আজ রবিবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২১ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরি
আজ রবিবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২১ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরি

ডায়াবেটিস নিয়ে ভালো থাকুন

আপনি একজন ডায়াবেটিসের রোগী। রাতের বেলা হঠাৎ টের পেলেন, বুক ধড়ফড় করছে, হাত-পা কাঁপছে, মনে হচ্ছে অজ্ঞান হয়ে যাবেন। আপনি বুঝে উঠতে পারছেন না কী হলো। রক্তে গ্লুকোজ বেড়ে গেল, না কমে গেল। অনেক রাত। এ মুহূর্তে চিকিৎসক পাওয়া কঠিন। কী করবেন তখন আপনি? পরিবারের অন্য সদস্যরাই–বা কী করবেন তখন।
এ রকম অসহায় অবস্থায় পড়েছেন হয়তো অনেকেই। হয়তো সমাধানও মিলেছে। একে-ওকে ধরে রাতবিরাতে হয়তো চিকিৎসকের পরামর্শও পাওয়া গেছে। কিন্তু যে অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় কাটল কয়েকটা মুহূর্ত, তা থেকে রেহাই পাবেন কী করে?
ওপরে যে অবস্থার বর্ণনা দেওয়া হলো, তার নাম হাইপোগ্লাসেমিয়া। রক্তে গ্লুকোজ কমে গেলে এমন হয়। এ রকম পরিস্থিতি হলে অজ্ঞান হয়ে পড়ার আগেই ৪ থেকে ৮ চামচ চিনি বা গ্লুকোজ পানিতে গুলে খেয়ে নিতে হবে। যদি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন এবং আপনার পরিবারের অন্য সদস্যরা যদি সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেন, তবে আপনার মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। কাজেই জ্ঞান হারানোর আগে আপনি নিজেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন। আর যদি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন, পরিবারের অন্য সদস্যদের উচিত অবিলম্বে বাড়ির কাছের ওষুধের দোকান থেকে নিয়ে বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে গ্লুকোজ ইনজেকশন দেওয়ার ব্যবস্থা করা বা নিকটস্থ ডায়াবেটিস কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া।

নিয়মিত হাঁটলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে।

নিয়ন্ত্রণে রাখতে জানতে হবে
এখন কথা হলো, ডায়াবেটিস নিয়ে বসবাস করতে হলে এ রকম অনেক কিছু সম্পর্কেই আপনার সম্যক ধারণা থাকা দরকার। কেবল ডায়াবেটিস কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন তা–ই নয়, খাবারদাবার থেকে শুরু করে হাঁটাচলা, ব্যায়াম, যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা মানে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সচেতন থাকতে হবে। সে জন্য চাই রোগটি সম্পর্কে আপনার যথেষ্ট জ্ঞান ও শিক্ষা।

ডায়াবেটিসের মতো জটিল ও জীবনব্যাপী একটি রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের কাজটা খুব সহজ নয়। তা ছাড়া এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখার পদ্ধতিও বেশ ব্যয়বহুল। নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া, রক্ত পরীক্ষা করা, ওষুধ খাওয়া, কারও কারও ক্ষেত্রে নিয়মিত ইনসুলিন নেওয়া ছাড়াও ডায়াবেটিসের কারণে শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না, তা দেখার জন্য মাঝেমধ্যে নানা ধরনের পরীক্ষারও দরকার হয়। অথচ আমাদের দেশের ৮০ শতাংশ মানুষই দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। তাদের অনেকের এমনকি চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানোর মতো অর্থও নেই।
এ অবস্থায় ডায়াবেটিসের জটিলতা এড়াতে রোগী ও তার পরিবারের সদস্যদের উদ্যোগী হতে হবে। বাড়িতে বসে রক্ত পরীক্ষাসহ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশলগুলো জেনে নিতে হবে। থাকতে হবে ডায়াবেটিস–সংক্রান্ত সঠিক শিক্ষা ও জ্ঞান।
গ্লুকোজের মাত্রা কেন নিয়মিত জানা দরকার
গ্লুকোজ আমাদের জন্য অপরিহার্য একটি উপাদান। শরীর ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখার জন্য একটা নির্দিষ্ট মাত্রার গ্লুকোজ শরীরে থাকতেই হবে। গ্লুকোজের মাত্রা বেশি কমে গেলে মস্তিষ্কের কোষ (নিউরন) ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।কাজেই আপনার যদি রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষা করার একটা নিজস্ব যন্ত্র থাকত, তাহলে বাড়িতে বসেই আপনি দেখে নিতে পারতেন আপনার গ্লুকোজের মাত্রা বেড়েছে, না কমেছে। কমে গিয়ে থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা আপনি নিজেই নিয়ে নিতে পারতেন।অনেকে হয়তো ভাবেন গ্লুকোমিটার কিনে বাড়িতে রাখার দরকার কী। বারডেম বা এনএইচএন (ন্যাশনাল হেলথ নেটওয়ার্ক) কেন্দ্রে কি পাশের দোকানে গিয়েই তো যখন-তখন রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষা করা যায়। অথচ ভেবে দেখুন, যে টাকা খরচ করে গাড়ি বা বাসভাড়া দিয়ে রাস্তায় ধোঁয়া-ধুলাবালি খেয়ে হাসপাতালে গিয়ে পরীক্ষা করবেন, ঘরে বসে গ্লুকোমিটার দিয়ে রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষা করার জন্য খরচ হবে এর চেয়ে অনেক কম। তা ছাড়া প্রয়োজনের মুহূর্তে শুধু নয়, নিয়মিত সপ্তাহে বা মাসে একাধিকবার যেকোনো সময় গ্লুকোজের মাত্রা দেখে সে অনুযায়ী ওষুধ বা ইনসুলিনের পরিমাণও বাড়িয়ে বা কমিয়ে নিতে পারা যায়। বোঝা যায় গ্লুকোজের ওঠানামা।তাই নিয়মিত রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষার কোনো বিকল্প নেই। রক্তে বেশি মাত্রার গ্লুকোজ অনেক দিন ধরে অব্যাহত থাকলে হৃৎপিণ্ড, কিডনি, চোখসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। নার্ভসহ শিরা-উপশিরারও স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। রোগী বিকলাঙ্গ হয়ে যেতে পারে, এমনকি তার মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
বাড়িতে করণীয়
সাধারণভাবে সপ্তাহে একবার বা দুবার রাতে খাওয়ার ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর সকালবেলা খালি পেটে রক্ত পরীক্ষা করা ভালো। খাওয়ার পর গ্লুকোজের মাত্রা কতটুকু বাড়ে, তা দেখার জন্য নাশতা বা কোনো বেলার আহার খেয়ে দুই ঘণ্টা পর আবার রক্ত পরীক্ষা করতে হবে। এর বাইরে যেকোনো সময় অসুস্থ বোধ করলে ঘরে বসে আগে রক্ত পরীক্ষা করে দেখে নিন রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ঠিক আছে কি না।গ্লুকোজ বেড়ে গিয়ে থাকলে ওষুধ বা ইনসুলিনের পরিমাণ বাড়াতে হবে। কম থাকলে ওষুধ বা ইনসুলিনের পরিমাণও কমিয়ে নেওয়া উচিত। হাইপোগ্লাসেমিয়া হলে চিনি খেতে হবে।ওষুধ ও ইনসুলিন নিয়মিত সঠিকভাবে গ্রহণ করুন। কোনটি খাবার আগে আর কোনটি খাবার পর গ্রহণ করতে হয়, জেনে নিন। কত হলে ইনসুলিন কত ইউনিট কমানো বা বাড়ানো উচিত, তা–ও শিখে নিন।ইনসুলিন কীভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, কীভাবে চামড়ার নিচে সঠিক নিয়মে নিতে হবে, তা ভালো করে শিখে নিন।
ওজন ও উচ্চতা অনুযায়ী একটি আদর্শ ক্যালরি চার্ট দেখে খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন। জানা–বোঝার চেষ্টা করুন, ডায়াবেটিসে কী কী খাবার খাওয়া যাবে, কোনটি কী পরিমাণ খেতে হবে, কোন খাবারে কী পরিমাণ ক্যালরি থাকে, বিকল্প খাবার কীভাবে নির্বাচন করতে হয়, কোন কোন খাবার ডায়াবেটিসের জন্য ক্ষতিকর।
রোগী কখন কী ধরনের ব্যায়াম করবেন, কতটুকু করবেন ইত্যাদি। বয়স ও ওজনের সঙ্গে ডায়েট ও ব্যায়ামের ধরন ঠিক করতে হয়।
তিন-চার মাস পরপর গত কয়েক মাসের গ্লুকোজের গড় মাত্রা বা ডায়াবেটিসের গড় অবস্থা জানার জন্য ‘হিমোগ্লোবিন এওয়ানসি’ নামের একটি পরীক্ষা বারডেম বা স্থানীয় ডায়াবেটিস সেন্টারে গিয়ে করাতে পারেন। যদি ‘হিমোগ্লোবিন এওয়ানসি’ ৬.০ শতাংশ বা এর কম থাকে, তবে ডায়াবেটিস স্বাভাবিক অবস্থায় আছে বলে ধরে নিতে হবে।
অধ্যাপক এ কে আজাদ খান,সভাপতি, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি, ঢাকা।

শেয়ার করুন:
Share on Facebook
Facebook
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Print this page
Print