে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
সূত্রমতে, সোমবার গভীর রাতে গ্রেপ্তারের পরম মঙ্গলবার অর্থ আত্মসাতের মামলায় ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের দুইদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। কোম্পানির আরেক উদ্যোক্তা পরিচালক এমএ খালেককে এবং ছেলে রুবায়াত খালেককে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক। মঙ্গলবার ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আহমেদ শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। মামলার বাদী পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। নজরুল ইসলাম সম্প্রতি প্রাইম ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান হয়েছেন। উল্লেখ্য, দুর্নীতির মাধ্যমে কোম্পানির গ্রাহকের অর্থ আত্মসাৎ করে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডায় বিশাল সম্পদের পাহাড় গড়েছিলেন নজরুল-খালেক-খালেদ। এ নিয়ে বেশ কিছু প্রতিবেদন প্রকাশ করে আমার দিন। গত বছর কোম্পানির পর্ষদ ভেঙে দেয় শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সরকারের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং বীমাখাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) প্রতিবেদনেও দুর্নীতির বিষয়টি উঠে আসে।
জানা গেছে, বীমা গ্রাহকদের জমাকৃত ৮০০ কোটি টাকার বেশি আত্মসাতের অভিযোগে চলতি সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে শাহবাগ থানায় মামলায় দায়ের করে সিআইডি। মামলা নং ১৫(৯)২২। এরপর ১২ সেপ্টেম্বর রাতে গুলশানের বাসা থেকে নজরুল ইসলাম, আব্দুল খালেক ও তার ছেলেকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মঙ্গলবার তাদেরকে আদালতে হাজির করা হয়। সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তাদের ১৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিল এবং জামিনের আবেদন করেন। তবে উভয়পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক তাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে নজরুল ইসলামের দুই দিনের রিমান্ড ও এমএ খালেক এবং তার ছেলে রুবায়াত খালেকের দুই দিন জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেন।
মূল লুটপাট হয় ২০১০ সাল থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে। এ সময়ে কোম্পানির লাইফ ফান্ড ও এফডিআর ভেঙে বিশাল সাম্রাজ্য গড়েছেন ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বহিষ্কৃত নজরুল,খালেক ও খালেদ। দুটি জমি ক্রয় দেখিয়ে সাড়ে ৩শ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এছাড়াও গ্রাহকদের টাকা আত্মসাৎ করে নেওয়া হয় হাজার কোটি টাকার বেশি। আর বীমার টাকা না পেয়ে প্রতিষ্ঠানটির হাজার হাজার প্রাহক নিয়ন্ত্রক সংস্থার দ্বারে দ্বারে ঘুরছে। এ ছাড়া গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ না করাসহ নানা আর্থিক অনিয়ম খতিয়ে দেখতে চলতি বছরের জুন মাসে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করে বিএসইসি। তদন্তে অর্থপাচারের প্রমাণ মিলেছে।

উল্লেখ্য, প্রতারণা ও অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা আত্মসাত ও পাচারের অভিযোগে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড’র অডিট কমিটির চেয়ারম্যান এম.এ.খালেক, সাবেক চেয়ারম্যান মো: নজরুল ইসলাম এবং সাবেক পরিচালক কে.এম খালেদ এর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হচ্ছে। সবচেয়ে বেশী মামলা হয়েছে এম.এ.খালেক এর বিরুদ্ধে। গত ৪ বছরে খালেকের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানা, সিএমএম কোর্ট ও হাইকোর্টে প্রায় দুই ডজন মামলা হয়েছে। সর্বশেষ গত ৮ মার্চ প্রায় ৯১ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তারা ধরা ছোঁয়ার বাইরেই ছিলেন। গুলশান ও বারিধারায় শত কোটি টাকা দামের আলিশান বাড়ীতে থাকতেন। লেটেষ্ট ব্র্যান্ডের বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ ও প্রাডো গাড়ীতে করে নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন সর্বত্র। যেন কোনো কিছুই হয়নি। খালেকের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকা আত্মসাত ও পাচারের পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত রাজনৈতিক সংগঠন জামায়াতে ইসলামীকে পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ রয়েছে। দেশের একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। ফারইস্ট ইসলামী লাইফ’র সাবেক পরিচালক এবং বিতর্কিত গেটকো গ্রুপের চেয়ারম্যান কে.এম খালেদ ও ফারইস্ট লাইফ’র সাবেক চেয়ারম্যান মো: নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে গুরুতর অনৈতিক-অসামাজিক কর্মকান্ডের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গভীর অনুসন্ধান ও তদন্তে দুর্নীতির মাধ্যমে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির প্রায় ৯১ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার পর্যাপ্ত প্রমাণ মেলায় ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড’র সাবেক চেয়ারম্যান মো: নজরুল ইসলাম, সাবেক পরিচালক কেএম খালেদ এবং অডিট কমিটির চেয়ারম্যান এম.এ.খালেক ও সাবেক কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একটি মামলায় প্রায় ৭১ কোটি এবং অপর একটি মামলায় ২০ কোটি টাকা আত্মসাত ও পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। গত ৮ মার্চ সিএমএম কোর্টে দায়েরকৃত মামলা দুটির বাদী হয়েছেন দুদকের সহকারি পরিচালক শারিকা ইসলাম ও সহকারি পরিচালক বায়েজিদুর রহমান খান। মামলার অপর আসামিরা হলেন, এম এ খালেকের ছেলে ও সাবেক পরিচালক শাহরিয়ার খালেদ, মো: মিজানুর রহমান, ফরিদউদ্দিন এফসিএ, আসাদ খান, কোম্পানি সেক্রেটারি সৈয়দ আব্দুল আজিজ এবং বরখাস্তকৃত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেমায়েত উল্যাহ।

অন্যদিকে খালেক-খালেদ,নজরুল গং পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত ফারইস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্সে থেকে গ্রাহকদের ২ হাজার ১২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে গত বছরের ডিসেম্বরে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বিশেষ নিরীক্ষায় ধরা পড়ে। কোম্পানির মালিকরা গত এক দশকে এই টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করে। কমিশনের প্রতিবেদনে সকল লেনদেনকে সুস্পষ্ট মানি লন্ডারিং অপরাধ উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনটি অর্থ মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং সিআইডিকে দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফারইস্ট লাইফের সাবেক চেয়ারম্যান মোঃ নজরুল ইসলাম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ হেময়েত উল্লাহ এবং পরিচালক এম এ খালেক ও কে এম খালেদ যৌথভাবে এই টাকা আত্মসাৎ করেছে। এর জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষটি নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার জন্য জাল নথি পর্যন্ত করেছে। এর মধ্যমে ২ হাজার ১২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। একই সাথে টাকাগুলো তারা বিদেশে পাচার করেছে। তারা তিনজন যৌথভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। তবে আন্যরাও জড়িত থাকতে পারে।

সূত্র মতে, ২ হাজার ১২৫ কোটি টাকার মধ্যে ৮৫৪ কোটি টাকা বেআইনি জমি অধিগ্রহণ, তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে ৬৫৯.৬৭ কোটি টাকা এবং কোম্পানিগুলোর মুদারাবা মেয়াদী আমানতের বিপরীতে ব্যাংক ঋণ নিয়ে ৪২১ কোটি টাকা এবং দুটি ভূয়া সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ১৯২ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে মালিকরা। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই টাকা ৩০ জুন,২০২১ পর্যন্ত সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করলে কমপক্ষে ১০ শতাংশ মুনাফা পেত। সেই হিসেবে কোন ধনরণের ঝুঁকি ছাড়া এই টাকার পরিমাণ হতো ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।এ বিষয়ে বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবায়াত-উল-ইসলাম বলেন, ফারইস্ট লাইফের বিরুদ্ধে বিএসইসি একটি তদন্ত করেছে। সেখানে বড় ধরণের অনিয়ম ধরা পড়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনটি ইতোমধ্যে আরও কিছু নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে দেওয়া হয়েছে।তিন আরও বলেন, মালিকদের অপকর্মের কারণে গত বছরের ৯ আগস্ট কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে কোম্পানিটিতে ১০ জন স্বতন্ত্র পরিচালক দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,ফারইস্ট লাইফের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ২০১০ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছে। তার মেয়াদে ধারাবাহিক আর্থিক অপরাধ এবং অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটেছে। সাবেক পর্ষদ কোম্পানির নামে ১২টি জায়গায় জমি ক্রয় করেছে। প্রত্যেকটি জায়গা অস্বাভাবিক উচ্চ মূল্যে ক্রয় করেছে। এর মাধ্যমে মোট ৮৫৮ কোটি টাকা আত্মসাত করেছে।প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে ১২ মে কোম্পানি সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম তার শ্বশুর মোঃ মফিজুল ইসলাম ও শ্যালক মোঃ সেলিম মাহমুদের কাছ থেকে ২৮ দশমিক ৫০ ডিসিমেল জমি ক্রয় করেছে। এর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭২ কোটি টাকা। অথচ ২০১৪ সালের ৮ জুলাই তারা এই জমি মাত্র ১৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকায় ক্রয় করেছে। জমি কেনাবেচার মাধ্যমে চেয়ারম্যানের শ্বশুর ও শ্যালক ১৯৮ কোটি টাকার বেশি অর্থ ব্যক্তিগতভাবে লাভ করেন। ফারইস্ট লাইফের কাছ থেকে দাম বুঝে পাওয়ার পরই উপহার হিসেবে ১১৫ কোটি টাকা নজরুল ইসলামের স্ত্রী তসলিমা ইসলামের অ্যাকাউন্টে জমা দেন। আবার তসলিমা ইসলামও তার স্বামীকে ৫০ কোটি টাকা উপহার দেন। বিশাল অঙ্কের এ উপহারের তথ্য তারা ওই বছরের আয়কর নথিতেও উল্লেখ করেন।এছাড়াও, ২০১৪ সালের ৩ মার্চ নজরুল ইসলামের দুই ভাই আজহার খান ও সোহেল খানের কাছ থেকে একটি পুরানো ভবনসহ ৩৩.৫৬ ডেসিমেল জমি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। যদিও তারা নজরুল ইসলামের ব্যবসায়িক অংশীদার। এর জন্য ব্যয় ধরা হয় ২০৭.৩৬ কোটি টাকা।কিন্তু ২০১৪ সালের শুরুতে আজহার খান ১২.৮৫ কোটি টাকায় ১৫.৩ ডেসিমেল এবং মোঃ সোহেল খান ৮.৭০ কোটি টাকায় বাকী ১৮.২৬ ডেসিমেল জমি ক্রয় করে। এই জমি তারা ফারইস্ট লাইফের কাছে উচ্চ মূল্যে বিক্রি করেছে।বিএসইসি রিপোর্টে বলা হয়েছে, দুটি সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেনের মাধ্যমে ফারইস্ট লাইফের ৪০৬.৯৪ কোটি টাকা নিজের করে নিয়েছে সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম। এই টাকা তিনি দেশের বাহিরে পাচার করেছে।বিষয়টি নিয়ে সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম, উদ্যোক্তা এমএ খালেক এবং সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেমায়েত উল্লাহকে বারবার ফোন করা হয়। তাদের সকলের ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। অন্য কোনো উপায়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে কোম্পানি সচিব মাহামুদুল হাসান বলেন,বিএসইসির তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে আমরা কিছু জানিনা। তাই এই বিষয়ে মন্তব্য করতে পারে না।ফারইস্ট লাইফ ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মাঝে ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংকে মোট ৩৬৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা আমানত রাখে। এর বিপরীতে উদ্যোক্তা এমএ খালেক ৩১২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা ঋণ নেন এবং তিনি খেলাপি হন। পরে ওই তিন ব্যাংক ফারইস্ট লাইফের আমানত দ্বারা ওই ঋণ সমন্বয় করেছে।বিএসইসির প্রতিবেদনে এসব ঘটনায় ফারইস্ট লাইফের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম, উদ্যোক্তা এমএ খালেক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেমায়েত উল্লাহর বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ এনেছে। এতে বলা হয়েছে, তাদের পারস্পরিক যোগসাজশ ও পরিকল্পনায় অর্থ লোপাট হয়েছে। অস্বাভাবিক দামে জমি কেনাবেচার বাইরে তারা নিজেদের স্বার্থসংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়ে শত শত কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি সাধন করেছেন।প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোম্পানিটির নামে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে মোট ১৩টি মুদারাবা মেয়াদী আমানত (এমটিডিআর)। এগুলো ছিলো পরিচালকদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। এই হিসাব খোলার জন্য তারা পর্ষদ সভার রেজুলেশন জাল করেছে। এর মাধ্যমে কোম্পানিটির পরিচালকরা ব্যাংকগুলো থেকে অনৈতিক ঋণ সুবিধা নিয়েছে। এর জন্য সহযোগিতা করেছে কোম্পানির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক। যখন তারা ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়, ওই সময়ে ব্যাংকগুলো মুদারাবা মেয়াদী আমানত (এমটিডিআর) বাতিল করে দেয়৷যেমন, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ফারইস্টের গচ্ছিত আমানতকে তৃতীয় পক্ষের জামানত হিসেবে ব্যবহার করে নিজের স্বার্থসংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠান পিএফআই সিকিউরিটিজের নামে ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মোট ১৩৬ কোটি টাকা ঋণ নেন এমএ খালেক। ব্রোকারেজ হাউসটি ঋণ পরিশোধ না করায় ফারইস্ট লাইফের আমানত থেকে ১৮৫ কোটি টাকা কেটে নিয়েছে ব্যাংক।একইভাবে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে এমএ খালেকের প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটি, পিএফআই প্রপার্টিস, মিথিলা টেক্সটাইল, মিথিলা প্রপার্টিস এবং আজাদ অটোমোবাইলসের নামে নেওয়া ২১৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েও তা পরিশোধ করেনি। কিন্তু এসব ঋণের বিপরীতে ইসলামী ব্যাংক, এসআইবিএল এবং ইউনিয়ন ব্যাংক ফারইস্ট লাইফের আমানত থেকে ২৯৩ কোটি টাকা সুদে-আসলে কেটে নিয়েছে। এভাবে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের ঋণের জামানত দিয়ে সেই ঋণ খেলাপি হয়ে পড়লে ব্যাংকগুলো বীমা কোম্পানিটির আমানত থেকে অর্থ কেটে নিয়েছে। এভাবে ফারইস্টের মোট লোকসান হয়েছে ৯৭৭ কোটি টাকার বেশি। দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করে খালেক,নজরুলও খালেদ কানাডা ও আমেরিকায় বিশাল সাম্রজ্য গড়ে তুলেছেন বলে জানা গেছে। এদিকে গত মার্চে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স’র লুটপাটের ঘটনায় সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ও সাবেক অডিট কমিটির চেয়ারম্যানে এম এ খালেকের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে উচ্চ আদালত। ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৭জন শেয়ার হোল্ডারের করা মামলার প্রেক্ষিতে বিচারপতি কে.এম কামরুল কাদেরের একক বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin