আজ বুধবার, ২২শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৫ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
আজ বুধবার, ২২শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৫ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

হোক মহামারির পরাজয়

“আলো আঁধারির রঙ তুলিতে মোহগ্রস্ত ক্যানভাস-

কতই না স্বপ্নীল ছিল,

আজ এই বিভীষিকাময় লগ্ন আমাকে তীব্র বিষে আচ্ছন্ন করে দেয়।

প্রতিদিন ঘুম ভেঙেই আতঙ্কে বিছানায় উঠে বসি,

অনঙ্গ শূন্যতা আমায় নিশ্চিত ছুঁড়ে দেয় কারাগারে,

প্রভু করো আমায় ক্ষমা,

অন্ধকার নয়, আমাকে সূর্যের মুখোমুখি দাঁড় করো। ”

গত ৮ মার্চ স্বাভাবিক একটি দিনের মতো হাঁটছিলাম ক্যাম্পাসের কোনো এক পথ ধরে। ঘুরে ফিরে দেখছিলাম ক্যাম্পাসের অনিন্দ সুন্দর প্রকৃতিকে। ঘাসগুলো কত বড় হয়েছে, পানির অভাবে ফুলের পাপড়ি সংকুচিত হয়েছে, লেকের পানিতে মাছের খেলা করা, অসংখ্য সারিবদ্ধ গাছের ভিড়ে পাখিদের আনাগোনা, সব মিলিয়ে দিনটিতে আনন্দের কোনো কমতি ছিল না।

হঠাৎ আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়া খবরে প্রকৃতি যেন ক্ষণেই নিমজ্জিত হলো সাদাকালো অন্ধকারে। দিগন্ত বিস্তৃত আকাশ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসলো। আকাশের নীল রঙ হারিয়ে গেলো কালো কালো ভাঙ্গা মেঘের ভিড়ে। সেই কালো মেঘের ভিড় কাটিয়ে নিজেকে সামাল দিতে পারলেও কানের মধ্যে প্রবেশ করলো ভয়ঙ্কর একটি কথা, বাংলাদেশে আজ দুইজন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে।

করোনা আক্রান্তের খবর শোনার পরেও থেকে গেলাম আরও কিছু দিন প্রিয় ক্যাম্পাসে। কিন্তু হঠাৎ একদিন দেখলাম সবাই ছুটছে করোনার আতঙ্ক থেকে মুক্তি পেতে তার পরিবারের কাছে। তাদের অনুসরণ করে আমিও ফিরে আসলাম আমার প্রিয় বাবা মায়ের পাশে। সেই থেকে কাটছে দিন প্রাণহীন এই ছোট ঘরটিতে। ৭ মাস হতে চললো এই গৃহবন্দি জীবন। জানিনা আরও কত দিন এভাবে ঘরে বসে থাকতে হবে।

দিন যত যাচ্ছে প্রাণশক্তিই যেন নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। জেলের কয়েদিরা বছরের পর বছর তিন দেয়ালে আবদ্ধ সেই ছোট বাক্সের মধ্যে কীভাবে কাটায়, করোনা আজ তাই উপলব্ধি দিচ্ছে। তবে আমাদের এ বন্দি দশায় তাদের সঙ্গে একটি বিশেষ মিল রয়েছে। তারা যেমন তাদের খারাপ কৃতকর্মের জন্য জেলে বন্দি হন, তেমনি পৃথিবীর উপর নির্যাতনের কারণে মিলেছে আজ আমাদের ঘরে বন্দি হওয়ার পুরস্কার। পৃথিবীর এই দীর্ঘ দিনের রাগ, অভিমান, ক্ষোভের কখন যে অবসান হবে, তা বলা দুষ্কর।

প্রতিনিয়ত পৃথিবীকে করেছি আমরা ক্ষতিগ্রস্ত, পানি দূষণ, বায়ু দূষণ ও নানা দূষণে পরিশ্রান্ত। পৃথিবীকে এত নির্মমভাবে যদি অত্যাচার করা না হতো, এটি হয়তো তার ক্রোধ আরও কিছু দিনের জন্য দমিয়ে রাখতে পারতো। কিন্তু আমাদের দমহীন, আপোষহীন অত্যাচারে পৃথিবী আজ ক্লান্ত, শ্রান্ত, বিপর্যস্ত। বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার বেগে আবেগহীন হয়ে পৃথিবীকে করেছি ক্ষত-বিক্ষত।

সবকিছুই ধীরে ধীরে পালটে যাচ্ছে। দিনের বেলার আলোতে করোনার ভয়কে দমানো গেলেও রাত্রির ভয়াবহ অন্ধকার করোনাকে করে তুলে আবারও জীবন্ত। সামান্য বিপদেও যে মানুষ অন্যেকে বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়তো, আজ পরিস্থিতি এমন, নিজের আত্মীয়স্বজনরাই ছেড়ে যাচ্ছে আক্রান্তকে যেখানে সেখানে ফেলে অসহায়ের মতো।

বিজ্ঞানীদের প্রাণপণ চেষ্টার ফসল ভ্যাকসিন দিয়ে পৃথিবীর ব্যথিত শরীর যাতে আবার ভালো হয়ে যায় একটাই প্রার্থনা। তবে ভাইরাসের এই ভয়াল পরিস্থিতিতেও যাদের কথা না বললেই নয়, তারা হলেন আমাদের গরীব, খেটে খাওয়া ও শ্রমজীবী মানুষ। দেশের উন্নতির মেরুদণ্ড তাদের উপরই নির্ভর করে। তাদের উন্নতিতেই দেশের উন্নতি। তাদের বাদ দিয়ে জাতি কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়তে পারবে না। এই মহামারিতে বিত্তবানদের উচিৎ তাদের প্রতি একটু সহানুভূতি ও ভালোবাসা দেখানো।

‘‘ভালোবাসায় ভুবন করে জয়

সখ্যে তাহার অশ্রুজলে শত্রু মিত্র হয়-

সে যে সৃজন পরিচয়।’’

লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin