আজ বৃহস্পতিবার, ২৩শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১০ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৬ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
আজ বৃহস্পতিবার, ২৩শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১০ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৬ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

আদালত-পুলিশের বদান্যতায় হাজার কোটি টাকা পাচার করেও জামাই আদরে আসামী

হাজার কোটি আত্মসাত ও বিদেশে পাচার করেছেন। সিআইডি পুলিশের ২টি এবং দুদকের ২টি মামলাসহ অন্তত ২ ডজন মামলার আসামী সে। জামাতের অন্যতম পৃষ্টপোষক হিসেবেও তার নাম ওঠে এসেছে গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে। তবুও সৌভাগ্যবান আসামী তিনি। আদালত আর পুলিশের বদান্যতায় বেশ আরাম-আয়েশেই কাটছে তার বন্দি জীবন।

জানা যায়, কোম্পানির প্রায় ৮শ’ কোটি টাকা আত্মসাতের দায়ে অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনে সিআইডি পুলিশের মামলায় (নং-১৫(৯)২২, শাহবাগ থানা) ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সাবেক চেয়ারম্যান এমএ খালেক এবং ছেলে রুবায়াত খালেককে গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার করা হয়। এর পর থেকে তিনি জেলবন্দি। কিন্তু তিনি এ তথ্য গোপন করে অসুস্থতার কথা বলে একটি প্রতারণা ও হত্যাচেষ্টার মামলায় (নং-সিআর ২৫৮৬/২০২০) বার বার সময় নিয়েছেন। উক্ত খালেক মামলাটির ১ নম্বর এবং তার ছেলে রুবায়াত খালেক ৪ নম্বর আসামী। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আদালত এবং উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও কোনো ফল হয়নি। অবশেষে বিষয়টি জানাজানি হলে গত ২০ জুলাই উক্ত মামলায় (নং-সিআর ২৫৮৬/২০২০) তাকে হাজির করা হলেও মামলার চার্জ গঠন না করে আবারো তার সময়ের আবেদন মজ্ঞুর করেন আদালত। অন্যদিকে আদালতে দায়িত্বরত পুলিশকে আসামী খালেকের প্রতি বিশেষ যত্ন নিতে দেখা যায়। আসামীর হাতকড়া খুলে আদালতের অভ্যন্তরে আইনজীবিদের জন্য রক্ষিত ব্যাঞ্চে ফ্যানের নিচে বসানো হয়। অবশ্য এ বিষয়ে পুলিশের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সঙ্গে সঙ্গে আদালতের কাঠগড়ায় ঢুকিয়ে দেয়া হয় আসামী খালেককে। হাজিরা শেষে তাকে নিয়ে যাওয়ার সময় ছবি তুলতে দেখে এ প্রতিবেদকের প্রতি মারমুখী আচরণ করে সে। এ সময় পুলিশ হতকড়া পড়াতে চাইলে পুলিশকেও ধমকাতে দেখা যায়।

উল্লেখ্য অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনের এক মামলায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ফারইস্টের সাবেক চেয়ারম্যান কারাবন্দী এম এ খালেকের ঢাকার বারিধারার ১৫০ কোটি টাকার বাড়িতে এখন আদালতের জব্দ আদেশ ঝুলছে। বাড়িটির প্রবেশমুখের পাশে দেয়ালে আদালতের আদেশটি সোমবার টাঙিয়ে দেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কর্মকর্তারা। সিআইডি বলছে, আদালতের নির্দেশনাটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বাড়িটি জব্দ করা হয় ।

তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান আমার দিনকে বলেন, বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সিআইডির অতিরিক্ত মহাপরিদর্শককে তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ দিয়েছেন আদালত। তাই সিআইডির পক্ষ থেকে আদালতের আদেশটি বাড়িটিতে টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বাড়ির দেয়ালে টাঙানো আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ফারইস্ট স্টকস অ্যান্ড বন্ডস লিমিটেডের চেয়ারম্যান পদে থেকে এম এ খালেক প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে ১৩৫ কোটি টাকা আত্মসাত করেছেন, যা তিনি (খালেক) কানাডায় পাচার করে বাড়ি কেনাসহ সম্পদ করেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এ ছাড়া কানাডায় পাচার করা অর্থে বাড়ি ও সম্পদ রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এ ছাড়া দেশে নামে-বেনামে সম্পদ গড়েছেন তিনি।

বাড়ি কেনার আর্থিক লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করে সিআইডি বলছে, এম এ খালেক তাঁর বিভিন্ন কোম্পানি থেকে টাকা সরিয়ে এটি কিনেছিলেন, যা টাকা হস্তান্তর-স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে সম্পাদিত অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনে অপরাধ। খালেকের স্ত্রী ও সন্তান কানাডায় বসবাস করছেন। বাড়িটি বিক্রি করে যেন কোনো টাকা বিদেশে পাচার করা না যায়, সে জন্য আদালতের মাধ্যমে বাড়িটি জব্দ করা হয়েছে।

জানা যায়, এম এ খালেক বিভিন্নভাবে আনুষ্ঠানিক পদে ছিলেন, এমন প্রতিষ্ঠানণ্ডলোর মধ্যে রয়েছে প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাইম ব্যাংক, প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, প্রাইম ফাইন্যান্স ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড, পিএফআই সিকিউরিটিজ, প্রাইম ইনস্যুরেন্স কোম্পানি, প্রাইম ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স, প্রাইম ইসলামী সিকিউরিটিজ, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি ও ফারইস্ট স্টকস অ্যান্ড বন্ডস লিমিটেড।বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে এম এ খালেকের টাকা সরিয়ে নেওয়ার সত্যতা বেরিয়ে এসেছে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনেও। কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১০ সাল থেকে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা বের করে নেওয়া শুরু করেন। এরপর ৮ বছরে হাতিয়ে নেন ১ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এম এ খালেক ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা প্রাইম ফাইন্যান্স সিকিউরিটিজ থেকে ৩০৫ কোটি ও ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স থেকে ৩৭৬ কোটি টাকা বের করে নেন। এ ছাড়া প্রাইম ইসলামী সিকিউরিটিজের ২০ কোটি, প্রাইম ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের ২০০ কোটি, পিএফআই প্রপার্টিজের ১৫০ কোটি, প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটির ১৬৭ কোটি, ফারইস্ট স্টকস অ্যান্ড বন্ডের ৫০ কোটি ও পিএফআই ক্যাপিটালের ১৫ কোটি টাকা তাঁর পকেটে গেছে। তাঁর কাছে ঢাকার প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্ট পাবে ১৬৭ কোটি টাকা।

বেসরকারি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান হুদাভাসির তদন্তে এসেছে, এম এ খালেক প্রাইম এশিয়া ফাউন্ডেশনের হিসাব থেকে ৯০ কোটি টাকা প্রাইম ব্যাংকের মতিঝিল ও বনানী শাখার হিসাবে স্থানান্তর করেছেন, যা সুদে-আসলে এখন ১৬৭ কোটি টাকা হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনেক সময় শেয়ার ব্যবসার নামে এম এ খালেক ওই সব প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা সরিয়েছেন। পরিবারের সদস্য ও কর্মচারীদের নামেও নিয়েছেন টাকা। এর বাইরে ম্যাকসন্স বাংলাদেশ, ম্যাকসন্স বে লিমিটেড, গ্যাটকো, গ্যাটকো অ্যাগ্রো ভিশন, গ্যাটকো টেলিকমিউনিকেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে তিনি ঋণ নিয়েছেন প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। বেসরকারি খাতের আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে নেওয়া এসব ঋণ ইতিমধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে।

 

 

 

 

 

শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Pin on Pinterest
Pinterest
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin