আজ সোমবার, ২১ জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৭ আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১০ জিলকদ, ১৪৪২ হিজরি
আজ সোমবার, ২১ জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৭ আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১০ জিলকদ, ১৪৪২ হিজরি

নবীজির অনুসরণেই মুক্তির পথ

রাসূলে কারিম (সা.) এর নীতি আদর্শ ও সুন্নাহকে আমরা নিজেদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছি। আল্লাহ তাায়াল এজন্যই রাসূল প্রেরণ করেছেন যে, আল্লাহর আদেশে তার অনুসরণ করা হবে। আল্লাহ তাায়াল ইরশাদ করেছেন, ‘আমি রাসূল এই উদ্দেশ্যেই প্রেরণ করেছি যে, আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে তার আনুগত্য করা হবে।’ (সুরা নিসা : ৬৪)
আল্লাহ তায়ালার নিকট বান্দা তখনই মুমিন সাব্যস্ত হয়, যখন সে রাসূলকে নিজের সকল বিষয়ের সিদ্ধাস্তদাতা (হাকাম) বলে স্বীকার করে এবং তার সকল সিদ্ধাস্ত মনেপ্রাণে মেনে নেয়। সকল দ্বিধা ও সংশয় ত্যাগ করে তার ফয়সালার সামনে নিজেকে পুরোপুরি সমর্পিত করে।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘কিন্তু না, আপনার প্রতিপালকের শপথ! তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ পর্যস্ত তারা তাদের নিজেদের বিবাদ-বিসংবাদের বিচারভার আপনার উপর অর্পণ না করে; অতপর আপনার সিদ্ধাস্ত সম্পর্কে তাদের মনে কোনো দ্বিধা না থাকে এবং সর্বাস্তকরণে তা মেনে নেয়। (সুরা নিসা : ৬৫) মুমিনকে আল্লাহ তায়ালা একটি ব্যবস্থাই দিয়েছেন, যাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে আল্লাহর নিকট কোনো কিছু আশা করার পূর্বশর্ত। আর তা হল রাসূল (সা.) প্রদত্ত ব্যবস্থা ও তার পবিত্র জীবনাদর্শ।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখিরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে তাদের জন্য রাসূল (সা.) এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। (সুরা আহযাব: ২১) এই উত্তম আদর্শ দ্বারা ঐ জীবনাদর্শই উদ্দেশ্য, যা সুরায়ে জাসিয়ায় এভাবে বলা হয়েছে, ‘এরপর আমি আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করেছি দ্বীনের বিশেষ বিধানের উপর। সুতরাং আপনি তা অনুসরণ করুন। অজ্ঞদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করবেন না। আল্লাহর মোকাবিলায় তারা আপনার কোনো উপকার করতে পারবে না। জালিমরা একে অপরের বন্ধু আর আল্লাহ তো মুত্তাকিদের বন্ধু। এই কোরআন মানবজাতির জন্য সুস্পষ্ট দলিল এবং নিশ্চিত বিশ্বাসী জাতির জন্য পথনির্দেশ ও রহমত। (সুরা জাসিয়াহ : ১৮-২০)

কালিমায়ে তাওহিদ ও কালিমায়ে শাহাদতে আমরা এই শরিয়ত ও এই আদর্শকে সত্যতা ও যথার্থতার স্বাক্ষ্য দেই এবং মনেপ্রাণে তা কবুল করার ঘোষণা দান করি। এজন্য আমাদের উপর ফরজ, এই আদর্শের আলোকে আমাদের পুরো জীবন, জীবনের প্রতিটি অঙ্গনকে যাচাই করা। অতপর যেখানেই ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা দেখা যায় সংশোধনের চেষ্টা করা।

আজ সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এই যে, আমরা প্রত্যেকে এবং সমাজের প্রতিটি শ্রেণী নিজের জীবন ও কর্মকে সেই ‘উসওয়ায়ে হাসানা’র মাপকাঠিতে যাচাই করব ও নিজেকে সংশোধন করব। রাসুলে কারিম (সা.) এর পবিত্র সিরাতের চর্চা সেভাবেই করব যেভাবে সাহাবায়ে কেরাম করতেন।

সিরাতে নববিয়্যাহ সম্পর্কে আমাদের অবস্থা সাহাবায়ে কেরামের অবস্থা থেকে ভিন্ন থেকে ভিন্নতর হতে চলেছে। নবীজির জীবনী চর্চায় বিশেষভাবে নিম্নের বিষয়গুলোতে আমাদেরকে লক্ষ্য রাখা দরকার।

সঠিক জ্ঞান
সাহাবায়ে কেরাম সরাসরি আল্লাহর রাসূলের বাণী শুনতেন, তার জীবনযাপন দেখতেন এবং নিজেদের মাঝে আলোচনার মাধ্যমে সিরাতের সঠিক জ্ঞান অর্জন করতেন। আমরা তার সরাসরি সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হলেও আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্যও সিরাতের সঠিক জ্ঞান লাভের পথ খোলা রেখেছেন। কোরআন মজিদ হচ্ছে নবী-জীবনকে জানার সবচেয়ে বড় উৎস। হাদিস ও সিরাতের নির্ভরযোগ্য কিতাব আমাদের সামনে আছে। সুন্নতের অনুসারী আল্লাহওয়ালাগণ বিদ্যমান আছেন। আমরা যদি গভীর মনোযোগ ও চিস্তা-ভাবনার সঙ্গে কোরআন মজিদ তিলাওয়াত করি (কোনো সংক্ষিপ্ত ও নির্ভরযোগ্য তাফসিরের কিতাবের সহযোগিতা নিয়ে), আহলে ইলমদের সঙ্গে পরামর্শ করে হাদিস ও সিরাতের নির্ভরযোগ্য কিতাবপত্র অধ্যয়ন করি এবং সুন্নতের অনুসারী মাশায়েখের সাহচর্যে বসি তাহলে ইনশাআল্লাহ আমরাও সিরাতের সঠিক জ্ঞান অর্জন করতে পারব।

কিন্তু আমরা বড়ই উদাসীনতার শিকার। প্রথমত সিরাত অধ্যয়ন এবং সিরাতের পাঠ-পঠনের বিষয়ে আমরা গুরুত্ব কম দেই, দ্বিতীয়ত সিরাত ও মিলাদ সংক্রাস্ত অনেক মওযূ’ ও বানোয়াট বর্ণনা খুব সহজেই বলতে থাকি। অথচ রাসূল (সা.) এর নামে কোনো কিছু প্রস্তুত করে তা হাদিস বলে প্রচার করা যেমন হারাম ও কুফরের মতো গুনাহ তেমনি তার সম্পর্কে দলিল-প্রমাণহীন কোনো কিছু বলা এবং ভিত্তিহীন বর্ণনার আলোকে তার সম্পর্কে কোনো কিছু বলাও হাদিস জাল করার অস্তর্ভুক্ত ও অনেক বড় কবিরা গুনাহ। একই সাথে এটা তার প্রতি অনেক বড় ধৃষ্টতা ও বে আদবী।

ঈমান ও নির্ভরতা
রাসূলে কারিম (সা.) এর পবিত্র সিরাত ও তার উসওয়ায়ে হাসানার প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ও নির্ভরতা ছিল সাহাবায়ে কেরামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। তারা তো এই কল্পনাও করতে পারতেন না যে, মুহাম্মাদ (সা.) এর উপর ঈমান আনার পর তার সুন্নাহ ও আদর্শের কোনো একটি ক্ষুদ্র বিষয়েও সামান্য সংশয়-সন্দেহ হতে পারে! তদ্রূপ এ বিষয়টিও তাদের সমাজে সম্ভব ছিল না যে, বিশ্বাস হবে রিসালতের প্রতি আর শিক্ষা ও সংস্কৃতি এবং সভ্যতা ও জীবনযাপন পদ্ধতি হবে অন্য জাতির!

আজ আমাদের বড় দুর্ভাগ্য এই যে, আমাদের জীবন সংশয় ও স্ববিরোধিতায় পূর্ণ। আমাদের ঈমান মুহাম্মাদ (সা.) এর উপর অথচ আমাদের জীবনাদর্শ হচ্ছে পশ্চিমা সভ্যতা। সুন্নতে নববীর পরিবর্তে পশ্চিমা সংস্কৃতি আমাদের কাছে অনুকরণীয়। বেশভূষায় আমরা আল্লাহর রাসূলের অনুসারী নই, পশ্চিমাদের অনুসারী।

মসজিদের কিবলা ও মুসল্লিদের চেহারা যদিও বাইতুল্লাহ অভিমুখী, যা হেদায়েত, বরকত ও শাস্তি-নিরাপত্তার কেন্দ্র, কিন্তু জীবনের ‘কিবলা’ হোয়াইট হাউস, যা ভ্রষ্টতা ও বিপথগামিতা এবং জুলুম ও ফাসাদের সর্বনিকৃষ্ট কেন্দ্র। এ ধরনের অসংখ্য সংঘাত ও স্ববিরোধিতা এবং সংশয় ও কপটতায় জর্জরিত আমাদের মুসলিমসমাজ। এ থেকে মুক্তির একমাত্র পথ সুদৃঢ় ঈমান। আমরা যদি রাসূলে কারিম (সা.) এর সত্যবাদিতা, তার সুন্নাহর যথার্থতা এবং শুধু ও শুধু তারই জীবনযাপন পদ্ধতি ‘উসওয়াহে হাসানাহ’ হিসেবে এবং মানবতার শুদ্ধি ও সফলতার একমাত্র উপায় হিসেবে অস্তরের অস্তস্তল থেকে গ্রহণ করতে পারি এবং পরিপূর্ণ বিশ্বাস ও নির্ভরতার সঙ্গে এর উপর অটল অবিচল থাকতে পারি, আর মন-মুখ ও চাল-চলনে একথা প্রমাণ করতে পারি যে-

رضيت بالله ربا، وبالإسلام دينا، وبمحد صلى الله عليه وسلم نبيا.

(আমি আল্লাহকে রব হিসেবে পেয়ে, ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পেয়ে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবী হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট) তাহলেই আমরা মুক্তি পাব।

শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা
নবী কারিম (সা.) এর প্রতি এবং তার সুন্নাহ ও আদর্শের প্রতি সাহাবায়ে কেরামের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা একটি সর্বজনবিদিত বিষয়। তাদের গোটা জীবনই ছিল এর বাস্তব প্রমাণ। পক্ষাস্তরে এ বিষয়ে আমাদের দূরত্ব অত্যস্ত মর্মাস্তিক। আমাদের সাধারণ অবস্থা এই যে, মুখে ভালবাসার দাবি অথচ জীবনের সকল কাজ এর বিপরীত। আর অসংখ্য মানুষের মধ্যে আরো যা আছে তা হল মুহাববতের নামে রাসূল (সা.) এর প্রধান দুই শিক্ষা তাওহিদ ও সুন্নাহ বিরোধিতা এবং বিদআতে লিপ্ত হওয়া।

নিজ জীবনে প্রয়োগ
সিরাত চর্চার ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরাম ও আমাদের মাঝে সবচেয়ে বড় পার্থক্য এই যে, তারা সুন্নতে নববিয়্যাহ ও উসওয়ায়ে হাসানার প্রতিটি অংশকেই নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করেছেন। অথচ আমরা শাখাগত বিষয়গুলো তো পরের কথা, মৌলিক বিষয়গুলো থেকেও উদাসীন।

সুন্নাতকে জীবিত করা ও বেদআতকে ঘৃণা করা
সাহাবায়ে কেরাম তালিম-তারবিয়ত, দাওয়াত-তাবলিগ, ওয়াজ-নসিহত এবং সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ, এমনকি প্রয়োজনে জিহাদ ও কিতালের মাধ্যমেও নববী আদর্শের প্রতিষ্ঠা ও প্রচারের নিরলস প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন। তারা সব ধরনের চিস্তাগত, বিশ্বাসগত, কর্ম ও প্রথাগত বেদআত এবং সকল প্রকার জাহেলী রীতিনীতিকে পুরোপুরি ঘৃণা করতেন এবং তা নির্মূলের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন। অথচ এসব ক্ষেত্রে আমাদের সাধারণ অবস্থা তো আমাদের সামনেই আছে। এই বিষয়ে যৎসামান্য মেহনত যা হচ্ছে তা পরিমাণ ও গুণগতমান দুদিক থেকেই আরো অগ্রসর করা অপরিহার্য।

নিজ সস্তান, আত্নীয় স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের জন্য তাই পছন্দ করা
সাহাবায়ে কেরামের উপরোক্ত গুণাবলির নিশ্চিত ফলাফল এই ছিল যে, তারা নিজেদের সস্তান-সস্ততি, প্রিয়জন ও আত্মীয়-স্বজনের জন্যও আল্লাহর রাসূলের সিরাত ও সুন্নাহকেই পছন্দ করতেন, এরই আলোকে তারা নিজ সস্তানের তরবিয়ত করতেন .এবং সন্তানদেরকে এরই উপর প্রতিষ্ঠিত করতেন। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবকেও এরই দিকে আহবান করতেন এবং তাদেরকে এই পবিত্র জীবনাদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত দেখতে চাইতেন।

তাদের মাঝে এই হীনম্মন্যতা (বরং এই কপটতা ও নেফাকি) কল্পনাও করা যেত না যে, উসওয়ায়ে হাসানার উপর প্রতিষ্ঠিত করলে সস্তানদের হক খর্ব হয়!! কিংবা এই উসওয়ায়ে হাসানাহ থেকে বঞ্চিত রেখে সস্তানদের শিক্ষাদীক্ষাও হতে পারে!! নাউযুবিল্লাহ।

মোটকথা, সাহাবায়ে কেরামের কাছে হক-বাতিল, কল্যাণ-অকল্যাণ, আলো-অন্ধকার, সুপথ-বিপথ ও সফলতা-ব্যর্থতার একটিমাত্র মাপকাঠিই ছিল। আর তা হল মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ, তার প্রতি অবতীর্ণ সর্বশেষ গ্রন্থ কোরআনুল কারিম, তাকে প্রদত্ত সর্বশেষ জীবনপদ্ধতি-শরিয়তে মুহাম্মাদিয়া, তার পবিত্র সিরাত ও সুন্নাহ তথা উসওয়ায়ে হাসানাহ।