আজ শুক্রবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ১৪ মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৪ জমাদিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি
আজ শুক্রবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ১৪ মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৪ জমাদিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

অনিয়ম তদন্তে ফের ইউজিসির কমিটি

রাজধানীর প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়ম তদন্তে ফের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। বিশ্ববিদ্যালয়টির বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন ধরনের একাডেমিক, প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখবে উচ্চশিক্ষার তদারককারী এ সংস্থা। কয়েক মাস আগেও বিশ্ববিদ্যালয়টির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের (বিওটি) সাবেক চেয়ারম্যান এমএ খালেকের বিরুদ্ধে তদন্ত করে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পায় ইউজিসি।

সম্প্রতি গঠন করা তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীরকে। এছাড়া ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের পরিচালক মো. ওমর ফারুখ এবং অর্থ ও হিসাব বিভাগের উপপরিচালক মো. আ. মান্নান কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন। তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনায় সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মো. শরীফুল ইসলাম।

কয়েক বছর ধরেই প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় বেশ বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে গত ১৩ মাসেই বিশ্ববিদ্যালয়টি থেকে একে একে তিনজন উপাচার্য পদত্যাগ করেছেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বোর্ড অব ট্রাস্টিজের স্বার্থান্বেষী একটি গোষ্ঠীর স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম ও দুর্নীতিতে বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়েছে প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ট্রাস্টিরা অবৈধভাবে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সুবিধা নেন বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে। এছাড়া স্বার্থের সংঘাতমূলক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেও সুবিধা নেন তারা। এসব কাজে বাধা দিলে উপাচার্যের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের অসদাচরণও করেন ট্রাস্টিদের কেউ কেউ। এমনকি এক পর্যায়ে উপাচার্যকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।

এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করে একজন প্রাক্তন শিক্ষক বণিক বার্তাকে বলেন, বিওটির কয়েকজন সদস্য নিজেদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মতো ব্যবহার করেন বিশ্ববিদ্যালয়কে। সেখানকার সিকিউরিটিজ ও ইন্টারনেট সেবা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম নিজেদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালনা করেন। এক্ষেত্রে বাজারমূল্যের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি অর্থ বিল করে তহবিলের অর্থ আত্মসাৎ করেন। এছাড়া নিজেদের ইচ্ছামতো নিয়োগ দেন। আবার নিজেদের ইচ্ছামতোই ছাঁটাই করেন। সব মিলিয়ে সেখানে কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ নেই।

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠার ১৮ বছরেও কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও ভিত্তি গড়ে ওঠেনি প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিভিন্ন কার্যক্রমের নানা পরিসংখ্যানে তাকালে দুরবস্থার চিত্র উঠে আসে। চলতি বছরের মে পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সিন্ডিকেট সভা হয়েছে মাত্র পাঁচটি। যদিও এ সময়ে কমপক্ষে ১০৮টি সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এ সময়ে একাডেমিক কাউন্সিলের সভা হয়েছে ১০-১১টি। সে হিসেবে বছরপ্রতি একাডেমিক কাউন্সিলের একটি সভাও অনুষ্ঠিত হয়নি। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষকদের মধ্যেও বেশ অসন্তোষ রয়েছে। শিক্ষকদের চাকরিতে যোগদান ও চাকরি ছাড়ার একটি পরিসংখ্যানে সেটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এক হিসাবে দেখা গেছে, গত সাড়ে তিন বছরে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ২৭৫ জন নিয়োগ দেয়া হয়েছে। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি থেকে চাকরি ছেড়ে যাওয়া শিক্ষকের সংখ্যা ২৫১। নিম্ন বেতন কাঠামো ও কর্মপরিবেশের অভাবেই তারা চাকরি ছেড়েছেন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

এর আগে প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিওটির সাবেক চেয়ারম্যানর এমএ খালেকের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে ২৩৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ ওঠে। বছর কয়েক আগে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে এমন একটি অভিযোগ জমা পড়ে। এরপর ঘটনা তদন্তে ইউজিসিকে চিঠি দেয় দুদক। তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করে চলতি বছরের মে মাসে দুদকে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে ইউজিসির তদন্ত কমিটি। ইউজিসির তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এমএ খালেক বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে নিজের নামে বড় অংকের অর্থ সরিয়ে নিয়েছেন। পাশাপাশি আত্মীয়স্বজন ও নিজেদের আয়ত্তাধীন প্রতিষ্ঠানের নামেও কয়েক কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছেন। সব মিলিয়ে ৯০ কোটি ৪৩ লাখ টাকা স্থানান্তরের প্রমাণ পেয়েছে ইউজিসি।

আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত অনিয়মের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের একাডেমিক অনিয়মও রয়েছে প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়টির ছয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে ভুয়া, অনুমোদনহীন ও প্রশ্নবিদ্ধ পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে চাকরি করার অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে ওই ছয় শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়টি থেকে পদত্যাগ করেন।

প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয় ২০০৩ সালে। প্রতিষ্ঠার পর পরই শিক্ষার্থী ভর্তিতে বেশ এগিয়ে যায় বেসরকারি এ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আর্থিক সক্ষমতা বাড়ায় একসময় স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়ে তোলার উদ্যোগও নেয়া হয়। যদিও ট্রাস্টি বোর্ডের অনিয়মে মুখ থুবড়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির অগ্রযাত্রা।

এদিকে যে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের বিরুদ্ধে এত অভিযোগ, সেই বোর্ডেরই আইনগত কোনো ভিত্তি নেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ (আরজেএসসি) থেকে কোনো ধরনের নিবন্ধন পায়নি প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্ট।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, আইন অনুযায়ী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টিদের কোনো ধরনের আর্থিক সুবিধা নেয়ার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির টাকা আত্মসাৎ করা একটি গর্হিত কাজ। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কোনো ধরনের অনিয়ম ছাড় দেয়া হবে না। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।